• ০৮ অক্টোবর ২০২০ ২১:৩৫:২১
  • ০৮ অক্টোবর ২০২০ ২১:৩৫:২১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সুইসাইড ভাবনা

ছবি : প্রতিকী


শফিক আহমেদ ভূইয়া :


সুইসাইড করে ফেলতে পারার মতো দুঃসাহস আমার নেই, হয়তোবা কোনো দিনই তা পারবো না করতে। কিন্তু আজ আমি প্রথম বারের মতো ভেবেছি, সত্যি সত্যি সুইসাইড করলে কীভাবে করা যায়! কী কী করতাম মরে যাওয়ার আগে? প্রথমেই ফেইসবুক অ্যাকাউন্টটা ডিলিট করে দিতাম। ওটা রেখে যেতাম না নিশ্চয়ই! ফেইসবুক এমন একটা জিনিস, যা মানুষকে শান্তিতে মরতেও দেয় না।

ভালো কথা, আমি কিন্তু কোনো সুইসাইড-নোট লিখে রাখতাম না। মৃত্যুর আগের মুহূর্তটাকে উপভোগ করতে চাই, লেখালেখির ফ্যাসাদে যাওয়ার কি দরকার? লেখালেখির চাইতে একইসাথে আনন্দের ও ক্লান্তির কাজ আর কি আছে? মৃত্যুর আগে ব্রেইনকে অতো প্রেশার দেবার কোনো মানেই হয় না। আর আমি তো জানি, কিছু একটা লিখে রেখে যাবার মানেই তো ওটা নিয়ে আমার মৃত্যুর পর টানাহ্যাঁচড়া হওয়া। কি হবে শেষলেখাটা লিখে রেখে? আমি এমন একটা মানুষ, যার মনের কথাগুলি কেউ তার জীবিতাবস্থাতেই বুঝল না, তো সেই আমার মৃত্যুর পর তাকে বুঝবে, এমন কেউ আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। যে আমাকে আমার প্রাণটা শরীরে আটকে থাকার ‘এই দীর্ঘসময়’টাতে বুঝল না, মৃত্যুর পর সে আমাকে বুঝুক, এটা আমি চাই না।

মাঝখান থেকে আমার পরিবারটা কিছু অহেতুক ঝামেলায় পড়ে যাবে। ফেইসবুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবার পরপরই দেরি না করে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলতাম। আমি যদি বেঁচে গিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করতাম, তবে আমার বোন আমার অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কাঁদত। ওকে দেখে আমার চোখেও অবিরাম জল ঝরত।

আচ্ছা, মৃত্যুর আগে আমার কি কারো সাথে দেখা করতে ইচ্ছে হতো? মনে হয় না! এমনকি, মরে যাবার আগেই, মরে যাব জানলেও, অবন্তিকেও দেখতে চাইতাম না! যে আমাকে তার মন থেকেই মুছে ফেলেছে, তাকে শেষদেখাটা দেখতে চাইবার কিছু নেই। এমনো তো হতে পারে, মৃত্যুপথযাত্রী প্রাক্তনকে দেখে সে বরং বিরক্তই হতো! যে দীর্ঘ ১০ বছরে শাসন আর অভিমানকে অভিযোগ বলে চিহ্নিত করেছে, সে আমাকে ভ্রুক্ষেপও করবে না। শুধু শুধু তাকে বিরক্ত করে লাভ কি...

হ্যাঁ, তোমাকে সামনাসামনি দেখতে না পারার অপূর্ণতা হয়তো থাকত। তোমাকে আমার মাঝেমধ্যে খুব কাছের কেউ মনে হয়। আবার যেন স্বাধীন ওই আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা করার মূলমন্ত্র তুমি। পরিবারের বাইরে যে কয়েকটি মানুষ আমাকে একটু হলেও অনুভব করেছেন, তুমি তাদের একজন। অবশ্য, এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা, ভুলও হতে পারে।

