evaly
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৯:২৬:৫১
  • ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৯:২৬:৫১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

তসলিমার হ্যাট বনাম মুসলিমার হিজাব

ফাইল ছবি

তসলিমা নাসরিন মাঝেমধ্যেই মানুষকে উস্কে দেন। এ কাজটা তিনি সচেতনভাবেই করেন। যে কথাটা আদর করে বোঝানো যায়, সেটা তিনি অচল মাস্টারদের মতন বেতিয়ে করার চেষ্টা করেন। সামাজিকমাধ্যমে তার এমনি এক লেখা ‘ভাইরাল’ নামের খোলসে ছাপিয়েছে বাংলাদেশের একটি দৈনিক। এই লেখায় বিশেষ কিছু নেই, সেই বোরকার বিরুদ্ধে গতানুগতিক উস্কানি ছাড়া।

তবে দৈনিকে প্রকাশিত তসলিমার ছবিটি দেখে খুব মজা পেয়েছি। তসলিমার মাথায় রয়েছে একটি হ্যাট। যাতে তার চুল প্রায় পুরোটাই ঢাকা পরেছে। হিজাবেও ঢাকা পরে। পার্থক্যের মধ্যে হিজাবে পুরোটাই ঢাকা পরে। কাজ কিন্তু দুটোরই এক, ঢাকা। অথচ হ্যাটে চুল ঢাকা পরলে দোষ নেই, দোষটা হিজাবে। তার পরনেও দেখা গেছে লম্বা কোট। কোটও কিন্তু বোরকার মতন শরীর ঢেকে রাখে। তসলিমা হয়তো বোরকা থেকে পৃথক হতেই ক্লিভেজটুকু শার্ট-টিশার্ট বা অন্য কিছুতে ঢাকেননি। কিন্তু তারপরেও কোর্টে তার দু’হাতসহ অনেক কিছুই ঢাকা পরেছে। যা লম্বা হাতা কামিজেও পরে। বোরকাতেও পরে।

এখন বিবিসি’র এই বোরকা বিতর্ক নিয়ে একটি রিপোর্টের কথায় আসি। যা শুরু হয়েছে বোরকা পরা মা’র সাথে ছেলের ক্রিকেট খেলার ছবি নিয়ে। যে ছবিটিই ঘৃণাবাদীদের লক্ষ্য। এই রিপোর্টে পোশাক নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মেসবাহ কামালের উদ্ধৃতি রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘শাড়ির দৈর্ঘ্যে পরিবর্তন এসেছে, এটা বেড়েছে। বাঙালি নারীরা ব্লাউজ পরতো না। রবীন্দ্রনাথের যুগ থেকে এটা শুরু হয়। শাড়ি এবং এর সাথে অনুষঙ্গ অন্য জিনিসের সমন্বয়ে একটা পরিশীলিত রূপ পেয়েছে।’ বুঝলেন তো তসলিমা এবং কারো কারো ‘কালচারাল গড’ রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই ব্লাউজ পরা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ অঙ্গ ঢাকার বিষয়টি তখন থেকেই চালু।

নৃ-বিজ্ঞানের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীন আরেকটু এগিয়ে বলেছেন, ‘ব্লাউজ ও পেটিকোটের ধারণা ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা নিয়ে এসেছে। আর এটা এসেছে ভিক্টোরিয়ান নোশন থেকে।’ দাঁড়ালো কী? দাঁড়ালোটা এই যে ঢাকাঢাকিটা শুরু করেছে মূলত ঠাকুরবাড়ি। বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন যারা ঠাকুরবাড়িকে ফ্যাশন এবং প্যাশন আইকন ভাবেন তারা। তাই গতর ঢাকার প্রশ্নে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়কে দোষ দিয়ে খুব বেশি পার পাওয়া যাবে না। মানুষের সভ্যতার শুরুই কাপড় আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে, আর যান্ত্রিক সভ্যতা আগুন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। এ কথা উজবুকদের কে বোঝাবে।

