• ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২:০০:০২
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২:০০:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম মুক্তচিন্তক এবং পোশাক নিয়ে টানাটানি

ছবি : সংগৃহীত

মেয়েদের মধ্যযুগীয় পোশাক নিয়ে এক মুক্তচিন্তকের মনে বেশুমার দুঃখ ছিলো। মানে বোরকা-হিজাব নিয়ে আর কী। তাকে এক রক গায়িকার ছবি দেখিয়ে বললাম— এই মেয়ের তো সব ঢাকা। গায়ে লম্বা গাউন। হাতে চামড়ার গ্লোভস। পায়ে লম্বা বুট। মাথায় ক্যাপ। কালো রুমালে মুখ ঢাকা। চোখে সানগ্লাস। আর এসবের সবই কালো। কিছুই তো দেখা যায় না! এ গায়িকাতো পুরা মধ্যযুগীয়। মুক্তচিন্তকের মুখটা তখন ছিলো সত্যিই দেখার মত।

ব্যক্তিস্বাধীনতা যারা বোঝেন না, তারা কেনো যে মুক্তচিন্তার প্যাঁচাল পারেন বুঝতে পারি না। ব্যক্তিস্বাধীনতার পরের ধাপ হলো মুক্তচিন্তা। ব্যক্তির স্বাধীনতা না থাকলে চিন্তা মুক্ত হবে কী করে! এদের পাওলো ফ্রেইরি পড়া উচিত এবং আত্মস্থ করা উচিত। মনের দাসত্ব থেকে মুক্তিই সবচেয়ে বড় মুক্তি। এটাই ফ্রেইরি বলেছেন। 

সৈয়দ আবুল মকসুদ যদি চাদর পড়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তাতে আপনার কী! ফরহাদ মজহার লুঙ্গি পরে আরাম পান তাতে সমস্যা কোথায়! বরং যেখানে ড্রেসকোড নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় সেটাই ব্যক্তিস্বাধীনতা আর মুক্তচিন্তার বাধা। আমার পোশাক আমি পড়বো, আমার মতো পড়বো, এটাই ব্যক্তি স্বাধীনতা। সুতরাং মিডি, মিনি পড়ার অধিকার যেমন রয়েছে তেমনি বোরকা বা হিজাব পড়ার অধিকারও সবার রয়েছে। সাথে লম্বা গাউনও।

তবে এই দুই ক্ষেত্রে কেউ যদি জোর-জবরদস্তি করেন, তাহলে সেটা উত্তর কোরিয়ার সমাজতন্ত্র। যেখানের মুক্তচিন্তা মানে কিমের চিন্তা। কেউ আবার মাঝখানে ভেউ করে বলে উঠতে পারেন, জোর-জবরদস্তি মানে। জোর-জবরদস্তি মানে হলো, মুক্তচিন্তার কথা বলে ইচ্ছার বাইরে পোশাক মুক্ত করার কথা। আর পর্দার কথা বলে ইচ্ছার বাইরে পোশাক যুক্ত করার কথা।

যেমন অনেকের বৈশাখ আসলেই মৃগী রোগের মতন আদিখ্যেতা রোগ ওঠে। তখন তারা শাড়ি দেশের ঐতিহ্য। শাড়িতেই নারী সুন্দর। এসব প্রলাপ বকা শুরু করেন। আবার থার্টি ফার্স্টে এরাই মিডি-মিনিতে হয়ে উঠেন বেতাল। এসব ডাবল স্ট্যান্ডার্ড, পারভার্টদের নিয়ে আলোচনা করাটা সত্যি বলতে বৃথা। এই যে করছি তাতেও নিজের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা জন্মাচ্ছে। এরা মূলত আলাপের বিষয়ই নয়। বলা হয়, উপেক্ষা সবচেয়ে ভালো প্রতিশোধ। এদের উপেক্ষা করাই উচিত। কিন্তু মুশকিল হলো এদের পাল ক্রমবর্ধমান। মানে পালে বাড়ছে।

