evaly
  • ০২ নভেম্বর ২০২০ ২০:৩৪:৫৩
  • ০২ নভেম্বর ২০২০ ২০:৩৪:৫৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘৭৪ এর বাসন্তির বয়স এখন ৭৪’

বাসন্তি। ছবি : সংগৃহীত


মাইদুল ইসলাম :


বাংলাদেশের সেরা ঋতু বসন্ত। শহর গ্রামে বসন্তে বাসন্তি শুভেচ্ছা জানাতে উৎসব পালন করা হয়। মেয়েরা বাসন্তি শাড়ি পরে। চুলের শোভা বর্ধন করতে মাথায় ফুল গোঁজে। সব বাসন্তির উৎসব এক হয় না। বসন্ত বরণে কারো সুখের স্মৃতি, কারো দুঃখের স্মৃতি। কেউ আবার উৎসব কিভাবে পালন করতে হয় তা জানে না। এই না জানার একজনের নাম বাসন্তি। তিনি বসন্ত ছাড়াও সারা মাস বাসন্তি। তিনি জানেন না বাংলা বা ইংরেজী মাসের নাম। জানেন শুধু কিভাবে পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে হয়। তার কাছে ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’।

জেলে পরিবারে ১৯৪৬ সালে চিলমারী ইউনয়নের বজরা দিয়ারখাতা গ্রামে জন্ম হয় জন্মগত বাক্ ও  বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বাসন্তির। জেলে বাবা কন্দুরাম ও মা সুটকী বালার অভাবি সংসারে অভাব অনটনে ২৪ বছর বয়সে বিয়ে দেন একই গ্রামের বাবু রামের সাথে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাবুরাম অন্যত্র বিয়ে করে ভারতে চলে যান, আর ফিরে আসেননি। বাসন্তিরা যায় রৌমারী মুক্তাঞ্চলে। দেশ স্বাধীন হয়। ফিরে আসে পৈত্রিক পোড়া ভিটায়। এর মধ্যে অভাগীর বাবা, মা ও ছোট ভাই বিশুরাম মারা যায়। অভিভাবক বলতে বড় ভাই আশুরাম দাস। পেশায় জেলে। স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও ছোট বোন বাসন্তিকে নিয়ে চলছে আশুরামের জীবন। ব্রহ্মপুত্রের বুকে জাল ফেলে মাছ ধরেন অন্যের নৌকায়। বৃষ্টি, খরায় ও শীতে নদীই একমাত্র ভরসা। ১৯৭৪ সালে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে নতুন করে জন্ম দেয় বাসন্তিকে। একজন মানুষের ক’বার জন্ম হয়?

একজন মানুষের জন্ম হয় একবার হলেও বাসন্তি জন্মেছিলো দু’বার। একবার বাবা মায়ের আদুরে সন্তান হয়ে ১৯৪৬ সালে। আর একবার ১৯৭৪ সালে নতুন করে আবির্ভূত করলো তৎকালীন রিলিফ চেয়ারম্যান আনসার আলী। সেই সময় দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনামে মাছ ধরার জাল পরিহিতা বাংলাদেশি এক নারীর ছবি প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বের বিবেককে নাড়া দেয়। ছবির নারীর নাম দূর্গেতি সাথে ছিলেন বাসন্তি। সারা বিশ্ব জানে জাল পরিহিতা নারীর নাম বাসন্তি, কিন্তু বাসন্তির নামটি ভুলভাবে প্রচার করে। বাক্ ও প্রতিবন্ধী হিসেবে তাকেই ব্যানার হিসেবে সামনে আনা হয়। বাসন্তি সম্পূর্ণ বাক্ প্রতিবন্ধী নন। আধো আধো কথা বলতে পারেন, খুব মনযোগ দিলে তার কথা খুব সামান্য বোঝা যায় তবে অগোছালো কথা। কেন এই বাসন্তি চরিত্রটি তৈরি হলো , সেটাও জানা দরকার।

