• ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২০:৩৪:৪৬
  • ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২০:৩৪:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

রঙ্গ ভরা বঙ্গদেশের বৈপরীত্য এবং প্রদর্শনবাদীতা

নারায়নগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণে অগ্নিদগ্ধ পুত্র ইমাম হোসেনের জন্য কাঁদছেন পিতা শেখ আলাউদ্দীন। ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা:

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মসজিদে বিস্ফোরণে মারা গেছেন শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আটাশ জন মানুষ। যার সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এই বিস্ফোরণ এখন পর্যন্ত পাওয়া খবরে কোনো সন্ত্রাসবাদী হামলা বা বিস্ফোরণ নয়। এটা দেশের সবেধন নীলমনি তিতাস গ্যাস কোম্পানির ভুলের ফসল। মসজিদের পাশের লাইনে লিকেজ ছিলো, আর সেটাই বিস্ফোরণের আপাতত উদঘাটিত ও প্রকাশিত কারণ।

এই কারণ প্রকাশের সাথে সাথে আরেকটি বিষয় প্রকাশিত হয়েছে। এই লিকেজ মেরামতের জন্য তিতাস গ্যাস কোম্পানির লোকজন পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন মসজিদ কমিটির কাছে। চিন্তা করে দেখুন, অবস্থা কোথায় দাঁড়িয়েছে! মানুষ মসজিদে দান করে পারলৌকিক মঙ্গলের আশায়। সেই দানে ভাগ বসাতে চেয়েছে তিতাস গ্যাস কোম্পানি। অবশ্য এ ঘটনায় কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আমাদের দেশে এই ‘সাময়িক বরখাস্ত’ ব্যাপারটা বড়ই মজার। সাময়িক বরখাস্তের পর কী হলো তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জানা যায় না। দেশের মিডিয়ার অত ধৈর্য নেই যে সেটার ফলোআপ দিবে বা রাখবে। সঙ্গতই সাময়িক বরখাস্ত পরবর্তী দৃশ্যপটটি জানা হয়ে উঠে না আমাদের। ব্যক্তিগতভাবে যা দু’চারটা জানতে পেরেছি তাতে সাময়িক আর স্থায়ী হয়ে উঠেনি। উল্টো কারো কারো আরো ভালো পদায়ন হয়েছে। ফলে এই সাময়িক বরখাস্ত বিষয়টিকে অনেকেই গায়ে লাগান না। ভাবটা অনেকটা এ রকম, ‘কদিন ছুটি পাওয়া গেলো। বড্ড খাঁটুনি পড়ে গিয়েছিল!’

যাক গে, এখন মুল আলোচনায় আসি। লক্ষ্য করে দেখেছেন কি, একটি মসজিদে বিস্ফোরণে এতোজন মানুষ মারা গেলো, এ নিয়ে তেমন কোনো বাতচিত নেই। সভা-সমিতি নেই। মানবতার পক্ষে রাস্তায় লুটিয়ে কাঁদা মানুষজনের চোখ শুকনো। কেউ তেমন মুখ খুলছেন না। আর বাঙাল সেকুলারকুল তো একেবারে ‘স্পিকটি নট’। তাদের কুলুপ আটা মুখের দিয়ে তাকিয়ে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে, মসজিদে যাওয়াটা কি তবে অন্যায় কর্ম? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিখোঁজ হওয়া পথশিশু জিনিয়াকে নিয়ে মানুষের উদ্বেগ মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল এখনো আশাহত হবার মতন কিছু হয়নি। এখনো মানুষ রয়েছে। বিপরীতে নারায়ণগঞ্জ মসজিদের ট্র্যাজেডিতে এমন অনেককেই চুপ থাকতে দেখি তখন পুনর্বার আশাহত হই। বাধ্য হয়েই হই, হতে হয়। যেহেতু এমন বিভাজনের কোনো চিন্তাই মানবকল্যাণে লাগে না। লাগেনি কখনো।