এরা ভুলভাল বুঝিয়ে ক্রমেই মুক্তচিন্তার নামে মানুষের স্বাধীন ব্যক্তি চিন্তাকে আবদ্ধ করে ফেলছে। ভুজংভাজংয়ে মানুষ নিজের ভালোমন্দ, পছন্দ-অপছন্দের নিয়ন্ত্রণ ভার এদের হাতে তুলে দিচ্ছে। হালের গাঞ্জা পার্টিতে নারী লাঞ্ছিত হবার খবর তারই ফল। জানি, এখানে আবার মুক্তচিন্তার বিপরীত পক্ষ বলে বসবেন, মেয়েরা গাঞ্জা পার্টিতে যায় কেনো। আরে ভাই, সেজন্যেই তো কথা বলতে হয়। মুক্তচিন্তার নামে ভুলভাল আর ভুজংভাজং-এর চেষ্টা প্রতিহত করতেই বলতে হয়। গাঞ্জা পার্টিতে এই বুঝিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় যে, মেয়েদের সামাজিক শেকল ভাঙতে হবে। ভাঙতে গেলে প্রচলিত সমাজের বিরোধিতা করতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখাতে হবে।

আর গাঞ্জা খাওয়া সেই বুড়ো আঙুলময় বিরোধিতার একটা অংশ। সুতরাং গাঞ্জা খেলেই তুমি মুক্তমনা। দেখেন না, অনেকে মেয়েই প্রথাভাঙার অংশ হিসাবে সামাজিকমাধ্যমে সিগারেট টানার দৃশ্য পোস্ট করেন। ধোঁয়ার মুক্তিতে প্রমাণ করতে চান সে মুক্তমনা। অথচ সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মুক্তমনা প্রমাণে, প্রথার বিরোধিতায় তাদের এই সিগারেট ক্যাম্পেইন অন্যকে সিগারেটে আসক্ত করতে পারে। অন্যের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি হতে পারে। এই কথা তাদের স্মরণে আসে না। মুক্তমনা মানে অন্যের ক্ষতি করা নয়, মঙ্গল করা। মুক্তমনা মানে মঙ্গল চিন্তা। মুক্তমনা মানে কল্যাণ রাষ্ট্র। তবে এসব সিগারেট বা গাঞ্জাখোর সো-কল্ড মুক্তমনারা ওই লেভেলের নয়। এদের কাজ হলো হুজুগে মাতা।

এসব কথায় সো-কল্ড মুক্তমনারা আবার চ্যাগিয়ে উঠবেন। বলবেন, আমি সিগারেট খেলে, গাঁজা টানলে আপনার কী, আপনি ব্যক্তিস্বাধীনতায় বাধা দেয়ার কে। কথা মিথ্যা না, আমি কেউ না। তবে আমি সমাজের একটা অংশ। সিগারেট ও গাঁজা দুটোই ক্ষতির কারণ এবং সে ক্ষতি সামাজিক ক্ষতি। আর সেটা ঠেকানোর চেষ্টা হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। মুক্তমনাদের এই দায়বদ্ধতা বদ্ধমনাদের চেয়ে বেশি। সুতরাং যারা উল্টোপাল্টা কাজ করাকে মুক্তমনা হবার কৌশল ভাবেন, তাদের সেই কৌশল পাল্টানো উচিত। কার পোশাক কী হবে, তা তাকে নির্ধারণ করতে দিন। আপনি জোর করতে যাবেন না, কেউ করলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন। একবার বোঝানোর চেষ্টাতেই সেরে ফেলবেন এমন ভাবা বৃথা। বারবার চেষ্টা করুন, দেখবেন পারবেন। এরজন্য গাঁজা বা সিগারেট কোনটাই খেতে হবে না। সুতরাং অঞ্জন দত্তের গান ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’র ভাষায় পাড়ার দাদাদের মতন কব্জির জোর দেখাতে যাবেন না প্লিজ।

লেখক: সাংবাদিক, কলামনিস্ট।

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.1299 seconds.