evaly
  • ২৩ অক্টোবর ২০২০ ০৮:৩৯:০৮
  • ২৩ অক্টোবর ২০২০ ০৮:৩৯:০৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

শুদ্ধ উচ্চারণে কিছু ভুলভাল প্রশ্ন এবং তার উত্তরপর্ব

ফাইল ছবি

কথাটা উঠেছিলো এক সাহিত্য আলোচনায়। প্রশ্ন ছিলো বড় লেখক ও জনপ্রিয় লেখক নিয়ে। বলেছিলাম, লেখক বড় হয় না, লেখা বড় হয়। লেখা জনপ্রিয় হয়। প্রসঙ্গটা হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে। একজনের আপত্তি হুমায়ূন আহমেদকে ‘বড় লেখক’ মানে ভালো লেখক বলার ক্ষেত্রে। জনপ্রিয় হলে ছোট লেখক হতে হয়, এটা আমার জানা ছিলো না বলে আশ্চর্য হয়েছিলাম এমন ইঁচড়েপাকা প্রশ্নে। বলবেন, ইঁচড়েপাকা কেনো বলছি। বলছি এ কারণে, সে অর্থে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাভাষীদের ঘরে তার একটা হলেও ছবি, মূর্তি এবং বই থাকবে। হিসেবের সে অঙ্কে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে ‘ছোট লেখক’ নয় কি?

রবীন্দ্রনাথ যেমন জনপ্রিয় তেমন রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালীও। বলবেন, কেনো? সাহিত্যের সাথে আছেন এমন কাউকে জিজ্ঞেস করুন না রবি বাবু সম্পর্কে। দেখবেন, বেতালা প্রশ্নে তাদের আমতা আমতা অবস্থা। কোনভাবেই তাকে ছোট করা যাবে না। এমন কি ‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে’ ধরণের লেখা লিখলেও তাকে শিশুতোষ বলে পার করে দেয়া হবে! রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এই কারণেই বললাম। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই এমন দেবতার পর্যায়ে যেতে পারে মানুষ। আর কিছু না হোক বিরূপ অবস্থার ভয়ে কেউ তাদের সমালোচনা করেন না। করলেই খাঁমচে ধরার মতন ঘটনা ঘটে। রোদ্দুর রায়ের ক্ষেত্রে যা হয়েছিলো।

দুই.

একজন গণমাধ্যম কর্মীর প্রশ্ন ছিলো, মাদরাসার ছোট ছোট বাচ্চাগুলিকে শিক্ষকরা বলাৎকার করছেন। তারা যদি সমকাম পছন্দই করেন, তবে আবার সমকামকে অবৈধ বলেন কেনো? এমন প্রশ্ন অনেকেরই। কেউ না বুঝে করেন, কেউ বুঝে। যারা বুঝে করেন, তাদের একটা উদ্দেশ্য থাকে। তাই তাদের জবাব দিলেও যা, না দিলেও তা। যারা না বুঝে বলেন, তাদের বলছি। এমন প্রশ্নটাই আসলে ভুল ফর্ম থেকে করা। কীভাবে শুনুন। সমকাম অবৈধ বলেছে ইসলাম, মাদরাসার শিক্ষক নয়। যেমন, সমাজবিজ্ঞান সমাজের কথা বলে। সমাজ গঠনের কথা বলে। এই কথা স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলেন না। এটা তাদের কথা নয়। সেই সমাজ না মানা কিংবা অসামাজিক হওয়ার মানে এই নয় সমাজবিজ্ঞানটাই ভুল। তাই মাদরাসা শিক্ষকদের সমকাম প্রশ্নে বেসিক ধারণাটাই ভুল। সুতরাং ভুল ধারণায় কোনো প্রশ্ন সঠিক হতে পারে না। আর ভুল প্রশ্ন সঙ্গতই অগ্রহণযোগ্য।

