• ২৪ নভেম্বর ২০২০ ১২:২১:৩০
  • ২৪ নভেম্বর ২০২০ ১২:২১:৩০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

টিকা ও ঈমানের জোর: ঘৃণার রাজ্যে সকলই ঘৃণাময়

ছবি : প্রতীকী

থেমে নেই ঘৃণা ছড়ানো। সামাজিকমাধ্যমে আবারও দেখলাম করা হচ্ছে, ‘হুজুরদের বিধর্মীদের টিকা নিলে ঈমান থাকবে কিনা’ এমন প্রশ্ন। অন্যকে কষ্ট দিয়ে না কথা বললে বোধহয় অনেকেরই খাবার হজম হয় না। অন্যকে খোঁচানোটা তাদের জন্য হাজমোলা’র কাজ করে। সব পক্ষেই এমন রয়েছেন। বিধর্মীদের চৌদ্দ দুগুনে আটাশ জেনারেশন উদ্ধার করে অনেক গিয়ে খোঁজেন জাপানি জিনিস। তবে হালে আমাদের এখানে একটু বেশি প্রচলিত যারা ইসলাম অনুশীলন করেন তাদের খোঁচানো। সেই থেকেই টিকা বিষয়ে প্রশ্নটির উৎপত্তি।

এমন প্রশ্নের জনক-জননী যারা, তাদের ধারণা তারা খুব জানেন, মানে জ্ঞানী-গুণীজন। অথচ সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে জার্মানির বায়োএনটেক-এর প্রস্তুতকৃত টিকার উদ্ভাবক হচ্ছেন তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম দম্পত্তি। নাম উগ্যার শাহিন ও উজলেম তুরেসি। এই দম্পত্তি জার্মানিতে খ্যাতনামা ফার্মাসিউটিক্যাল ‘গানিম্যাড’ গড়ে তোলেন ২০০১ সালে। তারপর ২০০৮-এ ক্যান্সার চিকিৎসা বিষয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বায়োএনটেক’ এর। করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও উৎপাদনের জন্য এখন সবচেয়ে আলোচিত এই প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বখ্যাত ওষুধ কোম্পানি ‘ফাইজার’ এই প্রতিষ্ঠানের সাথেই যৌথ ভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদনে গিয়েছে। বলা হচ্ছে আগামি ডিসেম্বর মাস থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে এই ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হবে।

গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ হবার ফলে এই দম্পত্তির কথা এখন অনেকে জানেন। কিন্তু ‘বায়োএনটেক’ নিয়ে প্রথম থেকেই যখন কথা হচ্ছিলো তখন বলেছিলাম এর কর্ণধার দুজনই মুসলিম। সেক্ষণে অনেকে আমাকে মূর্খ ভেবেছিলেন। অনেক প্রিয়জন স্নেহের কারণে পুরো না মেনে আধা মূর্খ বলে মেনে নিয়েছিলেন। আমি সাধারণত কথার তর্কে যাই না, যাওয়া উচিত নয় বলে। এতে সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে আমাদের স্কুল জীবনের শিক্ষক নারায়ণ স্যারকে অনুসরণ করি। উনি ছাত্রদের বোঝাতে গিয়ে না বুঝলে প্রথম ছাত্রের কপালে চক দিয়ে ক্রস চিহ্ন এঁকে দিতেন। এভাবে তিন বার বুঝলে তিনটা ক্রস আঁকতেন। চতুর্থবার যখন ছাত্র না বুঝতো তখন স্যার নিজের কপালেই একটা ক্রস এঁকে নিতেন। বলতেন, এটা আমারই ব্যর্থতা। আমিও সেই স্যারপন্থী। অযথা তর্কে না গিয়ে মনে মনে নিজের কপালে ক্রস এঁকে কেটে পড়ি।