আমি ওরকম কোনো অবস্থায় গেলে তানভীর ভাইয়ের অবস্থানটা আগেই কল্পনা করে রেখেছি। কিছুদিন আমাকে ফেইসবুকে না পেয়ে হয়তো তিনি ফোন দিতেন। যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতো, তবে কলটা আমার বোন ধরত। তিনি আমার সুইসাইডের খবরটা জানার পর কি উৎকণ্ঠিত হতেন? জানি না! একটা কথা। আপনি হয়তো জানতেনই না যে আমি আর নেই। কিন্তু আমার মৃত্যুর পর যদি কোনোভাবে খবরটা পেতেন, হতে পারে। তখন আপনি খুব মন খারাপ করতেন। মনে মনে বকতেন। তার সাথে আমার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। তিনি আমার জন্য অনেক করেছেন। সাথে আন্নি ভাবিও। তবে তাকে আমি ভাবির চেয়ে আপু বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। কিন্তু বলা হয়ে উঠেনি। আর তানভীর ভাইয়ের কাছে আমি ঋণী। তার ভালো মন্দ সব কিছুই মাথা পেতে চুপচাপ মেনে নিই। আচ্ছা, এমন মেনে নেয়ার নাম কি ভালোবাসা? আমি জানি না।

অবন্তি তুমি হয়ত কয়েক ঘন্টার মধ্যে খবরটা পেয়ে যাবে, খবরটা শুনে তোমার কি মন খারাপই শুধু হত? না কি একটু কষ্টও পাবে? না কি অনেক কষ্ট? না কি ওসব কিছুই না, কেবলই একধরনের নিঃস্পৃহতা, নির্লিপ্ততা বা নির্বিকারত্ব কাজ করত? ফেইসবুকে হয়তো আবারো মৃত্যু নিয়ে তোমাকে লিখতে হতো। মানুষের মৃত্যু নিয়ে মানুষকেই লিখতে হয়। ভাবতে পারেন, মানুষ কতটা অসহায় প্রাণী! আমি মরে গিয়ে আপনাকে কি একটা ঝামেলায় ফেলে দিতাম, তাই না?

এই পৃথিবীতে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন আমার মা। মা আমাকে পেলেপুষে বড়ো করেছেন। আমি যখনই নামাজ পড়ি, তখনই মায়ের জন্য দোয়া করি।

হায়, এখন নিজেই হারিয়ে যাচ্ছি, আর সেই মাকেও হারিয়ে ফেলছি! এই জীবনে কাউকেই ধরে রাখতে পারলাম না, এমনকি নিজেকেও না! এর চাইতে কষ্টের আর কী হতে পারে?

আর একটা থিউরি গত ১ মাস যাবৎ মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আচ্ছা, ছেলে-মেয়ে না হলে কি মানুষের জীবন অপূর্ণ হয়ে যায়? নিঃসন্তান মানুষ কি তবে ব্যর্থ মানুষ? আমার তো তা মনে হয় না। যার সন্তান নেই, তার অনেক দুঃখ থাকতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতা কেন থাকবে? ‘বংশের বাতি’ কথাটাই অদ্ভুত লাগে আমার কাছে। এ বাতি এমন এক বাতি, যা জ্বালা কিংবা নেভার ব্যাপারটাই আমাদের হাতে থাকে না। যে আলোর আসা না আসা কিংবা এসেও চলে-যাওয়া মানুষের হাতেই নেই, তা নিয়ে এতো কেন ভাবে মানুষ? আসলে এমন কিছু ভাবনাই মানুষকে দুঃখী করে রাখে। আমাদের যে ভাবনাটা কিছু নিঃসন্তান মানুষের মনের দুঃখ বাড়িয়ে চলে, কেন আমরা তেমন ভাবনা থেকে সরে আসতে পারি না?

