• ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ ১২:০০:০৯
  • ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ ১২:০০:০৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আনন্দের হর্ষধ্বনি বনাম অসহায়ের আহাজারি

ছবি : সংগৃহীত

চারিদিকে কিছু আনন্দিত মানুষের হর্ষধ্বনি কানে বাজছে। আমি তো ‘এমনি এমনি খাই’ এমন মানুষের ঘোরসর্বস্ব আনন্দের মাঝেই গণমাধ্যমের একটি শিরোনাম ছিলো, ‘ঘরোত ভাত নাই, জারের কাপড় কিনব্যার পাই না’—এমনটা। না, কোনো ‘উল্টোপন্থী’ কাগজ নয়, খোদ দৈনিক কালের কণ্ঠ এমন খবর ছেপেছে। কুড়িগ্রামের মানুষের আহাজারির ধ্বনি এটি। জানি হাজার কোটি টাকার আনন্দধ্বনি ছাপিয়ে এই আহাজারির ধ্বনিতত্ত্ব, ‘আনন্দিত’ তাত্ত্বিকদের কানে পৌঁছাবে না। সামাজিকমাধ্যমে একটি ছবি ঘুরছে। ঘরহারা কিছু মানুষ রোড ডিভাইডারের উপর ঘুমাচ্ছে। তাদের সাথে গলাগলি করে ঘুমাচ্ছে পথের কুকুরও। অভাব মানুষে-মানুষে সাম্য না আনলেও পশুতে-মানুষে সাম্য এনে দিয়েছে। এমন ‘ভয়ংকর’ সাম্যের ছবিও আমাদের আনন্দযজ্ঞের যজমানদের কাছে পৌঁছাবে না।

সামাজিকমাধ্যমে নিখোঁজের খবর দেখলাম। বাড়িতে যাবার জন্য বাসে উঠেছে তারপর আর খবর নেই। তাদের ফিরে পাওয়ার, খবর জানার জন্য স্বজনদের করুণ আর্তি। আমাদের হর্ষধ্বনির ধ্বনিকারদের কানে এমন করুণ আর্তি পৌঁছাবে না। সুখের মৌতাতে আসলে দুখের বাতাস গায়ে লাগে না। কে হারালো, কার ঘর নেই সে সব দেখার সময় কোথায়। আনন্দ-আয়োজনেই তো ফুরায় সব। আর না ফুরালে, তাদের দ্বিতীয় রাষ্ট্র, সেকেন্ড হোম তো রয়েছেই। বিপরীতে কারো রাস্তায় রাত কাটানো—ফার্স্ট হোমও নেই। কুড়িগ্রামে নদীভাঙা মানুষ বাঁধের উপর রাত কাটাচ্ছে, সেই ভাঙন ঠেকানোর কেউ নেই। শুধু এই শীতে নৌকা ভ্রমণের উৎসব আছে। আছে জলের নদীতে ‘চিয়ার্স’ ধ্বনি।

সামাজিকমাধ্যম জানালো, আমার জেলা শহর শেরপুরে একটি নারীকে বাস থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। আহত হয়ে নারীটি হাসপাতালে। জ্ঞান না ফেরা সেই নারীর জায়গা হয়েছে হাসপাতালের মেঝে। কারণ শয্যা নেই। আমাদের হাসপাতালগুলিতে প্রয়োজনীয় শয্যা নেই, অথচ হাজার কোটি টাকা পাচারের উৎসব আছে। বালিশ আর পর্দাকাণ্ড আছে। সেই কাণ্ডে আনন্দ গদগদ কিছু মানুষও আছে। আছে তাদের হর্ষধ্বনির দিগন্ত ছাপিয়ে যাওয়া চিৎকার। সেই চিৎকার ছাপিয়ে কেউ জানায়নি, সেই নারীকে কে ছুড়ে দিলো, কেনো দিলো!

একজন পিতা রাতদিন আহাজারি করেন তার সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে। এমন অসংখ্য পিতার আহাজারি যোগ হয় তার প্রার্থনার অশ্রুতে। কত বাবা-মা, ভাই-বোন খুঁজে ফেরে তাদের নিখোঁজ হওয়া স্বজনকে। বুকে ছবি ঝুলিয়ে যোগ দেয় তারা প্রেসক্লাবের সমুখে, যদি কারো মনে দয়ার উদ্রেক হয়। যদি ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া স্বজন। না, ফিরে আসে না। শুধু তাদের হাহাকারের আওয়াজ বাতাস ফিরিয়ে দেয়। কথিত নষ্ট উল্লাসের তাণ্ডবে তাদের হাহাকার বাতাসও ধরে রাখার সাহস করে উঠতে পারে না।

এই যে একটি বিভ্রান্ত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের চাওয়া পাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। নিঃশব্দ লক্ষ্যহীন রোবটিক যাত্রা। যে যাত্রায় নিজের বাড়তি কোনো প্রাপ্তি নেই, অন্যের বেগমপাড়া গড়া ছাড়া। এই যাত্রা, এমন যাত্রা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে আমরা কেউ তা জানি না। জানি কি?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0946 seconds.