• ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:২৪:৫৩
  • ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:২৪:৫৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

জীবে দয়া, নামে রুচি

ফাইল ছবি


ডা. পলাশ বসু : 


‘জীবে দয়া, নামে রুচি বৈষ্ণব সেবন/ ইহা হতে ধর্ম আর নাহি সনাতন’ এই হচ্ছে বৈষ্ণবের সারকথা। এখানে জীবের প্রতি দয়া, বৈষ্ণবদেরকে খাবার প্রদান এবং কৃষ্ণ নাম সংকীর্তনের কথা বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে- এ দুটোর চেয়ে নাকি আর কোন বড় কিছু সনাতন তথা হিন্দুধর্মে নেই।

অবশ্য জীবের প্রতি দয়ার কথা সব ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীতেই বিরাজমান। যদিও ধর্মতাত্ত্বিকভাবে জীবজন্তুর প্রতি ভিন্ন রূচি, আবেগ এবং ভালবাসারও ভিন্নতা রয়েছে। তবুও জগতশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে দাবিদার মনুষ্য প্রজাতির এই জীবে দয়া কি তার দয়াশীল মনোভাবের প্রকাশ, নাকি প্রচ্ছন্ন প্রভুত্ব বিস্তারের খোলসে আবদ্ধ তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হলেও হতে পারে।

‘নামে রূচি’ বলতে ঠিক কি বোঝানো হয়েছে সেটাও বলেছি আগেই। এটা বৈষ্ণবদের নাম সংকীর্তনের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে। তার মানে হচ্ছে, জীবের প্রতি দয়া আর স্রষ্টার নাম স্মরণ করাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম। তাহলে আমরা যে উদরপূর্তির জন্য ছাড়াও ধর্মীয় কাজে পশু বলি বা কোরবানি করি সেটা কি অধর্ম? সেটা কি জীবের প্রতি দয়াহীনতার প্রকাশ?

আমার মনে হয় খাদ্য শৃঙ্খলের বাস্তবতা এবং সাথে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুসঙ্গ হিসেবে জীব হত্যাকে বৈধই মনে করা হয়ে থাকে। তার মানে দাঁড়ালো- খাদ্য আহরণের (ও ধর্মের বিধিবিধান রক্ষাকল্পে)  প্রয়োজনে জীব হত্যা অন্যায় নয়। তাদের লালন-পালনের সময় কিন্তু তাদের প্রতি হিংস্রতা বা কঠোরতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং যত্নের সাথে তার লালন-পালন করাই উচিত।

সম্প্রতি বেওয়ারিশ কুকুর ধরে পুনর্বাসন বা হত্যা করা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পক্ষে-বিপক্ষে বেশ বাদ প্রতিবাদ চলছে। একপক্ষ বলছে এই নিধন ঠিকই আছে। কারণ বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে অনেকেই আহত হচ্ছে৷ চিকিৎসা না করালে বা বিষয়টাকে হেয় করে দেখলে এ থেকে জলাতঙ্ক হয়ে মৃত্যুও হতে পারে। অন্য পক্ষ বলছে, এটা অন্যায়। রীতিমতো কুকুরের প্রতি এ এক ধরণের নিষ্ঠুরতা। এটা করা সঙ্গত নয়।

সব আলাপ আলোচনা দেখে শুনে আমার কাছে কোন পক্ষের কথাই অন্যায় মনে হয়নি। বরং দুপক্ষের কথারই যে শানে নুযূল রয়েছে সেটা আরো পরিষ্কার হয়ে উঠলো। আমার ব্যক্তি অভিজ্ঞতার কথাই বলি। আমার বাসার লাগোয়া সামনের রাস্তায় ৫/৬ টা কুকুরের সংঘবদ্ধ দল আছে। আবার রাস্তার ওপাশেও এমন ৫/৬ টা কুকুরের সংঘবদ্ধ দল আছে। এছাড়াও এ ব্লকে  আরো এ রকম কয়েকটা গ্রুপ আছে। কাউকে কামড়েছে তা অবশ্য শুনিনি বা কামড়ালেও আমার জানা নেই। তবে, গতরাতে আমি যখন বাসায় ফিরে নীচের গেটের তালা খুলছি দেখলাম ৩/৪ টি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এলো এবং তালা খোলার যে সময় সে সময়ে আমার পায়ে মুখ লাগিয়ে শুঁকেও দেখলো। প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি ভয় পেয়েছিলাম? আপনি হলে কি ভয় পেতেন?

