• ১২ অক্টোবর ২০২০ ১৯:১০:২৫
  • ১২ অক্টোবর ২০২০ ১৯:১০:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নিড এ হাগ

ফাইল ছবি


আমিনা সুলতানা সানজানা :


স্যুপের বাটিতে আরেকটু ভিনেগার দিয়ে চায়ের চামচ দিয়ে নেড়ে দিলো সুতপা। ওখান থেকে সামান্য ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে লবণ চেখে দেখলো। পারফেক্ট!

সুতপার রান্না বরাবরই ভালো হয়। তাও সে খুব খুতখুতে। খুতখুতে স্বভাবের মানুষের অনেক কষ্ট। ওদের চোখে রাজ্যের দোষ ধরা পড়ে। মানুষগুলো তাই একাও হয় খুব। অভিমানীও! 

স্যুপ রেডি করে সুতপা তিন বাচ্চাকে ডাইনিং টেবিলে ডাকলো। এমনিতে কেউই তার কথা না শুনলেও পেটের ক্ষুধাকে অগ্রাহ্য করলো না কেউই। ১৬ বছরের আয়ান, ১৩ বছরের সানা ও ১০ বছরের রাফি যার যার গ্যাজেটের দিকে তাকিয়ে নির্দিষ্ট গতিপথ ধরে যার যার চেয়ারে এসে বসলো। এক হাতে গ্যাজেট অন্য হাতে স্যুপের চামচ নিয়ে উ আ শব্দে খেতে লাগলো। অন্য দিন হলে সুতপা চিৎকার চিচেমেচি শুরু করতো ওটা হাত থেকে সরিয়ে রাখতে, কিন্তু আজকে আর কিছু বলল না। খুব ইচ্ছা করছে বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরে আদর করতে। কিন্তু সুতপা জানে ওদের মাকে জড়িয়ে ধরার মতো ওতো সময় নেই। রাফিটা আসে মাঝে মাঝে। যখন বাকি দুজনের সাথে ঝগড়া হয়। ব্যস এতটুকুই।

সুতপার সারাদিনে কাজের কোন শেষ নেই। নিত্য চলছে সুতপা নামের রেল গাড়ি এ বাসায়। সকাল ছটা থেকে চলতে থাকা এ রেল রাত ১২ টায় গিয়ে থামে। শাশুড়ি, তিন সন্তান ও রায়হানের সব কিছুতেই সুতপার ছোঁয়া। সব জায়গায় থেকেও কোথাও যেন নেই সে। ভালোবেসে সবাইকে আগলে রাখতে রাখতে কখন যে সবার থেকে দূরে সরে গেল জানে না সুতপা। বিন্দু থেকে কখন সিন্ধু হয়ে অথৈ সাগর হয়ে গেছে এই তল, আর আজকে খুঁজতে যায় না সে।

১৮ বছরের সংসারের শুরুটা ভালোবাসা দিয়ে শুরু হলেও এক সময় ভালোবাসার রং উড়ে গেল। বাচ্চাদের নিয়ে সুতপার ব্যস্ততার ভীরে রায়হান ধীরে ধীরে দায়িত্বশীল বাবা হতে লাগলো। দায়িত্বশীল বাবার আরেক রুপ কি টাকার পিছে ছোটা? জানে না সুতপা। আয়ান, সানা, রাফি যখন একটু গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো ততক্ষণে স্বামী স্ত্রী হয়ে উঠার প্রয়োজন ফুরিয়েছে ওদের। যার যার নিজ গন্ডিতে আলাদা ভূবনে এখন রায়হান ও সুতপার।
দীর্ঘ এই পরিক্রমায় তিক্ততা সৃষ্টি করেছে অনেকেই। কেউ জেনে বুঝে, কেউ অনিচ্ছায়। তিন সন্তান দেখে শাশুড়িকে দেখলেও প্রায় প্রতিদিনই সুতপার কোন না কোন দোষ খুঁজে পেতেন তিনি। ঘরে এসে এসব শুনে রায়হানের মুখ হয়ে থাকতো ভারি। কখনো কখনো বাইরে থেকেই অমাবস্যা হয়ে আসতো রায়হান। সারাদিনের জমানো গল্পগুলো আস্তে আস্তে শুকিয়ে যেতে থাকে সুতপার। মাঝে মাঝে গভীর রাতে খুব ডেকে তুলতে ইচ্ছে করে রায়হানকে। বলতে ইচ্ছা করে আসো আমরা হাত ধরে বারান্দায় বসে জোছনা দেখি অথবা ওর বুকে মাথা রেখে কেঁদে একটু হালকা হতে চাওয়া, কয়েকবার ডেকেও ছিল। ..... "বিরক্ত করো না তো সকালে অফিস আছে।" বলে দেয়াল তুলে দেয় রায়হান।

