• ০৯ অক্টোবর ২০২০ ১৭:১৪:১৯
  • ০৯ অক্টোবর ২০২০ ১৭:১৫:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ক্রসফায়ার-ফাঁসির দাবি, ধর্ষণের পর হত‌্যা নিশ্চিত করবে না তো?

কাকন রেজা। ফাইল ছবি


কাকন রেজা:


‘ক‌্যানবালিজম’ আর ‘ক‌্যানিবাল’ শব্দটা কত ব‌্যবহার করি। এই যে দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছি, কে শোনে কার কথা। তাও সেই ক্রসফায়ারের আওয়াজ, ফাঁসির দাবির চিৎকারই প্রতিধ্বনিত হয়। এই চিৎকার সেই আদিম ‘ক‌্যানিবাল’ তথা নরভোজী সমাজের চিৎকার। এই চিন্তা হত‌্যার। এই চিন্তার সাথে ধর্ষক আর হত‌্যাকারীদের চিন্তার তেমন পার্থক‌্য নেই। এই চিন্তা বিচারের চিন্তা নয়, এই চিন্তা প্রতিহিংসার চিন্তা।

একজনকে লিখতে দেখলাম, ‘ক্রসফায়ারে লাভের মধ‌্যে একটা লাভ হয়েছে, ওসি প্রদীপকে পাওয়া গেছে।’ এই যে লাভের হিসেব, এটা রাগের হিসেব। চিন্তা করে দেখুন, টেকনাফসহ কক্সবাজারে এতো ক্রসফায়ার দেয়া হলো, কিন্তু ইয়াবা ব‌্যবসা বন্ধ হয়েছে কি? হয়নি। মাঝখানে নেপোরা দই মেরে গেছে। এই নেপোদের মধ‌্যে একমাত্র ধরা খেয়েছে ওসি প্রদীপ। অন‌্যান‌্য নেপোরা এখনো নির্বিঘ্নে।

ধর্ষণ নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। এখানেও শুনি কেউ কেউ ক্রসফায়ারের কথা বলছেন। দায়িত্বশীল পর্যায় থেকেও উঠছে ক্রসফায়ারের দাবি। এই দাবি মূলত রাজনৈতিক। এই যে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত‌্যার যে মচ্ছব চলেছে এতোদিন তাকে বৈধতা দানের দাবি। ফাঁসিও তাই।

ধর্ষণের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড এমন কথা বলা হচ্ছে। বিপরীতে শুভবুদ্ধির মানুষেরা বলছেন, এমনটা হলে ধর্ষণের পর হত‌্যার মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাবে। কীভাবে তাও তারা বলেছেন। ধর্ষণের শাস্তি যেহেতেু মৃত্যু এবং হত‌্যার ক্ষেত্রেও তাই। তখন ধর্ষণকারীরা ধর্ষণ শেষে প্রমাণ নষ্ট করার জন‌্য সেই নারীটিকে নিশ্চিত হত‌্যা করবে। সাথে চেষ্টা করবে গুম করার, যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে। এই সোজা জিনিসগুলো কেন যে আমাদের কিছু অতি বুদ্ধিজীবীর মাথায় আসে না বুঝতে পারি না।

ধর্ষিতাও বেঁচে থাকে। হয়তো সারাজীবন একটা অসহ‌্যবোধ বয়ে বেড়ায় সে, তারপরেও বেঁচে থাকে। কিন্তু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করলে সে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও মুছে যাবে। কারণ ধর্ষণের পর আর প্রমাণ রাখতে চাইবে না ধর্ষণকারীরা। আর অতীত থেকে আজ পর্যন্ত দেখা গেছে বেশিরভাগ ধর্ষকই প্রভাবশালী। না হয় প্রভাবশালীদের আশির্বাদপ্রাপ্ত। সুতরাং তাদের ভয়ডর এমনিতেই কম। আর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হলে, তারা সরাসরি হত‌্যার পথে যাবে। ফলে কী হবে। মৃত নারী কথা বলতে পারবে না। আর এমন মামলায় নারী কথা বলতে না পারলে আর অপরাধের কাজটা সূচারু ভাবে হলে বিচার ও শাস্তি দুই-ই দূর-অস্ত হয়ে দাঁড়াবে।

অনেকে আবেগে বলে উঠবেন, একজন ধর্ষিতার বেঁচে থাকে লাভ কী, তাদের মৃত্যুই শ্রেয়। সমাজ তাদের ভালো চোখে দেখে না। পদে পদে বিব্রত হতে হয়, লজ্জিত হতে হয়। তো আবেগের গোডাউনওয়ালা ভাইয়েরা, এই সমাজ তো আপনারাই। আপনাদেরই তৈরি। ক্রসফায়ার, ফাঁসির দাবি, ধর্ষিতার বিব্রত হওয়া বা করা থেকে বিরত থেকে নিজেদের সমাজটাকে ঠিকমতো গড়ে তুলুন না। সামাজিক প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন না। পাশের বাড়ির মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে তখন রুদ্রনীলের কবিতার মতন বারান্দা থেকে তো নামেন না। নামুন, মেয়েটাকে রক্ষার চেষ্টা করুন। না পারলে পুলিশকে জানান। আপনার সামাজিক কর্তব‌্যটা সারুন। তারপরের দায়িত্বটা পুলিশকে ছেড়ে দিন।

ধর্ষিতা মেয়েটাকে নিজের পুত্রবধু হিসেবে ঘরে তুলে নিন না। আর ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে সাক্ষ‌্য দিন। নিজেকে সামাজিক এবং মানুষ হিসেবে প্রমাণ করুন। তাহলেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে এই বিভৎসতা।

নিজেরা প্রতিরোধ তৈরি করবেন না। করার মধ‌্যে পুলিশের লাঠির ভয় না থাকলে ফুঁস করে একটু মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে যাবেন। ছাত্ররা মিছিল করলে রুদ্রনীলের কবিতার ভাষায় বলবেন, অতটা বাড়াবাড়ি করা কি উচিত ছিলো! এই সাহসহীনতা নিয়ে আপনারা রাষ্ট্র তো দূর-কা-বাত, নিজের সমাজও পরিবর্তন করতে পারবেন না। শুধু নিজের ব‌্যর্থতার জ্বালায় খুনের বদলা খুনের কথা ভাববেন। যেমন ভাবে অপরাধীরা। বলিহারি আপনাদের।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0815 seconds.