• ১৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:৪২:১২
  • ১৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০৯:৪২:১২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

জ্ঞান সূচকে আমাদের অবস্থান ও পুরুষ না হয়ে মহাপুরুষ হয়ে ওঠা

ফাইল ছবি

জ্ঞান সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার তলানিতে বাংলাদেশ। পাকিরাও এগিয়ে আছে আমাদের থেকে। এ নিয়ে অনেকের আক্ষেপ, মোল্লাদের জন্যই আজ এই অবস্থা। যারা একথা বলেন তাদের বিনীত জানাই, যে সূচকে জ্ঞানের পরিমাপ করা হয়, সেই সূচকে মোল্লাদের কোনো অবস্থান নেই। জ্ঞানের সূচক তা দ্বারাই বিবেচিত হয় যা মোল্লাতন্ত্রের বিপরীতে। একটা দেশের বুদ্ধিজীবীরা কি পরিমাণ বুদ্ধি-জ্ঞানের চর্চা করেন, তাই সে দেশের জ্ঞানের পরিমাপক। কোন হুজুর কোন ওয়াজ মাহফিলে কি বললেন, তা সেই পরিমাপে ধর্তব্য নয়।

নিজেদের ব্যর্থতা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার এই যে দুস্কৃত কসরত, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। এই কসরতের ফলে দেশের মানুষ বিভ্রান্ত হয়। অযথা একটা পক্ষের প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করে। এমন কসরতকারদের এক কথায় ঘৃণাজীবী বলতে পারেন। গুজব সৃষ্টিকারী বলতে পারেন। বলতে পারেন সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীও। কারণ তাদের এই কসরতের বয়ান অসত্য। যা অন্যদেরকে যেমন ছোট করে, তেমনি ঘৃণারও উদ্রেক ঘটায়। সৃষ্টি হয় সামাজিক বিভেদ-বিভাজনের। যা থেকে দেখা দেয় সামাজিক বিশৃঙ্খলা-সংঘাত।

এই যে এতটা বললাম এখন তার ব্যাখ্যা দিই। বলি, কী দিয়ে এই জ্ঞান সূচক পরিমাপ করা হয়। তার আগে বলে নিই, জ্ঞান সূচকে আমাদের অবস্থান। গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স অনুযায়ী মোট ১৩২টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান হলো ১১২তম। হ্যাঁ, এটা এ বছর মানে ২০২০-এরই ইনডেক্স। ২০১২ থেকে ‘সগৌরবে’ একই অবস্থান ধরে রেখেছি আমরা। বোঝেন, ১৩২টি মধ্যে বর্ণিত উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাওয়া দেশের জ্ঞান সূচক হলো ১১২। আর দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অবস্থান বলতে গিয়ে বিব্রত হতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার ৬টি দেশের মধ্যে আমরা শেষের দিক থেকে প্রথম। মানে সবার পেছনে মাথা উঁচু করে আছি।

এখন বড় গপ্পোওয়ালাদের কথায় আসি। যারা বলেন, বলেছেন, মোল্লাদের জন্যই নাকি আমাদের এই হাল। সামাজিকমাধ্যমে তাদের কথায় কেউ কেউ গদগদ সহমত প্রকাশও করেছেন। এদের বিশ্লেষণ করলেই বুঝতে পারবেন, আমাদের জ্ঞানের সূচক এত নিম্নগামী কেনো। যারা মোল্লাতন্ত্রকে সবকিছুতে টেনে আনেন, তারা নিজেরাও জানেন না জ্ঞানের সূচকের পরিমাপক কী। তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, প্রযুক্তিগত ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ,  উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা, উন্নয়ন আর উদ্ভাবন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং সাধারণ সক্ষমতার পরিবেশ—এসব নিয়েই পরিমাপিত হয় জ্ঞানের সূচক। এই সাতটি পরিমাপকের মধ্যে কোনটি মোল্লাদের আয়ত্তে তা কি বলতে পারবেন আমাদের সো-কল্ড জ্ঞানী-গুণীজন। এতটুকু বলতে পারলেও অন্তত আমাদের জ্ঞনের সূচক অন্তত এতটা নিচে নাম তো না।