তুমি আমাকে এতোটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাস। এটা দেখে আমার মধ্যে অনুশোচনাবোধ কাজ করে। আমাকে কেউ ভালোবাসে না, এটাও মেনে নেয়া যায়। কিন্তু এমন একজন আছে, যে আমাকে এতোটা গভীরভাবে ভালোবাসে, আর আমি কিনা মানুষটাকে তার সিকিভাগও ভালোবাসতে পারি না, এটা মেনে নেয়াটা ভীষণ ভীষণ কষ্টের। আর আমার মনে হল ১০ বছরে আমি তাকে সিকিভাগও ভালবাসতে পারিনি।

কারো ভালোবাসা না পাবার চাইতে কাউকেই ভালোবাসতে না পারার যে কষ্ট, সেই অনুভূতি ব্যাখ্যা করতে অনেক বড় লেখক লাগবে, আমার পক্ষে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। আমার মনে হয়, কাউকেই ভালোবাসতে না-পারা মানুষ এই পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী ও একাকী মানুষ। যাকে কেউ ভালোবাসে না, তার চাইতে হাজার গুণে একাকী মানুষ হচ্ছে সে, যে কাউকে ভালোবাসতে পারে না। হায়, তার চাইতেও একাকী হচ্ছে সেই মানুষটা, যাকে অনেকেই ভালোবাসে, কিন্তু যে কাউকেই ভালোবাসতে পারে না! তার বেঁচে-থাকাটাই অনেক চ্যালেঞ্জিং! সে সারাক্ষণই কি এক বিবেকের দংশনে পুড়তে থাকে!

ভালো করে খোঁজ নিলে জানা যাবে, তার দেহের জাগতিক মৃত্যু না হলেও কাউকে ভালোবাসতে না-পারার অপরাধে সে মনে মনে কয়েক লক্ষ বার ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছে! আমি যখন চোখের সামনে দেখি, একটা মানুষ আমাকে কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো স্বার্থ ছাড়াই… এমনকি কখনো কখনো আমার অবহেলা ও দুর্ব্যবহার সহ্য করেও, এমন পাগলের মতো ভালোবাসে, যাকে আমি ভালোবাসতে পারি না। তখন আমার মাঝেমধ্যে আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, তাকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে এই যে আমার মনের এমন অবরোধ, দিনের পর দিন নীরবে এটা সহ্য করতে বাধ্য হবার চাইতে বড় অসহায়ত্ব বুঝি আর নেই!

বলে রাখি, এই লেখাটা একেবারেই অবান্তর, এই কারণে যে, যা লিখছি তা ঘটানো হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়, অতোটা বেপরোয়া আমি নই, তবুও লিখছি। তবে আজকাল পৃথিবীকে আর ভাল লাগে না। আমি বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। তাই আত্মহত্যাকেও অবান্তর বলতে পারিনি। আমি যুক্তি দিতে থাকি আত্মহত্যার কারণ নিয়ে।

আমার বাবা মৃত্যুর আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘সারাজীবনই ভেবে এসেছি, মৃত্যুর চাইতে শান্তির বুঝি আর কিছু নেই। মৃত্যু মানেই তো জগতের সমস্ত দুঃখ থেকে মুক্তি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্যই আমি উদগ্রীব হয়ে বেঁচে ছিলাম এতোকাল। অথচ এই মুহূর্তে কেন আমার বার বারই মনে হচ্ছে, এইসব দুঃখ বেদনা যন্ত্রণাকে আঁকড়ে ধরে আরো কিছুকাল বেঁচে থাকি?’

বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মৃত্যুর আগে বাবা আমাকে অনেক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছিলো। মায়ের মৃত্যু আমাকে শিখিয়েছে, মানুষ যত চেষ্টাই করুক না কেন, কোনো উপায়েই সে কাউকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে না। হয় সে নিজে বিদায় নেয়, কিংবা যাকে ধরছে সে বিদায় নেয়। ভবিষ্যতের এই অবশ্যম্ভাবী পরাজয়টা মেনে নিয়ে বেঁচে-থাকার নামই জীবন। বাঁচতে হলে বিদায় জানাতে ও গ্রহণ করতে শিখতেই হবে। বিদায়কে সহজহৃদয়ে মেনে নিতে পারা, এর চাইতে বড় আর্ট আর নেই। এসব কথা বলার মতো কেউ আমার নেই, কোথাও নেই, তাই হয়ত আত্মহত্যার পেছনে যুক্তি স্থাপন করছি।