তৎকালীন ডিসি রুহুল আমিন মজুমদারের সাথে সাক্ষাৎ করে রিপোর্টার শফিকুল কবির ও ফটো সাংবাদিক আফতাব আহমেদ চলে আসেন আনসার চেয়ারম্যানের কাছে। এই দুর্ভিক্ষে আরো রিলিফ বরাদ্দ পাওয়ার জন্য একটি নাটকীয় চরিত্র তৈরি করতে হবে। বন্যার সে সময় পেটে ক্ষুধা নিবারণের জন্য বাসন্তিসহ সকল মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন। দূর্গেতি কলা গাছের ভেলায় করে পাট শাক তুলছিলেন, সাথে ছিলো বাসন্তি। দূর্গেতিকে নতুন কচকচে পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে মাছ ধরার জাল পরিয়ে ছবি তোলেন সেই কুচক্রি মানুষগুলো। লাভবান হলো রিলিফ চেয়ারম্যান, ফটো সাংবাদিক আফতাব আহমেদ ও রিপোর্টার শফিকুল কবির, সেই সাথে পেলেন খেতাব। কয়েক বছর পরে মারা যান দূর্গেতি, আর অভাব অনটনে বেঁচে আছেন বাসন্তি। বিশ্বের কাছে জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশকে হেয় করা হলো। বাংলাদেশ বলতে দরিদ্র পীড়িত দেশ হিসেবে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলো। সামাজিকভাবে বাসন্তির পরিবারও ছোট হলো সবার কাছে। জেলে পল্লীর দূর্গেতি ও বাসন্তি সম্ভ্রম হারিয়ে কি পেলো?

১৯৯৬ সালের দিকে বাসন্তির নামে বরাদ্দ আসলো। কিন্তু সহায় সম্বলহীন বাসন্তির জমি না থাকায় তা বাতিল হয়ে যায়। পরে কারিতাস নামের একটি বেসরকারি সংস্থা জোড়গাছ জেলে পল্লীর সামনে ব্রহ্মপুত্র জেগে ওঠা চরে বাসন্তির গ্রাম নামে পরিচিত একটি আশ্রয়ন প্রকল্প করে দেয়। উঁচু ভিটায় টিনের দোচালা ছাউনির ঘর, টিউবওয়েল, একটি লেট্রিন, বাড়ির ভিটার চারপাশে মটরশুঁটির গাছ, দক্ষিন দিকে কাঁশবন। ছায়ার জন্য বাড়ির উঠোনে কলাগাছ। সাত আট বছর পরেই এই জেগে ওঠা চর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আশ্রয় নেয় নদীর কিনারেই। আজ থেকে এগার বছর আগে আশুরামের সাথে এক ভাতে ছিলেন পরে ছোট ভাইয়ের বউ ও ভাতিজার সাথে আলাদা বাড়িতে চলে আসেন বাসন্তি। বাসন্তির কাছে পুষ্টিকর বা অপুষ্টিকর খাবারের কোন পার্থক্য নেই। তার খাবারের চাহিদা খুব সামান্য, পেট ভরলেই হলো। বাসন্তি কাজ করতে পারেন না, জোড়গাছ বাজারে প্রায়ই দেখা যায় তিনি ছোট ছোট খড়কুটা কুড়াচ্ছেন। তার কাজ বলতে লাকড়ি কুড়ানো। তবে খাবার কিভাবে আসে?

বন্যা বা বিভিন্ন দূর্যোগের সময় যখন দরিদ্র মানুষগুলোর খাদ্যের অভাব থাকে তখন বাসন্তির খাবারের অভাব হয় না। স্বাভাবিক দিনে মুটে মজুররা কাজ করে তাদের খাদ্যের সংস্থান করেন তখন বাসন্তি সবার কাছে হাত পাতেন অথবা কেউ কেউ নিজ থেকে রুটি কলা কিনে দেন। দুর্যোগের সময় যেকোন ত্রান সহায়তা আসলে ত্রান সহায়তাকারী বাসন্তিকে খুঁজে বের করে ত্রান দিয়ে যান। বাসন্তি অন্যান্য দিনের থেকে দুর্যোগকালীন সময়কে বেশি ভালোবাসেন, কারণ এই সময় তিনি ত্রাণ পেয়ে যান। এ বছর বন্যা ও করোনাকালীন সময়ে তার বাসায় গিয়ে ত্রাণের স্লিপ দিয়েছিলেন অনেকেই। কেউ কেউ ত্রাণ দিয়ে সেলফি তুলে ফেইসবুকেও আপলোড দিয়েছেন, কেউ পত্রিকায় দিয়েছেন। এ যেন নিজেদের হাইলাইটস করার একটি প্লাটফর্ম, যেমন প্লাটফর্ম পেয়েছিলেন রিলিফ চেয়ারম্যান আনছার আলী। শুধুই কী ত্রাণ? বাসন্তির ত্রাণ সহায়তা ছাড়া আর কী কী প্রয়োজন আছে জীবন চলার ক্ষেত্রে?