দক্ষিণ এশিয়ার ডাটাটি সরাসরি গণমাধ্যমের পাতা থেকে তুলে দিই। গণমাধ্যম জানাচ্ছে, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ৪৪.৪ পয়েন্ট নিয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে (বিশ্বে ৭৫তম) আছে ভারত। ৪২.১ পয়েন্ট নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় এবং বিশ্বে ৮৭তম অবস্থানে রয়েছে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা।

অন্যদিকে, ৪০.৯, ৩৬.২ এবং ৩৫.৯ স্কোর নিয়ে যথাক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তান। ৩৫.৯ স্কোর নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার শেষে রয়েছে বাংলাদেশ যা দেশটির শিক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের দুর্বল অবস্থানকে নির্দেশ করে।’

নিজের ভাষায় লিখলাম না, ‘আমাদের সময়ে’র ভাষা তুলে দিলাম। না হলে ‘দুর্বল অবস্থান নির্দেশ করে’র এমন লেখার উছিলায় মোলাতন্ত্রের বিপরীত যে কথিত গুণীতন্ত্র তার রোষাণলে পড়ার সম্ভাবনা ছিলো সমূহ। অক্ষম আর ব্যর্থদের অনল একটাই, সেটা হলো রোষাণল। যাকগে, ৩৫.৯ স্কোর করা বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে শিক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও উদ্ভাবনে। এই যে স্কোরের বোর্ড তা সচল বা বৃদ্ধি করার দায়িত্ব দাড়ি-টুপিওয়ালা হুজুরদের নয়, ঘাস কাটা শিখতে চাওয়া স্যুটকোটওয়ালাদের। শিক্ষা, প্রযুক্তি, উন্নয়ন ও উদ্ভাবন এর কোনটার সাথেই হুজুরদের সংযোগ নেই। এখানে যদি শিক্ষার জায়গায় ধর্মীয় শিক্ষা থাকতো তাও না হয় হুজুরদের হাওলায় কিছু দোষের হাদিয়া দেয়া যেতো। দুঃখের সাথে বলতে হয় তাও এ কালে, এ মুহূর্তে সম্ভব নয়। 

তারপরেও কিছু মানুষ নিজ দোষ এড়াতে, ব্যর্থতা থেকে চোখ ঘোরাতে নানা কসরত করেন। সামাজিকমাধ্যমে হুজুরদের কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন। কাউকে চেতনাবিরোধী আখ্যা দিয়ে তার উপর দোষ চাপাতে চান। মোটকথা নিজে দোষ নিতে কোনভাবেই নারাজ। তারা শিকার করতে চান না যে, তাদের অনেকেরই জ্ঞান চর্চার চেয়ে স্তুতি চর্চাতেই বেশি সময় কাটে। উন্নয়ন আর উদ্ভাবনের চেয়ে বন্দনাতেই তাদের আগ্রহ বেশি। কেন বেশি তাও একটা বড় প্রশ্ন, যার উত্তর দেবার জ্ঞানও অনেকের নেই। আর থাকলেও আপাতত সাধ্যি নেই। 

পুনশ্চ : মুশকিল হলো এই যে জ্ঞান সূচকের ব্যর্থতা, এটা কাটিয়ে ওঠার কোনো প্রচেষ্টা দৃশ্যমান নয়। সেই গতানুগতিক দোষারোপের সংস্কৃতিতেই কাটছে সময়। ২০১২ থেকে একই অবস্থান অন্তত তাই প্রমাণ করে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। আর জরুরি বিষয়ে কিছু জরুরি ব্যবস্থাও নিতে হয়। সে ব্যবস্থার প্রথম ধাপটিই হচ্ছে ‘আপনি পুরুষ নন, মহাপুরুষ’ এমন স্তাবকদের দূরে রাখা এবং তাদের কাছ থেকে দূরে থাকা। একইসাথে মহাপুরুষ হওয়ার আগে পুরুষ হতে হয় এটা ঠিক মনে রাখা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1072 seconds.