লম্বা গাউন নিয়ে এদের কোনো আপত্তি নেই। হাঁটু পর্যন্ত কোট নিয়ে শব্দ নেই। বুট জিনসে গা-পা ঢেকে রাখলেও নোট রাখেন না। শুধু তাদের নোট বোরকা আর হিজাবে। কেউ যদি ইচ্ছা করে বোরকা বা হিজাব পরতে চান আপত্তিটা কোথায়! কেউ যদি গাউন, জিন্স আর বুটে গা ঢাকতে চান তাতেও ঝামেলটা কই! ঝামেলা হলো চিন্তার বৈকল্যে। বুদ্ধিজীবীদের দোষ দিয়েছেন তসলিমা। আমিও দিই। বুদ্ধিজীবীরাই উস্কানিবাদীদের সৃষ্টি করেছেন। তারা উস্কানিবাদের গোড়ায় জল ঢেলেছেন। আজ তাদেরই গালি শুনতে হচ্ছে। আর সে দোষ দেয় বুদ্ধিজীবী সৃষ্ট উস্কানিবাদীরাই। যেমন বৃক্ষ তেমন ফল আর কী।

প্রশ্ন হলো রুচির, ইচ্ছার। আফ্রিকার একটা অংশে দেখা যায় টপলেস নারী। আরেকদিকে আলখেল্লা ঢাকা। এটা হলো সাংস্কৃতিক আচরণ। এক্ষেত্রে অন্তত ধর্ম মেশানোটা হবে বোকামি। নিজেদের যারা পড়ুয়া জ্ঞানী ভাবেন তাদের বলি, অনেক বেশি পড়ার চেয়ে বোঝাটা জরুরি। উপলব্ধিটা বড় দরকারি। ‘সাতখণ্ড রামায়ণ শেষে সীতা কার বাপ’ — এমন অবস্থা হলে মুশকিল। এ ব্যাপারে সময় যদি থাকে পাওলো ফ্রেইরি পড়ে দেখতে পারেন।

পাওলো ফ্রেইরি বলেছেন মনের দাসত্ব থেকে মুক্তির কথা। মন যদি দাস হয়ে থাকে বাহ্যিক মুক্তির কোনো মূল্য নেই। তসলিমাদের মন সেই দাস হয়ে আছে। ‘ইগো’র দাস, বিভ্রান্তির দাস। তাদের ‘ইগো’ হলো বোরকামুক্ত করা। তারা সে ইগোটাই ধরে আছে। তারা গাউনমুক্তির কথা বলবেন না। এমন কী হ্যাটে নিজের চুল ঢাকা পড়লেও তাতে কিছু যায় আসবে না। শুধু যায় আসবে হিজাবে চুল ঢাকা পড়লে। এই যে বৈপরীত্য, নিজের সাথে নিজের দ্বন্দ্ব— এ বড় সাংঘাতিক। এমন দ্বন্দ্ব ও দ্বন্দ্বওয়ালারা সমাজকে আরো দ্বন্দ্বমুখর করে তোলে। আর সে দ্বন্দ্ব থেকে অমৃত উদগীরণ হয় না, হয় গরল।

পুনশ্চ : কেউ প্রশ্ন করে বসতে পারেন, এর আগে তসলিমার কথায় সমর্থন করলেন, লিখলেন তবে এখন আবার বিরোধিতা কেনো। আমাদের ঝামেলাটা এখানেই আমরা মূলত সমর্থক এবং তাও আবার অন্ধ। যাকে পছন্দ করি তার সব ভালো। ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’। একে বলে ‘ডগমাটিজম’। মতান্ধতা। তসলিমা কী সব খারাপ কথাই বলেছেন? না বলেননি। তিনিও আমাদের সমাজের অনেক দিক তুলে ধরেছেন, যা সংশোধনযোগ্য। আবার এমন কিছু কথা বলেছেন যা সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে উদ্বেগজনক। যেমন বোরকার বিষয়টিকে বলছি ‘উস্কানিবাদ’। কারণ এর পেছনে কোনো শক্ত লজিক নেই। যা আছে তা হলো গতানুগতিক ইসলামফোবিয়া ছড়ানোর কূটকৌশল।

ফুটনোট: রবীন্দ্রনাথকে কারো কারো ‘কালচারাল গড’ বলেছি। কেনো বলেছি এ ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ইবাদতের সাথে তুলনা করার সাথেই ফুরিয়েছে। সুতরাং এ নিয়ে বিতর্ক তোলা এবং করা মানে সময়ের অপচয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বাংলা/এসএ/

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0843 seconds.