কিছু দিন আগে কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক বাসন্তির জন্য দুই রুম বিশিষ্ট একটি মেঝে পাকা ঘর তুলে দেন। সাথে টিউবওয়েল ও ল্যাট্রিন। এটি নিশ্চই ভালো একটি উদ্যোগ। জীবন পরিচালনার জন্য ৫ টি মৌলিক অধিকারে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা রয়েছে।

বছরের বেশিরভাগ সময় অর্ধাহারে কাটে বাসন্তির জীবন। শিক্ষার ব্যাপারটা বাদ দিলেও বস্ত্র ও চিকিৎসা তার জীবনে একটু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু বাসন্তিই নয়। বাসন্তির মত অসংখ্য বাসন্তি সারাদেশে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাবে দিনাতিপাত করছেন। বাসন্তি যে গ্রামে থাকেন সে গ্রামে অনাহার-অর্ধাহারে জোর করে জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন অনেক বৃদ্ধা।

সারাটা জীবন কষ্ট করে শেষ জীবনে সবাই চায় শেষ নিঃশ্বাসটা যেন একটু শান্তিতেই নিতে পারে। সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে ১৬ আগস্ট ২০১৪ সালে ৭৪’এর আলোচিত বাসন্তি প্রতিবন্ধীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। ২০১৪ সালের আগে কী বাসন্তি প্রতিবন্ধী ছিলেন না, ছিলেন তবে দেখার মত কেউ ছিলেন না।

২২ অক্টোবর ২০২০ তারিখ সকালে বাসন্তির নিজ বাড়িতে ছিলেন, সকাল বেলা মরিচ পেঁয়াজ দিয়ে পান্তা ভাত খাচ্ছেন। এখন বন্যা বা কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেই তাই খাবারের টান পরে গেছে। সবাই সাময়িক হাত বাড়িয়ে পাশে থাকেন। বিশ্বের কাছে সম্মান জলাঞ্জলি হয়ে গেছে ৪৬ বছর আগে। ৭৪ সালের বাসন্তির ৭৪ বছর বয়সের পরের জীবনটা তার তিন বেলা পরিমিত খাবারের জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট রেশনের ব্যবস্থা। রাতে ঘুমানোর জন্য আরাম দায়ক বিছানা। পরিধানের জন্য ভালো কাপড়।

স্থানীয় প্রশাসনের যে কোন সহযোগিতা আসলে বাসন্তি পেয়ে যান কিন্তু তা সব সময় নয়। বাসন্তি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, তার দেখভাল ছোট ভাইয়ের বউ ও ভাতিজা করে থাকেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলতে বাসন্তির ভাতিজা। কখনো নদীতে মাছ ধরে, কখনো অন্যের জমিতে কাজ করে আবার কখনো রিক্সা চালায়।

বাসন্তি একদিন জন্মেছিলো, জীবনের নিয়মে একদিন পরপারে পাড়ি জমাবেন, মৃত্যুর পরে অনেক গণ্যমান্য ব্যাক্তিরা আসবেন। মিডিয়া এই নিউজ কাভার করে প্রচার করবেন ‘চলে গেলেন বাসন্তি’ অবসান হবে চিলমারীর একটি দুর্ভিক্ষের নাম। কুড়িগ্রাম জেলার ৭১ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন আর বাসন্তি যে চিলমারীতে থাকেন সেখানে ৭৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন। এখন চিলমারীতে বাসন্তি আর দূর্গেতিরা জাল পরিধান করেন না। এখকার বাসন্তিরা নদীতে গোসলের পর ভেজা শাড়ির একাংশ শরীরে রেখে বাকি। অংশ রোদে শুকায়।

লেখক : স্বেচ্ছা সেবক ও রেডিও কর্মী।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1021 seconds.