• ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২২:২৪:০১
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২২:২৮:৫২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘সীমান্ত হত্যা, হানিফ বাংলাদেশির একক পদযাত্রা’

সাঈদ স্যাম। ছবি : সংগৃহীত


সাঈদ স্যাম :


১. মৃত্যু হিসেবে বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সীমান্তের নাম ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত’। সম্প্রীতি আর সুসম্পর্ক নাকি দু-দেশের মাঝে, কোন যুদ্ধের পরিবেশ নেই, তাহলে কেন সীমান্তে প্রাণ যাচ্ছে বাংলাদেশিদের? ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সীমান্তে ১৫৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। ২০১৮ সালের তুলনায় কিন্তু ২০১৯ সালে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে যায় তিনগুণ।

বছর ভিত্তিক সরকারি হিসাব মতে, ২০১৫ সালে ৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২৫ জন, ২০১৭ সালে ১৭ জন, ২০১৮ সালে ৩ জন এবং ২০১৯ সালে ৪৩ জন বাংলাদেশিকে ভারতের সীমান্তরক্ষা বাহিনী বা বিএসএফের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৯ সালের ৪৩ বাংলাদেশির মধ্যে ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন বিএসএফ’র গুলিতে এবং বাকি ৬ জনকে নির্যাতিত করে। তবে, বেসরকারি মতে এই হত্যার সংখ্যা অনেক বেশি।

চলতি, ২০২০ সালের প্রথম ৬ মাসে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ২৫ জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে ভারতীয় বিএসএফ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেও থেমে নেই এই হত্যাকাণ্ড। ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলেও তার প্রতিফলন মেলে না সীমান্তে, এমনকি সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেও। দু-দেশের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে, বিএসএফ নন-লেথাল (প্রাণঘাতী নয়) অস্ত্র ব্যবহার করবে। যাতে করে সীমান্তে হত্যা শূণ্যতে নামিয়ে আনা যায়। কিন্তু তারপরেও কেন এতো  হুজ্জতি করে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার?

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পরিচালক নীনা গোস্বামী বলেছেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায়ে কাগজে-কলমে মিটিংয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেটাকে বাস্তব রূপ দেয়ার জন্য যা যা করা দরকার, দুই পক্ষ থেকে যদি সেটা তরা হতো, তাহলে সীমান্তে এমন হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা আর ঘটতো না।’ আসলে এইসব আলোচনা মিটিংয়ের গ্যারাকলে আটকা থাকে আর বাংলাদেশিদের লাশ ঝুলতে থাকে কাঁটাতারে। ভারত পুরা বাংলাদেশকে কাঁটাতারের মাঝে ঝুলে রাখেনি কি?

আমরা দেখেছি, বিএসএফ সীমান্তে হত্যার জন্য যে অভিযোগ করেছে তা যুক্তিহীন বা গ্রহণযোগ্য নয় বলেছেন বিজিবি। বাংলাদেশিরা সীমান্তে চোরাচালান করতে যায় বলেই দ্বিধাহীনভাবে চলে গুলি। চোরাচালান কি শুধু এপার থেকে হয়? নাকি, ওপারের লোক ও বিএসএফের যোগসাজগে হয়? ওপার থেকে বন্ধ করেই দিলে তো হয়। আর চোরাচালানের অভিযোগের কথা বলে কি গুলি করতে হবে? এজন্য ধরে তার শাস্তি বা জরিমানার ব্যবস্থা তো আছে। তা করবে না কেন বিএসএফরা? প্রায়ই প্রতিদিনে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করেছে ভারতীয় বিএসএফ, কোথায় থেকে এই সাহস আসে? আপনাদের মনে আছে, বিডিআর যখন ছিলো তখন কিন্তু বিএসএফ এতো সাহস দেখাতে পারেনি। বিডিআর’রা সমুচিত জবাব দিয়েছেন বলে।

