• ০২ অক্টোবর ২০২০ ১৩:০৫:৩৫
  • ০২ অক্টোবর ২০২০ ১৩:০৫:৩৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ধর্ষণেও শ্রেণি বিভাজন এবং বিভাজনের ‍বুদ্ধিজীবী

কাকন রেজা। ফাইল ছবি


কাকন রেজা:


গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী রাজশাহীতে গির্জার ফাদার এক কিশোরীকে তিনদিন আটকে রেখে ধর্ষণ করেছেন এবং অপকর্মটি প্রকাশের পর তিনি পালিয়েছেন। এ ধর্ষণের সাথে অন্যান্য ধর্ষণের অমিলটা হলো, একজন ধর্ম যাজক, যিনি পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য কথা বলেন, কাজ করেন, তিনি এই দুষ্কর্মটি ঘটিয়েছেন। একজন ইমামের ক্ষেত্রেও তাই এবং পুরোহিতের ক্ষেত্রেও। একজন শিক্ষকও এর ব্যতিক্রম নন। একজন শিক্ষার্থী সেও নয়। কারণ সে আলোকিত হতেই শিক্ষালয়ে আসে। ঘুরে ফিরে দেখুন অপরাধ সবার একই। এখানে বিশেষ শ্রেণি খুঁজে বের করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এদের কারোরই অপরাধী হবার কথা নয়। অপরাধীদের অপরাধ অভ্যাসে পরিণত হয়। অপরাধীরা সরাসরি দুষ্কর্ম করে। অন্যদের কেউ কেউ সুযোগের অভাবে চরিত্রবান। এ আলাপে পরে আসছি।

ধর্ষকদের শ্রেণি বিভাজনের মতন অনেকেই আবার নির্যাতিতাদেরও শ্রেণি বিভাজন করেন। ট্রাইব হলে আলাদা কিংবা স্বল্পসংখ্যার সম্প্রদায়ের হলেও আলাদা দলে। এখানে ‘স্বল্পসংখ্যা’ বিষয়ে ব্যাখ্যাটি দিয়ে নিই, তাহলে বলতে সুবিধা হবে। মানুষকে সংখ্যার ভিত্তিতে গুরু ও লঘু বলতে আমার বাধে। গুরু ও লঘু শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয় সংখ্যা নিরুপণ নয়, মান নিরুপণে। সুতরাং যারা মানুষকে এই দুই শব্দে বিভাজিত করেন তারা হয় ঝাঁকের কই নয় উদ্দেশ্যবাজ (ধান্ধাবাজ শব্দটার বিকল্প)।  

পাহাড়ে একজন প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষিতা হয়েছেন। তার পরপরই সমতলেও ধর্ষিতা হয়েছেন আরেক প্রতিবন্ধী নারী। সেই ধর্ষণের ব্যাপারটি আপোসের চেষ্টাও হয়েছে এবং তা টাকার বিনিময়ে। বিপরীতে পাহাড়ের নারীটি ধর্ষিতা হয়েছেন সরাসরি অপরাধীদের দ্বারা। যারা ডাকাতি করতে গিয়ে অপরাধ ঘটিয়েছে। সমতলের নারী ধর্ষিতা হয়েছে ছুপা রুস্তম মানে সুযোগের অভাবে চরিত্রবানদের দ্বারা। এখানে অপরাধের ধরন আলাদা কিন্তু অপরাধ একই। দুজন নারীই প্রতিবন্ধী। দুজনেই ধর্ষিতা।

এক্ষেত্রে অনেকের বক্তব্য হলো, পাহাড়ি নারীটির ঘটনাটিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। যেহেতু সে পাহাড়ি এবং তাদের ভাষায় আদিবাসী। যদিও সংবিধান আদিবাসী শব্দটিকে অব্যবহারযোগ্য করেছে। প্রশ্নটা হলো, পাহাড়ি নারীর ক্ষেত্রে কেন বিশেষ নজর দিতে হবে। সে সংখ্যায় স্বল্প বলে। তবে তো সেই গির্জার ফাদারের বিষয়েও আলাদা ব্যবস্থা নিতে হয়, কারণ সেও স্বল্পসংখ্যার কাতারে। হয় তাকে বেশি শাস্তি দিতে হয়, না হলে কম। তা কি সম্ভব? কথা বলতে গেলে লজিক্যালি বলা উচিত। বিচারের সময় আবেগের চোখে কালো কাপড় বাঁধতে হয়।

