• ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:৫০:৫৬
  • ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:৫০:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

প্রতিশ্রুতি, প্রলোভন ও ধর্ষণ

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা:

বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে সহবাস ধর্ষণ কিনা, এ বিষয়ে ভারতের বম্বে হাইকোর্ট চিন্তার খোরাক জোগায় এমন একটি রায় দিয়েছিল। আর রায়টি দিয়েছিলেন যে বিচারপতি তার নাম মৃদুলা ভাটকার। ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি এক ধর্ষণ মামলার নিষ্পত্তিতে রায়টি দেন তিনি। তার রায়ে পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস ধর্ষণ নয়। উভয়ের সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক ধর্ষণ বলে গণ্য করা যাবে না।’

এর আগে ২০১৩ সালের ২০ মে আরেকটি মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল এ বিষয়টি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে উভয়ের সম্মতিতে সহবাস হলে তাকে ধর্ষণ বলা যাবে না। ভবিষ্যতে যদি ওই নারী-পুরুষের বিয়ে নাও হয়, তা হলেও তাকে কোনোভাবেই ধর্ষণ বলে গণ্য করা যাবে না।’ 

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে ‘ব্রিচ অফ প্রমিস ‍টু ম্যারি’ আইনটি রহিত হয়ে গিয়েছিল। এ ব্যাপারে আইনি ব্যাখ্যা ছিলো, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নারী স্বেচ্ছায় যে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, সে সম্পর্ক ভাঙলে তাতে আদালত নাক গলাবে না। কেন গলাবে না সে বিষয়েও জানিয়েছে আদালত। তা হলো- প্রাপ্ত বয়স্ক এবং মানসিক প্রতিবন্ধী নয় এমন কোনো নারী-পুরুষ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়ালে এবং তা ভেঙে গেলে তাকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ বলে গণ্য করা যাবে না এবং তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন আচরণ হিসাবেও চিন্তা করা যাবে না।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণও অনেকটা তাই। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরণের মামলায় বিয়ের প্রতিশ্রুতিকে প্রলোভন বা ফুসলানো হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের এমন পর্যবেক্ষণ উন্নত বিশ্বের ধারা এবং ধারণাতেই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং মানসিক ভাবে সক্ষম মানুষকে প্রলোভনে তথা ফুসলিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যায় এটা মানতে নারাজ ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ও বম্বে হাইকোর্ট। একজন সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ প্রলোভনে ভুলে যাবেন। বিয়ে হবে এ আশায় তার আগেই যৌনমিলনে রত হবেন এটা মানাও আসলে অস্বস্তিকর। মানলে মানুষের বুদ্ধি ও জ্ঞান বিষয়ক সংজ্ঞাটাও নতুন করে চিন্তা করতে হয়।

দুজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসবাসের ব্যাপারে আইনগত কোনো বাধা থাকার কথা নয়। কারণ এতে কোনো অপরাধ সংঘটনের ব্যাপার নেই। যা রয়েছে তা সামাজিক বাধা। সামাজিক বাধার কারণেই কোনো সময় পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। আর এই সামাজিক বাধার বিষয়টি মূলত আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই প্রবল। যার ফলে এটিকে অপরাধ হিসাবে অনেকে ভুল গণ্য করে থাকেন। 

যাক গে, ধর্ষণের সংজ্ঞায়নের ব্যাপারে ভারতীয় আদালতের ব্যাপারটি আবার সামনে আনি। ধর্ষণ শব্দটির সাথে অনিচ্ছা ব্যাপারটি জড়িত এবং অনিচ্ছার সাথে জোর শব্দটি। অর্থাৎ জোর প্রয়োগে যে যৌনমিলনের কাজটি হয় তাই মূলত ধর্ষণ। একজন পতিতাকে জোরপূর্বক যৌনমিলনে বাধ্য করাটাও ধর্ষণ। কিন্তু সেক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে যৌনমিলন হলে এবং পরবর্তীতে তাকে জোর হিসাবে অভিহিত করা হলেই মুশকিল। তখন সংজ্ঞা নির্ধারণ জটিল হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে একজন নারীর অভিযোগই যেখানে বিবেচ্য বিষয় হিসাবে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে ‘মার্কস অব ভায়োলেন্স’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা উচিত। জোর করতে গেলে বাধার প্রশ্ন উঠে আর বাধার প্রশ্নের সাথে আঘাতের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং ধর্ষণের অভিযোগের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারগুলো সুক্ষ্ম ভাবে যাচাই করা আবশ্যক হওয়া উচিত। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আবশ্যকতার সঠিক প্রয়োগ হয় কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

জোর না হলে ধর্ষণের অভিযোগ অনেকটাই অর্থহীন। সম্ভবত সে কারণেই আধুনিক বিশ্বে ‘ব্রিচ অফ প্রমিস টু ম্যারি’ বিষয়টি উঠে গেছে। ভারতীয় আদালতের বিচারকগণও সেই ধাঁচেই তাদের রায় দিয়েছেন। আদালত বিভিন্ন রায়কে উদাহরণ হিসাবে ধরে নিয়ে অন্য মামলার বিচারে তা প্রয়োগ করেন। পর্যবেক্ষণে সে কথা উল্লেখও করেন। ভারতীয় আদালতের রায়ও সেই উদাহরণের একটি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0826 seconds.