সাহস আসে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে ভারতীয় বিএসএফ’র সৈনিকরা বাংলাদেশের নিরহ নাগরিকে হত্যা করেই চলছে। গরুকে ঘাস খাওয়ানো বা চাষাবাদের মতো কোনো জরুরি কাছে সীমান্তের কাছাকাছি নিজেদের জমিতে গেলেও চলে বিএসএফ’র গুলি ও নির্যাতন। এইসব দেখেও বর্তমান সরকারের কোনো জোড়ালো ও বলিষ্ঠ  প্রতিবাদ নেই। নতজানু হয়ে সব মেনে চলছে প্রতিনিয়ত। সাধারণ জনগণ থেকে শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেও পেটোয়া বাহিনীর নানান নির্যাতন শুরু হয়। 

যেকোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়-দায়িত্ব সেই রাষ্ট্রের সরকারের। বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে নাকি বন্ধুরাষ্ট্র যা বলছেন তার শতভাগ দায়িত্ব পালন করছেন। বন্ধুরাষ্ট্র টার্গেট করে ফেলানীদেরকে মারলেও বাংলাদেশ সরকারের কোনো টার্গেট নেই। 

                           ‘কত লক্ষ জনম ঘুরে, ঘুরে

                        আমরা পেয়েছি ভাই মানব জনম’

                        সেই মানব জীবনের কী কোন মূল্য নেই? সেকেন্ডের মাথায় খতম!

২. হানিফ বাংলাদেশি নামে এক যুবক গত ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ১১ টায় ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে প্রতীকি লাশ নিয়ে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার রামখানার অনন্তপুরের উদ্দেশ্যে একক পদযাত্রা শুরু করেছেন। ফেলানীকে আপনারা ভুলে যাননি নিশ্চয়ই।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার রামখানার অনন্তপুর সীমান্তে ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি মাসে ১৪ বছরের কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে বন্ধুরাষ্ট্রের বন্ধুবাহিনী বিএসএফ। প্রায় ৫ ঘণ্টার মতো কাঁটাতারে ঝুলে ছিলো ফেলানীর নিথরদেহ। ফেলানীকে টার্গেট করেই গুলি করা হয়েছিল। গণমাধ্যমে খবর আসার পর বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার তোপে পড়ে যায় ভারত। ফেলানী হত্যার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত বিচার পায়নি ফেলানীর পরিবার, বিচার পায়নি বাংলাদেশ। ফেলানীর নিথরদেহ যেমন ঝুলিয়ে রেখেছিল কাঁটাতারে, ঠিক তেমনিভাবে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের কার্যক্রম ঝুলিয়ে আছে।

এক প্রতিবেদনে, ফেলানী হত্যা মামলায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য এবং কুড়িগ্রামের জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট এস.এম. আব্রাহাম লিংকন বলেন- ‘ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের রিট এ বছরে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বিচারিক কাজ কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে।’

হানিফ বাংলাদেশি সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে একটি প্রতীকী লাশ কাঁধে নিয়ে হাটা শুরু করেছেন। তার হাতে বা কাঁধে বয়ে চলবে গুম-অপহরণের লাশ, সড়ক চাপার লাশ, ভবন ধসে পড়ার লাশ, টলার ডুবির লাশ, ক্রসফায়ারের লাশ, পেটোয়া বাহিনীর হাতুড়ির লাশ, গ্যাসের আগুনে পুড়ে যাওয়া লাশ, ভেজাল ওষুধ ও ভেজাল চিকিৎসা নামের লাশ, আবরারের লাশ থেকে বন্দুক যুদ্ধে নিহত শিক্ষার্থী জয়নাল ও আসামি জয়নাল এক নয় তার লাশ। অসংখ্য লাশ আছে তার কাঁধেচাপা এক প্রতীকী লাশের ভিতরে। স্বাভাবিক লাশের নিশ্চয়তা যেন থাকে, তাই চলবেন বহুলাশের আখ্যান নিয়ে। হানিফ বাংলাদেশির ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের অনন্তপুরের একক পদযাত্রার মধ্য দিয়ে যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। হানিফ বাংলাদেশির সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবিতে প্রতীকী লাশ নিয়ে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্ত অভিমুখে একক পদযাত্রা সফল হোক।

লেখক: শিক্ষার্থী, অর্নাস চতুর্থ বর্ষ,  কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1677 seconds.