মুখে এদের বোঝানো কঠিন যে, বুদ্ধিমত্তার উপর ধর্মের কোনো প্রভাব নেই। অমুক ইহুদি বা জৈন হয়ে গেলেই বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যাবেন, মুসলিম বা হিন্দু হলেই কম হবেন, এমন পরিমাপের চিন্তই হলো কম বুদ্ধির পরিচায়ক। জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পূর্ণত মেধার ব্যাপার। ধর্ম মেধা নিয়ন্ত্রণ করে না, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ করে শৃঙ্খলা। না হলে ইসলামে শিক্ষার জন্য সুদূর চীন যাবার কথা বলা হতো না। কারণ তখন চীনে ইসলাম ছিলো না, এখনো তেমনভাবে নেই। অল্প যারা আছেন তাদেরও সাইজ করার চেষ্টা করছে সেখানের সরকার।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয় গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস’কে। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিকায়নের কৃতিত্ব হলো মুসলিম চিকিৎসক ইবনে সিনা’র। যার পুরো নাম আবু আলী হোসাইন ইবনে সিনা। তার রচিত চিকিৎসা শাস্ত্রের বিশ্বকোষ ‘আল-কানুন ফিত-তীব’ উনিশ শতকেও ইউরোপে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবশ্যপাঠ্য ছিলো। আপনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে তো ইবনে সিনা’কে বাদ দিতে পারবেন না। আর মুসলমানগণ বিধর্মী বলে হিপোক্রেটিস’কেও।

জানি, এখানে আগ বাড়িয়ে কিছু ‘রাম-বুদ্ধিমান’ সম্প্রতি ফরাসি পণ্য বাদ দেয়া অর্থাৎ বর্জনের ডাকের বিষয়টিও তুলে আনবেন। বলছি, তার আগে ‘রাম-বুদ্ধিমান’ কথাটি বুঝিয়ে নেই। না হলে তাতে আবার কেউ ‘উল্টা বুঝলিরে রাম’ অবস্থার ভেতর দিয়ে যাবেন। ‘রাম’ মানে হলো বড়। এই যেমন রামছাগল, মানে বড় ছাগল। রামদা, মানে বড় দা ইত্যাদি আর কী। যাকগে, ফরাসি পণ্য বর্জনের বিষয়ে যাই। মেধা আর শৃঙ্খলার যেমন আলাদা ক্ষেত্র রয়েছে, তেমনি ফরাসি পণ্য বর্জনের মধ্যে রয়েছে রাজনীতি। বর্জন হলো দাবী আদায়ের উপকরণ। জানি প্রশ্ন করবেন ধর্ম বিষয়ে রাজনীতি এলো কোথা থেকে। মানুষ যখন নিপীড়িত হয়, তা ধর্মের কারণেই হোক, বর্ণের কারণেই হোক কিংবা অন্য যে কোনো কারণে। সেই নিপীড়িত মানুষদের রক্ষার জন্য যে কথা ওঠে, যে আন্দোলন হয়; তা তখন আর ধর্ম আর বর্ণ ধরে থাকে না হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের কথা। আর নিপীড়িত মানুষের কথা মানেই রাজনীতি। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ ছিলো সেটাও রাজনীতি। মুসলিম ফকির ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও ছিলো নিপীড়িত মানুষের লড়াই, রাজনীতি। এরপরেও যদি প্রশ্ন থাকে তাহলে ওই যে সেই নারায়ণ স্যারের মতন নিজের কপালেই ক্রস আঁকতে হবে বোঝাতে না পারার ব্যর্থতায়।

মূলত আমরা ব্যর্থই। আমরা বোঝাতে পারছি না। সংঘাত ‍সৃষ্টির চেষ্টাও সেক্ষেত্রে রোখা যাচ্ছে না। মহল বিশেষের উৎসাহে ক্রমেই চরমপন্থী হয়ে উঠছে দুটি পক্ষ। অতি নাস্তিক ও অতি ধার্মিক। একপক্ষ আরেক পক্ষকে কটু কথায় ঘায়েল করতে চাইছেন। সুষ্ঠু বিতর্ক নয়, যুক্তিহীন তর্কে মেতে উঠছেন। অনেকটা সেই গ্রাম্য রসিকতার মতন, ‘পান, কাইটা দিমু তোর কান। সুপারি, কাইটা দিমু তোর গলা। মিললো না তো। তাতে কী তোর গলা তো কাটলাম।’ এই হলো অবস্থা। রাম‘ইয়ে’তে ভরে গেছে আমাদের দেশ। কী আর করা। শুধু শুধু চেয়ে দেখা, বিভেদ ও বিভাজনের এই দেশে ‘নেপো’র আরামসে দই মারার মহাযজ্ঞটি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1343 seconds.