• ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:৪৮:৫১
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২১:৪৮:৫১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

পুরুষতন্ত্র, নারীবাদ ও আমাদের কথিত নারীবাদীরা

প্রতীকী ছবি


কাকন রেজা:


যারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলে গলা ফাটান কারণে অকারণে, তাদের সম্ভবত লালমনিরহাটের খবরটি পড়া হয়ে উঠেনি। দুলাল চন্দ্র রায় নামে এক কৃষক স্ত্রীর কথায় হাতি কিনেছেন। না, তার হাতি কেনার ক্ষমতা রয়েছে বলে নয়, জমিজমা যা ছিলো বিক্রি করে কিনেছেন। স্ত্রীর উপর পরমেশ্বর ভর করেছেন, এমনটাই জানিয়েছেন তার স্ত্রী এবং সেই পরমেশ্বরই হাতি কেনার নির্দেশ দিয়েছেন। বউকে বিশ্বাস করেন দুলাল এবং মানেনও। তাই যা বলা, লাখ টাকায় হাতি কিনে ফেলেছেন। সাথে পনেরো হাজার টাকা বেতনে মাহুতও রেখেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ থাকলে হয়তো দারুণ একটা লেখা পেতাম এর উপর। অনেক নারীরা যে পুরুষদের দিয়ে সাধ্যের বাইরে কত কাজ করায় এ হাতি কেনাই তার নমুনা। এই নমুনার বেশ খানিকটাই দেখেন ঈদ বা পূজোর সময় দোকানিরা। তাদের চোখের সামনেই কালো মুখে টাকা বের করে দিতে হয় পুরুষদের। না হলে বাড়িতে টেকা দায়। এটা কমন ব্যাপার, বেশির ভাগ পুরুষই এমন অবস্থার সাথে পরিচিত। ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’র প্রবাদটিও বোধহয় এমন অবস্থা থেকেই। উৎসবে বউয়ের আবদার মেটাতে দাদন ব্যবসায়ী কিংবা হালের ক্ষুদ্র ঋণওয়ালাদের কাছে হাত পাততে হয় পরিবারের কর্তাদের। এটা হলো সাধ্যের বাইরের চেষ্টা। এই চেষ্টাদৃশ্যও কমন।

এমন দৃশ্য বেশি পরিচিত হয়ে যাওয়ায় সম্ভবত কারো গায়ে লাগে না। পুরুষের সাধ্যের বাইরের চেষ্টার মনোকষ্ট কথিত নারীবাদীদের কষ্ট বা চিন্তার কারণ হয় না। তাদের যত চিন্তা বোরকা, হিজাব আর ধর্ম নিয়ে। বিশেষ করে ইসলাম বিষয়ে। অনেক নারীবাদী ভদ্রলোক-মহিলা রয়েছেন। অবশ্য তাদের নামের আগে ভদ্র বিশেষণটা যোগ করাও অতিরিক্ত ভদ্রতা। কারণ অন্যদের যারা কটু বাক্যে অপমানিত অপদস্ত করতে চান, তাদের ভদ্রতাটা মূলত প্রশ্নবোধক। যেমন আপনাকে যদি কেউ হঠাৎ করেই ‘ফালতু, মূর্খ’ এমন শব্দে আখ্যায়িত করেন তখন আপনি কী বলবেন? এই যে অযাচিত শব্দ প্রয়োগে মানুষকে ছোট করার চেষ্টা। চিন্তার বৈপরীত্যকে লজিক দিয়ে মোকাবেলা না করে, আবেগের ঢং এবং গালি দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা। এমন চেষ্টা অত্যন্ত গর্হিত এবং অবিবেচনার।

কদিন আগে গণমাধ্যমে দেখলাম ইসরায়েলি নারীরাও বোরকা-হিজাব পরছেন। ইহুদি এসব নারীরা বলছেন, ধর্ষ ও মর্ষকামী পুরুষদের কাছ থেকে রক্ষা পাবার জন্য তারা বোরকা পরেছেন। কথিত নারীবাদীদের বলতে ইচ্ছে করে, আপনারা কি সেই পুরুষ, যাদের জন্য ইহুদি নারীরাও বোরকা পরছেন! তাই বলি, নারীদের পোশাক খোলার চেষ্টা না করে কথিত নারীবাদী ভাই-ব্রাদাররা যদি নিজেদের দৃষ্টি সংবরণ করার চেষ্টা করতেন তাহলে বোধহয় সত্যিই বোরকা পরার আপদকালীন প্রয়োজন উঠে যেত। যেটা থাকতো সেটা হতো স্রেফ পোশাক বা ফ্যাশন। কিংবা প্যাশনের জায়গা থেকেও পরতে পারতো। আর যে প্যাশন সামাজিক ভাবে ক্ষতির কারণ নয়, সে প্যাশনের ব্যাপারে আপত্তি থাকাটা অসভ্যতা।