শরীর মনের দূরত্বে নিঃস্ব সুতপা নিজের মতো বাঁচার আগ্রহ খোঁজে। সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ততার মাঝে ডুবে যেতে চায়। কিন্তু এখানেও প্রচন্ড ব্যর্থ হয় সে। এখানেও সন্তানরা এক এক করে নিজেদের দুর্গ গড়ে তুলতে দেখে অনেক ভাবে তাদের ফিরিয়ে আনতে চায়। শরণাপন্ন হয় স্বামীর। কিছু দিন চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয় রায়হান। এতো সময় কোথায় তার! সংসারের সব কাজ সামলে বাচ্চাদের আর বোঝাতে পারে না সুতপা।
একটা সময় সব কিছু অসাড় মনে হয় তার। সুরাহা পায় না কোন কিছুর। রাতের পর রাত বিছানার এ কোণ থেকে ওই কোণ তাকিয়ে থাকে রায়হান হয়তো তাকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে বলবে, "আমি আছি তো তুমি চিন্তা করো না।"

ওইদিন আয়ান কি যেন একটা সিনেমা দেখছিল। সোফা গোছগাছ করছিল সুতপা। হটাৎ একটি বাক্যে ঘুরে তাকালো টিভির দিকে। মনে হয় কোন যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছে নায়ক। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে নায়িকার দিকে তাকিয়ে দু বাহু বাড়িয়ে বলছে.... "I need a hug, I need a tight hug." বিধ্বস্ত একটি মানুষ অন্যজনকে ধরে আবার বেঁচে ওঠার আকুতি।

সুতপার দৃষ্টি নিবন্ধ হয়ে গেল সেই দৃশ্যে। হটাৎ ছেলের চোখে ধরা না পড়ে যায়, তাই সরে গেল দ্রুত।
সকাল থেকে নানা পদের রান্না করে বক্স বক্স করে ঠান্ডা করে ফ্রিজে তুলে রেখেছে সুতপা। তার অনুপস্থিতির প্রথম কিছুদিন যেন ওদের অন্তত খাবারের কষ্ট না হয়। ঠান্ডা মাথায় সব ঠিক করে রেখেছে সে। অনেক কেঁদে কেঁদে অনেক কষ্ট পেয়েছে। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়েছে সবাইকে ফিরিয়ে আনার। সে জানে হাল ছেড়ে দেয়ার মানে হেরে যাওয়া।  স্ত্রীদের, মাদের, নারীদের হারতে নিষেধ। কিন্তু সে খুব ক্লান্ত, খুবই ক্লান্ত। এই পরম্পরা তার পক্ষে আর বয়ে বেড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ছোট থেকে অভাবের সংসারে বড় হওয়া, নিত্য বাবা মায়ের ঝগড়া এখন নিজের সংসারেও এমন মেহমানের জীবন আর সহ্য করতে পারে না সে। 
রাত দুইটা চল্লিশ। এক রুমে শাশুড়ির সাথে সানা, এক রুমে আয়ান ও রাফি আর এক রুমে রায়হান নাক ঢেকে ঘুমাচ্ছে। খুব আস্তে আস্তে মূল দরজা খুলে চৌকাঠে দাঁড়ালো সে। কাঠের দরজার হাতলটা ধরে ঢুকরে কেঁদে উঠলো নিঃশব্দে। বাচ্চাদের মুখ, রায়হানের মুখ, মৃত মা বাবার এমনকি সব সময় তাকে দেখতে না পারা শাশুড়ির মুখটাও ভেসে আসলো মানস পটে।

কিন্তু জীবনের কিছু কিছু সময় আর পিছু ফেরা যায় না। বিশেষ করে যখন পিছে তার জন্য কেউ অপেক্ষায় থাকে না। করিডোরের সবুজ পাতা বাহার গুলো শেষ স্বাক্ষী হয়ে রইলো সুতপার যাওয়ার।

কাক ডাকা ভোরে দরজায় জোরে জোরে ধাক্কার শব্দ শুনে ধরমর করে ঘুম থেকে উঠলো রায়হান। দরজা খুলে দারোয়ানের আতংকিত মুখ দেখে নিকট ভবিষ্যৎ আঁচ করতে না পারলেও কিছু সময়ের মধ্যেই সব পরিষ্কার হয়ে গেল সবার কাছে।

ফজরের নামাজ পড়ে পানি ছাড়তে গেলে বেসম্যান্টে কাউকে পড়ে থাকতে দেখলো দারোয়ান মতলব। কাছে আসতেই রক্তের স্রোতে ছয় তলার ম্যাডামের চেহারা চিনতে কষ্ট হলো না তার।

গোসল করিয়ে লাশ নিচে রাখতেই তিন সন্তান আর রায়হান শক্ত করে সুতপার লাশকে জড়িয়ে ধরে গগণ বিদারী কান্না শুরু করলো। অথচ কিছু ঘন্টা আগে এই স্পর্শের অভাবেই সুতপা বিদায় নিলো।

লেখক : উদ্যোক্তা

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

আমিনা সুলতানা সানজানা

আপনার মন্তব্য

Page rendered in: 0.0915 seconds.