আমার মনে হয় বন্ধুদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট সোহানকে দিয়েছি। তার কাছে ক্ষমা চাওয়াও আমার দরকার।

আমি যা পাই না, তা নিয়ে অনেক স্বপ্নও দেখে ফেলি। যেমন গতকাল আমি একটা অদ্ভুত রকমের স্বপ্ন দেখে তৃপ্তি পেয়েছিলাম। দেখলাম আমি বিয়ে করেছি। সংসার করছি। আমি ঘুমাচ্ছি না তবে শুয়েছিলাম কাঁথা গায়ে দিয়ে, আমার বউ ডাকল, আমি বললাম- ঘুমিয়ে গেছি আমাকে ডাকবা না। সে খিলখিল করে হেসে বললো, ঘুমিয়ে কেউ কথা বলে নাকি। আমার মনে হলো আমি তাকে সুখ দিতে পারছি। মনে মনে তীপ্তি পেলাম। রাতে ঘুমানোর আগে আমাকে সে বললো, তুমি আমাকে জড়িয়ে না ধরলে আমি ঘুমাতে পারবো না। ভাবলাম আমাকে সে ভরসা করছে। এট কি সুখ? তবে কিছুদিনের মধ্যে সে আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি হলো। আর আমি ভাবলাম সে কি এই সুখগুলোর কথা মনে করবে না? নাকি আমার এই ভাবনা নিচক বোকামি ছিলো। ভাবনা শেষে মনে হল তাকে ছাড়া থাকা অসম্বব। আমি তাকে হত্যা করলাম। যাকে সে বিয়ে করবে বলে ঠিক করলো। পরে আমি জেলে। এমন সময় ছোটবোনের ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো। উঠে দেখি ১১টা বেজে গেছে। যাক বাঁচা গেলো স্বপ্ন ছিলো বলে।

আরেকদিন দেখি আমার আত্মজীবনীর খণ্ড খণ্ড অংশ লিখি। প্রতিদিন একটু একটু করে লিখি। স্বপ্নে আবার হঠাৎ দেখি, আমার লেখাটাই একটা উপন্যাসে চলে আসে! কীভাবে কীভাবে যেন আমার উপন্যাসটা ছাপাও হয়ে যায়! আমার লেখা সেই বই বেস্টসেলার হয়। কালের কণ্ঠে আমার সাক্ষাৎকার ছাপে! সেই সাক্ষাৎকারে বলা আমার কথাগুলির প্রথম কথাটাই ছিলো- আমাকে জীবন চিনিয়েছে মৃত্যু…

স্বপ্ন বরাবর স্বপ্নই থেকে যায়! সে সুখস্বপ্নই হোক কিংবা দুঃস্বপ্ন! যাকে আমরা বিধাতা বলি, তিনিই আমাকে ভালো কিছু কিংবা একটা সুন্দর জীবন দিলেন না, এমনকি মন্দ কিছু। এই যেমন অপঘাতে মৃত্যু, দিলেন না তাও, সেই আমি মানুষের কাছেই’বা কি পাবো!

আমার মনে হয় পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের মৃত্যু হল লঘু পাপে ফাঁসদণ্ড। ফাঁসদণ্ডের কারণে বললাম এই যে আত্মহত্যা।

প্রিয়তমা তোমার জন্য পৃথিবীটা উন্মুক্ত করে দিতে গিয়ে নিজের অজান্তেই নিজের পৃথিবীটা ছোট করে ফেললাম!

জীবন আনন্দময় হোক। জীবনকে ভালবাসেন। সৃষ্টিকর্তার দেয়া জীবনটা আপনি হেলাফেলা করে শেষ করতে পারেন না। উপভোগ করুন, হাসতে শিখুন, তাহলে দেখবেন জীবন আনন্দময় হয়ে গেছে। জীবন দেয়ার মধ্যে কোন ধরনের আত্মতৃপ্তি নেই। বরং বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই আত্মতৃপ্তি।

লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0929 seconds.