আমাদের দেশে অদ্ভুত রকমের এমনি এক নারীবাদ চালু রয়েছে। যে নারীবাদের লক্ষ্য শুধু পোশাক নিয়ে টানাটানি। ইসলাম নিয়ে গুতোগুতি। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সিদুঁর পরার রীতি রয়েছে। এই রীতি শুধু ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিকও। অবশ্য ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ আবার সিদুঁর পরেনও না। এখন যদি কেউ বলেন, সিদুঁর মানে পুরুষতন্ত্রের দখলের নিশান। ‘এই নারী একজন পুরুষের, তাতে অন্য কেউ নজর দেবেন না’ সিদুঁর এমনটাই বোঝায়, তাহলে তাকে কী বলবেন! এমন চিন্তার বিপরীত চিন্তা কী? সেটা হলো, এই নারী সবার, এটা মেনে নেয়া। না হলে সিদুঁরের মতন একটা সাংস্কৃতিক অনুশীলন যা সমাজের ক্ষতি করে না তার বিপক্ষে বলার মানে তো এমনটাই।

হিজাব নিয়ে বলার আগে আমাদের কথিত নারীবাদীরা একটু দেখে নিতে পারেন, ইসলাম ধর্মের অনুসারী বা আমাদের মতন সাংস্কৃতিক আচরণে অভ্যস্ত নয় এমন মানুষেরাও মাথা ঢাকেন। সেটা হিজাব নামে না হলেও। আর সেসব দেশের মানুষ কথিত নারীবাদী নয়, মানবিক মানুষ। ওই দেশের নামও উন্নত দেশগুলির উপরের দিকে। শিক্ষা-দীক্ষাতেও তাই।

পুরুষতন্ত্র বলে চিল্লানোর আগে সংস্কৃতি বিষয়টিকে বোঝা দরকার। কোনটা সাংস্কৃতিক আচরণ সেটাও আত্মস্থ করা দরকার। কোরবানির গোশত বিলানো ধর্মীয় আচরণ। অথচ বিপরীতে শবে বরাতের রাতে হালুয়া-রুটি বিলানো সাংস্কৃতিক আচরণ। অথচ দুটোই পরহিতে। মানুষের ভালোর জন্য। এর বিরোধীতা করা বোকামি। হ্যাঁ, বিরোধীতা করতে পারেন এবং তাকে ক্ষতিকরও বলতে পারেন যদি কোরবানীর গোশত জোর করে অন্য ধর্মের লোকদের দেয়া এবং খেতে বাধ্য করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত তা না করা হবে ততক্ষণ তার বিরুদ্ধে বলা অন্যায়, অশোভন।

যাক গে, পোশাকের কথায় আবার আসি। রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরবাড়ির লোকজন মানে মহিলারা বাঙাল ও বাঙালিদের শাড়ির সাথে ব্লাউজ-পেটিকোট পরা শিখিয়েছেন। (এখানে বাঙাল ও বাঙালি বিষয়টি নিয়েও আলাপ রয়েছে যা আরেক সময় করা যাবে।) কথিত নারীবাদীদের যদি প্রশ্ন করি ঠাকুরবাড়ি কি ভুল করেছে? তাহলে কিন্তু মুশকিলে পরে যাবেন। কারণ ঠাকুরবাড়ি আপনাদের তীর্থ। বাংলাদেশের লালমনিরহাটের দুলাল চন্দ্র রায়ের স্ত্রীর উপর ভর করা পরমেশ্বরের মতন রবি ঠাকুর আপনাদের উপর ভর করে রয়েছেন। রবি ঠাকুরের পরিবার আবার এই ঢাকাঢাকির ব্যাপারটা নিয়েছে বিলাত থেকে। আমাদের কথিত নারীবাদীদের দু’চারজনও সেই বিলাত থেকেই পাশ করা।

১৯২০ সালের দিকে জার্মানিতে শুরু হয়েছিল ন্যুডিস্ট মুভমেন্ট। এই মুভমেন্টের মূল কথা হলো, কাপড় কোনো লজ্জার বিষয় নয়। জার্মানির মতন দেশে শুরু হওয়া এমন একটি আন্দোলন কিন্তু সেসব দেশেও সফল হয়নি। মানুষ কাপড় খুলে ফেলেনি। যত আধুনিকই হোক না কেন, যত স্বল্প বসন বা বসনাই হোক না কেন, অন্তত প্রকাশ্যে তারা লজ্জাস্থানগুলো ঢেকে রাখছে। হ্যাঁ, ন্যুডিস্টরাও রয়েছেন যাদের হাতেগোনা যাবে। আমাদের দেশের সেই কথিত নারীবাদীদের মতন।