উত্তরে বললে বলতে হয় ‘আমি ভয় পাইনি’, এটা বললে সর্বৈব মিথ্যে বলা হবে। তবে ভয়মিশ্রিত আতঙ্ক নিয়েই মনকে অভয় দিলাম ‘এরা তো এখানেই থাকে। আমাকেও চেনে বোধ হয়। ফলে কামড়াবে না।’ শেষাবধি আমি তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। আমাকে ওরা কামড় দেয়নি ঠিকই। তবে, আমি যে ভয় পেয়েছি অল্প হলেও সেটাও অস্বীকার করতে পারছি নে।

তাহলে সমাধান কী? এ অবস্থায় এ রকম বে-ওয়ারিশ কুকুর কি পাড়া মহল্লায় বাড়তেই থাকবে? ‘জীবে দয়া’ এই সূত্র মাথায় রেখে আমরা এটাকে এভাবে রেখেই দিব? নাকি কোন দায়িত্বশীল সংস্থা এগুলোকে পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিবে? বিশ্বের কিছু কিছু দেশে তো কুকুরের মাংস খাওয়াও হয়ে থাকে। চাইলে কি আমরা সেভাবে ভাবতে পারি? এসব বেওয়ারিশ পশুগুলোকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বড় করে, ব্রিডিং করে এগুলোকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিদেশে রপ্তানি করার সুযোগ কি আমরা নিতে পারি-জীবিত বা মাংস প্রসেসিং যেভাবেই হোক না কেন? সুযোগ যেহেতু সামনে আছে আমরা সেভাবে ভাবতে পারি কিনা!

জানি না আবার এই মাংস প্রসেসিং এর কথা বলাতে কুকুরের প্রতি কোন নির্দয়তা দেখানো হলো বলে কেউ আবার আমার নিন্দা করেন কিনা! এরও বিকল্প তাহলে আসুন ভাবি। তাহলে যেটা করা যেতে পারে তা হলো এগুলোকে নিয়মিত জলাতঙ্করোধী টিকা দিয়ে রাখতে হবে। এতে করে ওরা কামড়ালে জলাতঙ্ক হবে না ঠিকই তবে শারীরিক ইনজুরি ও মানিসক ভীতি তো আর ঠেকানো যাবে না! প্রশ্ন হচ্ছে এই টিকা দেয়াটা কি সম্ভবপর হবে? বা চাইলে কেউ নিয়ে গিয়ে যথাযথভাবে এগুলো যেন পুষতে পারে সে উদ্যোগ কি নেয়া যেতে পারে? সেক্ষেত্রে ছোট অবস্থায়ই এদেরকে দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে এই বে-ওয়ারিশ কুকুরগুলো তাহলে আর বে-ওয়ারিশ থাকে না। ওয়ারিশভুক্ত হয়ে যেতে পারে সহজেই।

আজ সকালে দেখলাম বসায় ছোট্র এক বিড়ালের বাচ্চা!  বুঝলাম গত রাতে ঘরের পেছনের দরজা খোলা থাকার কারণে মা বিড়াল হয়ত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তার সদ্যজাত বাচ্চাকে আমার বাসার এক রুমে রেখে গেছে। সমস্যা হচ্ছে, আমরা যখন আজ সকালে দেখেছি তখন ওকে ভাত খেতে দেয়া হলো। কিন্তু ও তাতে মুখে ছুঁইয়েও দেখেনি। হতে পারে ও ভাত খেতে পারে না। ওকে দুধ খেতে দিতে হবে হয়তো। এরই মাঝে ওর মা এসেছিল। অন্যরুম থেকে আমাদেরকে দেখে মুখটা খিচিয়ে উঠলো। পরে অবশ্য চলে গিয়েছে। এখন পড়েছি এক মুশকিলে। আমরা বাচ্চাটাকে নিয়ে যত্নআত্তি করতে গেলে ওর মা কাছে আসার সুযোগ পাবে না। এতে ওর কষ্ট হবে। এগ্রেসিভও হয়ে উঠতে পারে এর ফলে। এদিকে আমার ছোট্র মেয়েটি তো ওকে এখন পুষতে চায়। পড়েছি উভয় সংকটে! এই এতটুকু বাচ্চাকে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করাটা যেমন অমানবিক তেমনি মেয়ের বারবার আবদারে আমি ঠিকই বিভ্রান্তও হচ্ছি।

কারণ মেয়ের কথা ও ‘জীবে দয়া’ করতে গেলে বাচ্চাটাকে ওর মাকে হারাতে হবে। আর মাকে হারাতে হবে তার সন্তানকে! কাজটা অমানবিকই তো হবে, নাকি? ফলে ভাবনায় পড়েছি আমি এখন একে ওয়ারিশভুক্ত করে নিবো নাকি সামনে একে বেওয়ারিশ হওয়ার রাস্তায় ওর নিয়তির মতো করে ওকে বেড়ে উঠতে দিবো- তা নিয়ে আছি এক চরম মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায়!

লেখক : চিকিৎসক ও শিক্ষক, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এনাম মেডিকেল কলেজ।

 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

জীবে দয়া ডা. পলাশ বসু

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0823 seconds.