এখন মাদরাসা শিক্ষকরা কেনো সমকাম পছন্দ করেন, এমন কথার ব্যাখ্যা দিতে পারবে মনস্তত্ত্ব। তবে ছেলে বা মেয়ে শিক্ষার্থীদের যৌন নিগ্রহের ঘটনা মাদরাসা, স্কুল, মিশনারি স্কুল কোনটাতেই কম নয়। আমাদের দেশে মাদরাসা শিক্ষাটি অনেকক্ষেত্রেই আবাসিক। আর ছোট বাচ্চারা, এতিম অসহায় বাচ্চারা এসব মাদরাসায় পড়ে। আবাসিক এবং সেই বাচ্চারা অসহায় হওয়াতে তাদের উপর এই অত্যাচারগুলো ঘটে থাকে। স্কুলগুলোকে আবাসিক করে দেন এবং মাদরাসার এতিম অসহায় বাচ্চাগুলোকে সেখানে থাকতে দিন দেখুন একই ঘটনা কিংবা আরো বেশি ঘটনা ঘটে কিনা। বুদ্ধিজীবীতা ভালো, তবে ইঁচড়েপাকামোটা খারাপ। আর ‘ফোবিয়া’ সৃষ্টির প্রচেষ্টা তারচেয়ে অনেক বেশি খারাপ।

তিন.

‘ফোবিয়া’ সৃষ্টির অনর্থক প্রচেষ্টার কথায় আসি। আপনি ইংরেজি ভুল বললে হাসাহাসি হবে। কবিতায় তৎসম শব্দ ব্যবহার না করলে আপনার কবি স্বীকৃতি মিলবে না। রবীন্দ্রনাথ, মার্ক্স ওনাদের শুদ্ধভাবে না কপচালে আপনি পণ্ডিত হতে পারবেন না। প্রমিত বাংলা মানে শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলতে না পারলে আপনি গেঁয়ো। অথচ যখন আপনি শুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দিতে যাবেন তখন আপনি মৌলবাদী। এটাই হলো অনর্থক ‘ফোবিয়া’ সৃষ্টির চেষ্টা। এটাও ইঁচড়েপাঁকামো।

এক সময় কাছিমের মতন জার্মান গাড়িগুলো দেখা যেতো। মানুষ সাধারণ উচ্চারণে বলতো ‘ভক্সওয়াগন’। এখনো অনেকে জার্মানির তৈরি ওই কোম্পানির গাড়িগুলোকে সে নামেই ডাকেন। যারা ডাকেন তাদের নিয়েও হাসাহাসি হয়। কারণ জার্মানিতে ভি-এর উচ্চারণ এফ, আর ডব্লিউ-এর উচ্চারণ ভি-এর মতন। উচ্চারণটা দাঁড়ায়, ফোক্সভাগন বা ফোক্সভাগেন। একটা গাড়ির নাম উচ্চারণও অশুদ্ধভাবে করলে হাসির পাত্র হতে হয়, আর নিজেদের সাংস্কৃতিক আচরণজনিত উচ্চারণ শুদ্ধ হলে মৌলবাদী হয়ে যায় মানুষ! এ ধরণের চিন্তাই মূল মৌলবাদীতা। এমন চিন্তার বাহকরাই ‘ফোবিয়া’ ছড়ান। যে ‘ফোবিয়া’ মূলত মৌলবাদের বাহন।

প্রশ্ন উঠতে পারে সাংস্কৃতিক আচরণের ব্যাপারে। ওঠার আগেই তর্ক এড়াতে উত্তরটা দিয়ে নিই। আবুল মনসুর আহমদ এর ‘বাংলাদেশের কালচার’ নামক বইটি যারা পড়েছেন, তারা জানেন যে, সংস্কৃতির আশি ভাগই আসে ধর্ম থেকে। কথাটি বলেননি শুধু, সেখানে প্রমাণ করে ছেড়েছেন আবুল মনসুর আহমদ। ধরুন, নিরপেক্ষ হতে মর্নিং, ইভিনিং আর নাইটের সাথে গুড বলে চালিয়ে দিলেন। কিন্তু তাতেই কি ধর্ম বাদ থেকে গেলো। না। গুড এর সাথে খ্রিস্টযোগ এসে যায়। শুভকামনার ব্যাপারটি এসেছে ধর্ম থেকেই। আপনি ‘হাই-বাই’ বললে এর সাথে কোনো শুভ বা কামনা যুক্ত হয় না। শুধু জানান দেয়া হয়। আপনি মানুষের শুভ না চেয়ে শুধু জানান দিতে চান, তাহলে কথা নেই। আপনাকে তো কেউ না করেনি ‘হাই-বাই’ বলতে। আপনি অন্যকে কেনো বাধা দেন শুদ্ধ উচ্চারণে তার সাংস্কৃতিক পরিভাষায় মানুষকে শুভকামনা জানাতে! এটা ইঁচড়েপাকামো ছাড়া আর কী?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0792 seconds.