আজকে যদি মসজিদে না ঘটে লালনের আখড়ায় এমন কোনো বিস্ফোরণ ঘটতো তাহলে নিশ্চিত অনেককেই রাস্তায় নেমে পড়তে দেখা যেতো। চিকিৎসার সাহায্যের জন্য আহাজারি শুরু হতো। শাহবাগ মোড় ব্যস্ত হয়ে উঠতো। না, এটা কল্পনা বা হাইপোথিসিস নয়, দেখা চিত্র। অথচ এতো মানুষের মৃত্যু এবং আহত হবার ঘটনায় তেমন কিছুই ঘটেনি। প্রশ্ন হলো কেনো ঘটেনি। ঘটেনি এই কারণে যে, আমাদের এক শ্রেণির মানুষের ধারণা রয়েছে ধর্ম পালন করা মানুষগুলো মূর্খ এবং র‌্যাডিক্যাল। বিশেষ করে যারা ইসলাম ধর্ম পালন করেন। আর সে কারণেই সেই মানুষগুলো সহানুভূতি পাবার যোগ্য নয়। না, এটা ধারণা করে বলছি না, দেখেশুনে অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। একজন জিনিয়ার জন্য আমিসহ সবাই যে আহাজারি করেছি, তার শতভাগের দশ ভাগও ছিলো না মসজিদ ট্র্যাজেডির জন্য। অথচ যারা মারা গেছেন তাদের ঘরেও রয়েছে জিনিয়ার মতন সন্তান। মারা গেছে সেই সন্তানদের কেউ কেউ। পুড়ে গেছে এক মায়ের দুটি সন্তানই। স্বামীর মৃত্যুর পর যিনি বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন সে সন্তানদের। এমন ট্র্যাজেডিতেও মন গলেনি সো-কল্ড মানবতাবাদী প্রগতিশীল সেকুলারগণের। এই প্রজাতিকে পিকুলার আমি এমনিতেই বলি না।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই দুর্ঘটনার মৃত্যুকেও জাস্টিফাই করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। গণমাধ্যমে খবর হচ্ছে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিলো হিন্দুদের জায়গায়। তার মানে কি দাঁড়ালো, এই মৃত্যু জাস্টিফাইড! কতটা উজবুক হতে পারে মানুষ! আটাশ জন মানুষের মৃত্যুর পরও তাদের চিন্তা মসজিদটি কোথায় নির্মিত হলো, তা বৈধ কিনা এ বিষয়ে। এমন ননসেন্সের বাস এ দেশটিতে রয়েছে বলেই আজকে আমাদের এই অবস্থা। বিভাজন হওয়া উচিত শোষক ও শোষিতের মধ্যে। মজলুম আর জুলুমবাজদের মধ্যে। যারা শক্তির প্রাবল্যে মানুষকে নিপীড়ন করে, শোষণ করে। অথচ আমাদের ভাগ করা হয়, ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’র ভিত্তিতে। অসভ্যতার মাত্রা থাকা উচিত।

সব বিষয়ে এ দেশে কিছু ‘মোর দ্যান’ মানুষ রয়েছেন। দর্শন না বুঝেই দার্শনিক, ধর্মকে আত্মস্থ না করেই ধার্মিক যারা, তাদের কথা বলছি। মার্ক্সকে বোঝার আগেই ‘বাদ’ বুঝে ফেলেন এনারা। যার ফলে মার্ক্সবাদ থেকে স্বয়ং ‘মার্ক্স’ই বাদ পড়ে যান। সাম্যবাদের কথা বলে যে ইসলাম, সেখান থেকে ‘সাম্য’টা কেটে দিতে তৎপর হয়ে পড়েন কেউ কেউ। বলতে পারেন, ডেকে আনতে বললে ‘বেঁধে’ আনতেই উৎসাহী এই প্রজাতি। ডাকের ব্যাপারটা জানতে তাদের উৎসাহ নেই, উৎসাহের প্রাবল্যটা বেঁধে আনতেই। আনতে পারার ক্ষমতাটা দেখানো। এদের দুঃখ প্রকাশের মধ্যে, সহমর্মিতা প্রকাশের মাঝেও দেখানোর প্রাবল্য থাকে। যাকে সোজা ভাষায় বলে প্রদর্শনবাদীতা। দেখ, আমরা কত বড় ‘দ’।

এদের চিন্তার সাথে নিউজিল্যান্ডের মানুষের চিন্তা মেলান তো, দেখবেন পুরো কনট্রাস্ট। নিউজিল্যান্ডে মসজিদ ট্র্যাজেডির পর সেখানের মানবতাবাদী মানুষদের রিয়েকশন আর আমাদের সোকল্ড অসাম্প্রদায়িক এবং মানবতাবাদী সমাজের অ্যাকশনের পার্থক্যটাই সেই বৈপরীত্যের বড় প্রমাণ। আমাদের অনেক ধার্মিকের চিত্রটাও তাই। তারাও ধর্মকে ভর করে মানুষের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করছেন। ধর্ম বুঝে ওঠার আগেই এনারা অধর্ম খুঁজতে শুরু করেন। এটাও প্রদর্শনবাদীতা। নিজে যে ধার্মিক তা দেখানোর প্রবণতা।

এই যে এক্সট্রিম সেকুলার, আর এক্সট্রিম ধার্মিক এরা মূলত একই জিনিস। এদের কাজ বিভাজন সৃষ্টি করা। উত্তেজনা সৃষ্টি করা। বিশেষ করে আমাদের সমাজে ক্রম বর্ধমান বিভাজনের অন্তত একটা চ্যাপ্টারে এনারাই মূল কারিগর। এনারা বিভাজন সৃষ্টি করেন আর মাঝ থেকে ‘নেপোয় মারে দই’। এই ‘নেপো’ বা নেপোরা কিন্তু আমাদের অচেনা নয়। যারা দই-ননী খেয়ে তেল চকচকে বেঁচে-বর্তে আছেন। যাদের ‘সেকেন্ড হোম’ গড়ে উঠছে উন্নত বিশ্বের কোন দেশে। আর আমাদের জিনিয়াদের ঠাঁই হচ্ছে পথে-গলিতে-ঘুপচিতে। মরে যাওয়া আমজনতার জীবনের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে বিশ হাজার টাকা থেকে লাখ টাকায়! আহা কী রঙ্গ ভরা বঙ্গদেশ!

লেখক: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1110 seconds.