• ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:১৬:২৪
  • ০৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:১৬:২৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

অসহিষ্ণুতা ও হালের অসমান্তরাল হয়ে ওঠা সমাজ

ছবি : প্রতীকী

ইচ্ছাতেই হোক বা অনিচ্ছায়, তর্ক চালু হয়ে গেছে। অথচ এই সময়ে, কথিত অগ্রসর কালে এমন তর্ক চালু না হওয়াটাই ছিলো সঙ্গত। উল্টো এই সময়েই বাঁধলো যত গোল। এই যে মূর্তি ও ভাস্কর্য ইস্যু। এটা এখন আমাদের ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে, আমি নিজেও করেছি। কথায় কথায় অনুভূতি আহত হচ্ছে। শুধু যে ধর্মীয় তা নয়, নানা ধরণের অনুভূতিই হঠাৎ করেই আহত হয়ে উঠছে। কথায় আছে আহত ব্যাঘ্র ভয়ংকর। অনুভূতির ব্যাঘ্রও তাই ক্রমশ প্রতিশোধপ্রবণতাকে ধারণ করছে।

ধরুন, রাজনৈতিক অনুভূতির কথা। এক সময় এ দেশের রাজনীতিকদের চামড়া ছিলো পুরু। অনেকে ঠাট্টার ছলে বলতেন, ‘গণ্ডারের চামড়া’। রাজনীতিকরাও আউড়াতেন, ‘কানে দিয়েছি তুলো, পিঠে বেঁধেছি কুলো’, এমন কথা। এখন বলে দেখুন তো, দেখবেন চামড়া জ্বলে উঠেছে। অর্থাৎ রাজনীতিবিদরা এখন আর গণ্ডার নেই, ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছেন। সেই ‘মারো তো গণ্ডার লুটো তো ভাণ্ডারের’ টাইপ। আর সেই ভাণ্ডার রক্ষার্থেই অল্পতেই তাদের চামড়া টের পেয়ে যাচ্ছে। গণ্ডারের মতন অনুভূতি পৌঁছতে আর পনেরো দিন লাগছে না।

হুমায়ূন আহমেদ তার ‘যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ’-এ লিখলেন কার্টুনের কথা। মন্ত্রী  বেলচা হাতে ভাঙা রাস্তা ঠিক করছেন এমন ছবি সরবরাহ করা হলো কাগজগুলোতে। উল্টো দুষ্টু কাগজগুলো কার্টুন এঁকে দিলো, ইয়া বড় লোমওয়ালা পায়ে একজন বেলচা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের এখানেও এক সময় শিশির ভট্টাচার্য, হুদা—ওনারা কার্টুন আঁকতেন। এখন সে কার্টুন দুর্লভ। কেনো দুর্লভ সে প্রশ্ন করতে গেলেও হয়তো তাদের অনুভূতি আহত হবার প্রশ্ন উঠতে পারে। আর সেই ‘দুষ্টু’ কাগজ তথা মাধ্যমগুলোও এখন কেতাদুরস্ত ভদ্র হয়ে উঠেছে। তারা নিজের ‘ভালো’টা বুঝতে শিখেছে। অতীতের দিকে আপাতত বাদ। ‘কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’ বলুন তো?

যে কথা বলছিলাম। রীতা দেওয়ান নামে একজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিচারাধীন বিষয়ে কোন কথা নেই। তবে পালা গায়িকা আর বাউল বিষয়ে হয়তো কথা বলা যায়। রীতা দেওয়ান একজন পালা গায়িকা। যাকে কেউ কেউ বাউল বলেও পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছেন। তাদের ভাষায় বাউল হলো—সর্ব-ধর্ম মতের সমন্বয়কারী। তাদের ধর্ম মানবধর্ম। এমন যারা বলেন, তাদের একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বাউল হলো একটা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়। এক কথায় হিন্দু ধর্মের শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারামতের মধ্যে বৈষ্ণবরাই হচ্ছেন বাউল। যাদের কাজ রাধা-কৃষ্ণের প্রেমগাথা বর্ণনা করা। সুতরাং রীতা দেওয়ান বা এমন ধারায় যারা গান-বাজনা করেন তাদের অহেতুক বাউল আখ্যায় বিপত্তি দেখা দিতে পারে। ‘আউল-বাউল ফকির সেজে ভেট নিলাম না’ এমন একটা বিখ্যাত গান রয়েছে। ভেট নেয়া ‘আউল-বাউল’ নয় তার চেয়ে বরং উনাদের পালাগায়ক বা গায়িকা হিসেবেই আখ্যায়িত করাই শ্রেয়।

