• ৩১ অক্টোবর ২০২০ ২১:০৩:০৩
  • ৩১ অক্টোবর ২০২০ ২১:০৩:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মানুষকে হত্যার অজুহাত আলাদা, কিন্তু মানসিকতা একই

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা:

ধর্মের নামে জুয়েলকে পিটিয়ে-পুড়িয়ে হত্যার সাথে, ছেলেধরা সন্দেহে রেনুকে পিটিয়ে হত্যার মধ্যে আমি তেমন পার্থক্য খুঁজে পাই না। চুরির দায়ে কিশোরকে পিটিয়ে কিংবা পায়ু পথে গ্যাস দিয়ে মারার মধ্যেও আমি একই চিন্তা দেখি। সে হলো মেরে ফেলার চিন্তা। একজনকে মানুষকে একটা উপলক্ষ্য বা অজুহাতে মেরে ফেলার বর্বরতম চিন্তা। এই চিন্তা সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ফল-ফসল। এমন মৃত্যু দেখে আমরা অভ্যস্ত। সাপের মতন পিটিয়ে মানুষ মারার দৃশ্য আমাদের কাছে নতুন নয়। যারা বলেন, জুয়েলের মৃত্যু দৃশ্য দেখে আমরা ঘুমাতে পারিনি, ওসব বুজরুকি। এমন অনেক দৃশ্যই তাদের স্মৃতিতে রয়েছে, নানা কারণে তারা ‘ইচ্ছা বিস্মৃত’ হয়েছেন।

এ ভূখণ্ডেই এক সময় মেয়েদের গরুর গাড়িতে পর্দা মুড়িয়ে বের হতে হতো, যাতে কারো চোখে না পড়ে। ওই সময়েই চটি, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে কম্যুনিস্ট নেতারা গ্রামে গ্রামে মানুষদের সংগঠিত করতেন। বলতেন, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। অথচ তখন কাউকে পুড়িয়ে-পিটিয়ে-কল্লা কেটে খুন করা হয়নি। চরম ধর্ম মানা মানুষটাও সেই ধর্ম না মানা কমিউনিস্ট নেতাদের সম্মান করতেন। করতেন, তাদের ত্যাগের জন্য, মানুষের জন্য তাদের ডেডিকেশন দেখে, তাদের কমিটমেন্ট দেখে। সততার প্রশ্নে ধর্ম মানা আর না মানার মধ্যেকার পার্থক্য সে সময় ঘুচে যেতো। কিন্তু এখন সততা মানে ভণ্ডামির অপর নাম। সুতরাং পার্থক্যটা ঘোচার কোনো কারণ নেই।

এখন মেয়েরা একাই বের হয়, পর্দার প্রয়োজন হয় না। অসাম্প্রদায়িকতার কথাও শোনা যায় জোরেশোরে। সেকুলারিজমের মহা উত্থানপর্ব চলছে। মানবতার ছবক দেয়া হচ্ছে কথায় কথায়। অন্যদিকে ধর্মীয় উপসনালয়গুলোরও জমজমাট অবস্থা। মসজিদে-মন্দিরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র। ঝকঝকে টাইলস লাগানো মেঝে। সব ঝা-তকতকে। তারপরও মানুষের মন তকতকে হচ্ছে না। তারপরও মানুষকে মারা হচ্ছে সাপের মতন পিটিয়ে, পুড়িয়ে, ছুরিতে, গুলিতে। এই যে পরস্পর বিরোধী অবস্থা তার কারণ খুঁজে বের করাটা জরুরি। আর জরুরি কাজটা করতে গেলেই সামনে আসবে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ব্যাপারটি।

কী কারণে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। পড়ছে এই কারণে যে, একেবারে গ্রামের পাড়া মহল্লাতেও সৃষ্টি হয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্যের। হঠাৎ করে অল্প কিছু লোক বিত্ত আর ক্ষমতার চরম অধিকারী বনে গেছেন। ইরফান সেলিম তার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ। তাদের অর্থ ও ক্ষমতার সামনে বিচার ব্যবস্থাও অসহায় হয়ে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে এক ধরণের বিচারহীনতার সংস্কৃতি। মানুষ তাদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিকার পাচ্ছে না। না পাওয়া প্রতিকার তাদের মনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। আর সেই ক্ষোভ থেকে প্রতিহিংসা। সেই হিংসার আগুনেই পুড়ছে জুয়েলরা। মরছে রেনুরা। দুর্বল মানুষেরা নিজেদের প্রতি ঘটে যাওয়া অবিচারের জমে থাকা ক্ষোভ ঢালছেন আরেক দুর্বলের উপর। এটাই মনস্তত্ত্ব।

এসব ঘটনার মধ্যে যারা শুধু একটা বিষয় খোঁজেন তারা না বুঝে খোঁজেন, না হয় তাদের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। উন্নত দেশের উদাহরণ দেন যারা কথায় কথায় তাদেরও চিন্তায় ভুল রয়েছে। ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় এসব শুধু উপলক্ষ্য। ‘মব’ রাজনীতি থেকেও সৃষ্টি হয়। এমন কী খেলাকে কেন্দ্র করেও। এসব আমাদের দেখা। রাজনীতি ও খেলাকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশেও মানুষ পিটিয়ে মারা হয়েছে। চর দখলের দৃশ্য তো আমাদের অচেনা নয়। সুতরাং মেরে ফেলাটাই এখানে মূখ্য, আর সব উপলক্ষ্য, উছিলা।

উন্নত দেশের উদাহরণও খর্বাকৃতি চিন্তা থেকে সৃষ্ট। জার্মানির কথা বলেন, মানুষ পুড়িয়েই আজ জার্মানি। লাখ লাখ মানুষের মৃতদেহ পেড়িয়েই আজকের ফ্রান্স। আফ্রিকান উপনিবেশের কথা অনেকেই আজ বিস্মৃত হয়েছেন। এজন্যেই তাদের চিন্তাকে খর্বাকৃতি বলছি। আপনি অ্যারিয়ান অহম মেনে নিয়েই ফ্রান্স, জার্মানি আর বৃটেনকে সভ্য বলছেন। হোয়াইট সুপ্রিমেসি মেনে নিয়েই তাদের উন্নত বলছেন। এটা আপনার চিন্তার সীমাবদ্ধতা। আপনি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন বলেই সেখানে তেমনটা ঘটছে না। আপনি বলছেন, তোমরা শ্রেষ্ঠ। ধর্ম, কর্ম যাই বলেন সেটা তো শ্রেষ্ঠত্বেরই দাবি করে। সেক্ষেত্রে মেনে নিলে তো আর সংঘাতের প্রশ্ন ওঠে না। না মেনে নিলেই ঝামেলা। তখনই বাধে শ্রেষ্ঠত্বের সংঘাত। কখনো সেই সংঘাত বুদ্ধিবৃত্তির, কখনো হত্যা উৎসবের।

সুতরাং কথা বলার আগে ভাবতে হবে, এ কথাটিই শেষ কথা কিনা। আপনি যদি ভাবেন আপনার কথাটিই শেষ কথা এবং তা যুক্তি বাদ দিয়ে গোয়ার্তুমির পর্যায়ে পৌঁছায় তবেই মুশকিল। যে মুশকিলের কোনো সহসা আছান নেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0658 seconds.