সভ্যতার মূল শুরুটা কাপড় আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে, সারা বিশ্বের সিংহভাগ মানুষই তা মনে রেখেছেন। দেখুন তো, বিশ্বের যারা বিজ্ঞান, রাজনীতি বা অর্থনীতিতে সফল তাদের কেউই ন্যুডিস্ট কিংবা তাদের খুব স্বল্পবসনে দেখা গেছে কিনা। এই যে, জাতিসংঘে ভাষণ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধানদের কেউ কি অনাবৃত বা স্বল্পবসনে সেখানে যাবেন? যাবেন না তো। জানি, এর জবাবে কথিত নারীবাদীরা সমুদ্রস্নানের কথা বলবেন। অতি বিত্তবানদের সুইমিং পুলের কথা বলবেন। তাদের বলি, কথিত নারীবাদের সাথে আপনারা ‍পুঁজিবাদকেও গালাগালি করেন, আবার কাপড় খোলার ব্যাপারে সেই পুঁজিবাদেরই দ্বারস্থ হন। বিত্তশালীদের বেশিরভাগই ধনীলোক ঠিকই কিন্তু বড়লোক নন। হলেও এমন কম্বিনেশন হাতেগোনা। বড়লোক হলে বিশ্বের অল্পকিছু মানুষের কাছে সিংহভাগ সম্পদ কুক্ষিগত থাকতো না।

সম্পদের আলোচনা অন্য সময়ের জন্য থাক। তারচেয়ে কাপড় খোলার ইচ্ছা বিষয়ে বলি। আচ্ছা, পোশাকের সাথে অবদমনের কী সম্পর্ক! এই যে পুরুষদের মধ্যে যারা সফল, তারা যে স্যুটকোট নানা কিছু গায়ে চাপিয়ে বিভিন্ন মিটিং-সিটিং করে বেড়ান তারা কি অবদমিত? তাহলে নারীদের অবদমিত নয় প্রমাণ করতে স্বল্প-বসনা হতে হবে কেন? অদ্ভুত চিন্তা না? এমন চিন্তায় না আছে লজিক, না আছে দালিলিক কিছু। রয়েছে বস্তাপচা কিছু কথামালা আর দরদের ঢং। সাথে কটু কথায় অন্য চিন্তার মানুষদের ঘায়েল করার প্রয়াস। এজন্যেই বললাম এসব লোকের আগে ‘ভদ্র’ বিশেষণটা বসানো নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা উচিত।

শেষের কথা, নারীবাদী সাজার চেয়ে নারীবাদী হয়ে উঠার চেষ্টা করাটাই মঙ্গলজনক এবং তা মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। নারীদের পেছনে থাকার মূল বিষয়টা খুঁজে বের করার চেষ্টাটা দরকারি। সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট মহিলা এবং তিনি হিজাব পরেন। অথচ সেই সিঙ্গাপুরকেই সবাই উন্নতির মডেল মানেন। প্রেসিডেন্টের হিজাব সিঙ্গাপুরের উন্নতিকে পিছিয়ে দেয়নি। সুতরাং কথিত নারীবাদের নিজ চিন্তার সাথেই নিজেদের সংঘাত রয়েছে। এ থেকে বেড়িয়ে না এলে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য সত্যিকার অর্থেই কাজ করা সম্ভব হবে না। শুধু নারীবাদের নামে বাকোয়াজই হবে।

পুনশ্চ: কেউ আবার ভুল বোঝার বা বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। নারীদের প্রতি সহিংসতা, অত্যাচারের কথা মাথায় রেখেই এ লেখা এবং এ লেখা ঘটে যাওয়া সেসব ঘটনার কোনো ভাবেই বিরুদ্ধে নয়। সে সহিংসতা ও অত্যাচারের কথা আমিও বলেছি। প্রতিবাদ জানিয়েছি, প্রতিরোধের কথাও বাদ যায়নি। তবে এ লেখায় শুধু সেটাই বলার চেষ্টা করেছি যা কেউ সহজে বলতে চান না অথবা প্রয়োজন মনে করেন না। ফলে না বলা কথাগুলো ক্ষোভের সৃষ্টি করে, প্রতিহিংসার সৃষ্টি করে। গণমাধ্যমে অনেক ঘটনা রয়েছে, ‘স্ত্রী-সন্তানদের ঈদের কাপড় কিনে দিতে না পারায় স্বামীর আত্মহত্যা’র। বিপরীতে রয়েছে, ‘পোশাক না পেয়ে স্ত্রী বা সন্তানের আত্মহত্যা’র কথাও। দুটোই বেদনার। এই বেদনার পেছনের কথা তুলে আনার জন্যই এ লেখা। এ লেখা সত্যিকার নারীবাদের পক্ষে, ঢংয়ের বিপক্ষে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0790 seconds.