পালাগান সম্পর্কে কেউ কেউ বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে। শহুরে মানুষ বিশেষ করে এ সময়ের নাগরিক জীবন পালাগান সম্পর্কে অনেকটাই অন্ধকারে। তাই শহুরে হওয়া কেউ কেউ পালাগানের ব্যাখ্যা দিয়ে কাগজের পাতা ভরাতে পারেন। বিপরীতে এখনো গ্রামীণ বা মফস্বলী সমাজ পালাগান সম্পর্কে জানে এবং শোনেও। পালাগান যে অনেক সময় সংস্কৃতির গণ্ডি পেরিয়ে অশ্লীলতায় পা বাড়ায় তাও তাদের জানা। অবশ্য এখন ‘শুক্কুর শুক্কুর দুই শুক্কুরবারে’র শহুরে হয়ে ওঠারা প্রশ্ন করতে পারেন অশ্লীলতার সংজ্ঞা বিষয়ে। তাদের কথা না ধরি। হঠাৎ শহুরে জীবন তাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে। ধাঁধানো চোখে রঙের অনেক বাতিই খেলা করে। ওই যে, ‘লাল নীল বাত্তি দেইখা নয়ন জুড়াইছে’র মতন।

একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এক সময় মানুষ পালাগান আরো বেশি শুনতো। তখনও অশ্লীলতা ছিলো। কিন্তু মানুষ সেই অশ্লীলতাকে উপেক্ষা করে যেতো, আর গ্রহণ করতো বিশুদ্ধ শিল্পের অংশটাকে। ওই যে বললাম, আমরা যত অগ্রসরমান হচ্ছি ততই আমাদের চামড়া চিকন হয়ে উঠছে; অথবা বলা যায়, বহু ব্যবহারে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। সে যাক, মূল কথা হলো এখন আমরা সেই উপেক্ষা করার শক্তিটাকে হারিয়েছি। আগে যেমন রাজনীতিবিদরা নিজেদের কার্টুনকে সহজেই উপেক্ষা করতে পারতো তেমনি। রীতা দেওয়ানই একমাত্র নন, এমন পালাগান হালের ইউটিউব ঘাঁটলে অনেক পাওয়া যাবে। তবে সেই সব গান উপেক্ষার তালিকায়, আলোচিত নয়।

এক সময় সহিষ্ণুতা ছিলো আমাদের সমাজে। না, আমি বলছি না, বলছেন স্বয়ং তসলিমা নাসরিন। সম্প্রতি তিনি তার মেডিক্যাল কলেজে পড়ার স্মৃতি মন্থন করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই সহিষ্ণুতার কথাটা তুলে এনেছেন। সে সময়ের একটি ছবি সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘কলেজ থেকে পিকনিকে গিয়েছি। সাল সম্ভবত ১৯৮০ বা ১৯৮১। কোনও ছাত্রীর মাথায় হিজাব নেই। বোরখা বা হিজাব পরার কথা তখন কারো দুঃস্বপ্নের মধ্যেও আসতো না। সকলে যে তখন নাস্তিক ছিল তা নয়। সম্ভবত আমি ছাড়া আর কেউ  ছিল না।’ খেয়াল করেন দেখেন, সালটা কিন্তু ১৯৮০ বা ৮১। বোঝেন অবস্থাটা।

সিপিবি ঘরানার একজনকে উদ্ধৃত করি। উনার নাম ইমতিয়াজ মাহমুদ। তিনিও মূর্তি-ভাস্কর্য বিষয়ে বয়ান করতে গিয়ে পেছনের কথা তুলে এনেছেন। কী পেছনের কথা শুনুন। সামাজিকমাধ্যমে তিনি বিশদ পোস্টে জানিয়েছেন, ‘অপরাজেয় বাংলা তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তখন জিয়াউর রহমানের সময়, তখন একদল লোক অপরাজেয় বাংলা ভাঙার জন্যে রাতের বেলা খন্তা কুড়াল নিয়ে হামলা করেছিল। বয়স্ক লোকজনকে জিজ্ঞেস করেন, ওদের মনে থাকবে। পুরনো খবরের কাগজে এই নিয়ে রিপোর্টও পাবেন।’ অর্থাৎ সে সময়ে অপরাজেয় বাংলা তৈরির কাজ হচ্ছিলো, সাথে ভাঙার চেষ্টাও হয়েছিলো এবং যা সফল হয়নি। হলে অপারাজেয় বাংলা থাকতো না। এই যে তাদের স্মরণ, এটা অসতর্ক কিনা জানি না। জানার কথাও নয়, যেহেতু এটা নিয়ে এখনো বিতর্ক বা তর্ক কোনটাই চালু হয়নি। তবে এ স্মরণ অবশ্যই আলোচনাযোগ্য।

আলোচনাযোগ্য এ কারণে যে, সময় যত গড়াচ্ছে ততই আমরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি কিনা, তা উপলব্ধি করার জন্য। আমাদের এক সময়ের সমান্তরাল বয়ে চলা পারস্পরিক সমাজ ক্রমেই অসমান্তরাল হয়ে উঠছে কিনা তা বের করার জন্য। এক সময় যা অনুভূতি আহত করতো না, এখন তা করছে কেনো, তা জানার মধ্যেই রয়েছে আহত বিষয়ক শুশ্রূষা। এটা যত দ্রুত আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ উপলব্ধি করবে তত দ্রুত আহতের ক্ষত চিকিৎসা ও নিরাময় সহজ হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1145 seconds.