কদিন আগে নীলা নামের একটি মেয়েকে খুন করেছে এক নেশাসক্ত বখাটে। নীলাও স্বল্পসংখ্যার সম্প্রদায়ের। এখানেও অনেকে গুরু ও লঘুর হিসেবে ধর্ম ব্যাপারটি টেনে এনেছেন। এক্ষেত্রে যদি খোঁজা যায় তবে এমন অনেক ঘটনাই পাওয়া যাবে, যারা বেশি সংখ্যার সম্প্রদায়ের মেয়ে বা নারী। বাসে যে তরুণীকে ধর্ষণ করে খুন করা হলো সেও বেশি সংখ্যার সম্প্রদায়ের। যে নারীকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে সেও বেশি সংখ্যারই। সুতরাং এমন ক্ষেত্রে ধর্ম বড় হয়ে দাঁড়ায় না, লিঙ্গ বড় হয়ে দাঁড়ায়। নীলা যেমন মেয়ে অন্যরাও মেয়ে বা নারী। ধর্ষ আর মর্ষকামীর কাছে এটাই বিবেচ্য বিষয়। যারা এখানেও গুরু ও লঘু ভাগ করেন তারা অপরাধের সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে গবেষণায় বসতে পারেন।

এদেশে ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নামে মানুষ দুর্বল হয় না। দুর্বল হয় রাজনৈতিক কারণে। স্বল্পসংখ্যার অনেক মানুষও প্রবল শক্তিমান এ দেশে তার কারণও রাজনৈতিক। শক্তিমান নির্ধারিত হয় পলিটিক্যালি। সুতরাং মোটা দাগে যারা স্বল্পসংখ্যা বেশি সংখ্যার হিসেব করেন তাদের অঙ্কের অনেকটাই ভুল। গৃহপরিচারিকা দুর্বল বলেই তাকে রেইপ করে, ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেয়া যায়। ছাদের উপর থেকে নিচে ফেলে দেয়া যায়। সেখানে তার ধর্ম বা সম্প্রদায় বড় হয়ে দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় তার অবস্থানগত দুর্বলতা। তেমনি স্বল্পসংখ্যার মানুষদের কারো দুর্বল অবস্থানের জন্যই তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়, নিহত হতে হয়। অথচ সেই মানুষ বা নারীটিই পলিটিক্যালি সবল হলে তাকে স্পর্শ করার সাহস কারোরই হয় না। সুব্রত বাইন স্বল্পসংখ্যার মানুষ হয়েও শীর্ষ সন্ত্রাসী হয়। তার কারণও পলিটিক্যাল। অতি বুদ্ধিমান কিছু মানুষই মোটা দাগে অবুঝ বিভাজনে মাতেন। সংখ্যা গুরু ও লঘু বলে জিকির তোলেন। তাদের এই বিভাজনের পেছনে থাকে উদ্দেশ্য। আর এমন উদ্দেশ্য সবসময়ই অমঙ্গলের।

পুনশ্চ: অপরাধকে যখন রাজনৈতিক করা হয়, তখন অপরাধীরা ভয়ংকর হয়ে উঠে। এই যে আমাদের অপরাধের শ্রেণি বিভাজন খোঁজা, তা মূলত অপরাধকে রাজনৈতিক করে তোলে। পক্ষ-বিপক্ষে মানুষকে বিভাজিত করে দেয়। আর বিভাজন কোনো কাজের কথা নয় এবং বরাবরই তা অকাজের। বিভাজিত বলেই আজকে আমাদের বিচারের দাবিতে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়। ধর্না দিতে হয়। ডিলেইড হতে হতে দাবি ডিনাইড হয়ে যায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0802 seconds.