• ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ ১৪:০৬:৫৪
  • ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ ১৪:০৬:৫৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বিচার মানি তালগাছ আমার, ধর্ম ও দর্শনের বিপরীতে গোঁয়ার্তুমি

ফাইল ছবি

আমাদের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের ধর্ম বিষয়ে কোনো লেখার আগে নিজেদের আত্মরক্ষার কাজটা সেরে রাখতে হয়। বলতে হয়, ‘আমি ধর্ম-কর্ম তেমনটা করি না, তবুও বলি।’ হ্যাঁ, শুরুটা এভাবেই করতে হয়, যাতে কেউ আবার আমাকে ধর্ম মানা মানুষ না বলে-ভেবে বসেন। শুধু অন্যরা নয়, এ কাজটি আমিও করেছি। ধর্ম বিষয়ে লিখতে গিয়ে আমিও বলেছি, ‘ধর্মের রীতি-রেওয়াজ আমি পালন করি না’। কেনো বলেছি, সোজা কথায় স্রেফ আত্মরক্ষার জন্য। আমাকে যেনো সোকল্ড সেক্যুলারগণের রোষের সম্মুখীন না হতে হয়। কিংবা ধর্মকে উৎসব মানা অতি আধুনিকদেরও। আজকে আবার প্রসঙ্গটা শুরু করতে হলো আমার একজন পছন্দের মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী মুশফিক ওয়াদুদে’র একটি লেখাকে কেন্দ্র করে। তিনি সামাজিকমাধ্যমে ধর্ম নিয়ে লিখতে গিয়ে শুরুটা করেছেন, ‘আমি নিজে খুব রিলিজিয়াস মানুষ না’, এমন টোনে। না, এটা তার সরল স্বীকারোরিক্ত নয়, উপায়হীনের আত্মরক্ষার চেষ্টা।

আমি কী লিখবো, আমি কোন বিষয়ে লিখবো, এটা আমার ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ। সেখানে আমি ধর্ম মানি বা মানি না তার উল্লেখ কেনো করতে হবে! ধর্ম মানলেই শুধু ধর্মের ভালো দিকগুলো বলা যাবে, নইলে নয়—এমন ন্যারেটিভ মূলত মূর্খতার প্রবল পরিচায়ক। উল্টোদিকে ধর্মের যে বিষয় খারাপ লাগে সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, এমন ন্যারেটিভও সে একই মূর্খতা। ধর্মটা যে দর্শন সে কথা অনেকে ভুলে যান। বিশেষ করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার সোকল্ড সেক্যুলাররা। আর সেটা ঘটে ইসলাম বিষয়ে আলোচনাতেই। বৌদ্ধ ধর্মকে দর্শন হিসেবে মেনে নিয়ে অনেকেই লিখেন। আমাদের দেশের দু’একজন আছেন যারা জন্মসূত্রে মুসলমান, শান্তির উদাহরণে বৌদ্ধধর্মকে কথায় কথায় উদ্ধৃত করেন। অথচ ইসলামের ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ উল্টোমুখি। তাদের ধারণা ইসলাম মূলত আইসিস (আইএসআইএস)। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের টার্গেট ছিলো ইসলাম। কারণ তাদের প্রতিরোধটাই ছিলো ইসলামের তরফ থেকে। মুসলমানদের কাছ থেকেই তাদের দখল করতে হয়েছে ভারতের তখত-এ-তাউস। বাংলায় যেমন সিরাজ-উদ-দৌলার কাছ থেকে। ব্রিটিশদের ইসলামবিরোধিতা ছিলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধাচারণ করতে গিয়ে তারা ইসলামের বিরুদ্ধাচারণে নেমেছিলেন। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মুসলিম শাসকদের থেকে আলাদা করতে হলে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কোনো পন্থা ছিলো না তাদের হাতে। তাই ব্রিটিশরা মুসলিম ব্যক্তিশাসকদের পরাস্ত করতে ঘৃণ্য কূটকৌশল ব্যবহার করেছিলেন। সেই কূটকৌশলের অন্যতম অস্ত্র ছিলো ধর্মীয় বিভাজন। যার ধারাবাহিকতার বাইরে আজও এই উপমহাদেশ যেতে পারেনি। আজো ধর্ম-বিভেদের একটি শক্তিশালী কৌশল রূপে রয়ে গেছে। ভারতের দিকে দেখুন, সেই একই রূপ। এই সময়েও সেখানে বিভেদের একটি শক্ত অস্ত্র ধর্ম। বিজেপি সেই ধর্মীয় বিভেদটাকে পুঁজি করেই এগিয়ে চলেছে। এমন কী তারা চলে এসেছে অপেক্ষাকৃত কম বিভাজনের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও। বাংলাদেশেও ধর্মটাকে পুঁজি করা হয়। এই যে যারা পুঁজি করেন তারা মূলত সংখ্যায় বেশিদের ধর্মকেই বেছে নেন। ভারতে হিন্দুদের, বাংলাদেশে মুসলমানদের, মায়ানমারে বৌদ্ধদের। জায়গাভেদে ধর্ম আলাদা, রূপ কিন্তু একটাই।

এ দেশগুলোতে ধর্মকে তীর বানিয়ে তাকে পরিয়ে দেয়া হয় আবেগের ধনুকে। অথচ ধর্ম তীর হলে ধনুক হওয়া উচিত ছিলো দর্শন। যা দিয়ে নিক্ষেপিত তীর ধ্বংস নয়—সৃষ্টির কাজ করতো। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ, দখলকাররা একে ব্যবহার করেছে, করছে ধ্বংসের কাজে। আর এ কাজে সবচেয়ে অগ্রগামী দলটি হচ্ছে কথিত বামরা। না, বিস্মিত হবার কিছু নেই। একটা প্রচলিত কথা রয়েছে, ‘স্বৈরশাসনকে দীর্ঘায়িত করতে কিছু অতি বাম ও নাস্তিক লাগে’। পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকান, সেখানের বর্তমানের চালু কথা হলো, ‘একুশে রাম ছাব্বিশে বাম’। আমার পিতা বলতেন, ‘অতি বিপ্লবী মানেই প্রতিবিপ্লবী’। ‘অতি’ সবকিছুই খারাপ। প্রবাদবাক্যও তাই বলে।

এই ‘অতি’ প্রসঙ্গে মুশফিক ওয়াদুদে’র সামাজিকমাধ্যমের লেখায় ফিরি। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, প্রগতিশীল অথবা সাম্যবাদী সমাজে ধর্মপালনকারী নিজের অধিকার নিয়ে টিকে থাকতে পারবে কিনা? তিনি অবশ্য আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তার জবাবও দিয়ে দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার বিতর্কের জায়গা থেকে তিনি বলেছেন, ‘ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মতন এখানকার সেক্যুলার এবং সমাজতান্ত্রিক মিডিয়ার পরিসরও অসহিষ্ণু। তারা অন্যমত গ্রহণ করতে পারলেও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে গ্রহণ করতে পারেন না।’ এই যে ওয়াদুদের বলা, এখানেও তার সেই আত্মরক্ষার বিষয়টি রয়েছে। এখানে তিনি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো বোঝাতে সব ধর্মকে যোগ করেছেন। অথচ আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিরোধিতা শুধু ইসলামের সঙ্গে সোকল্ড সেক্যুলারদের। দেখুন তারা বিভিন্ন ‘পার্বন’ এমন কী ‘হোলি’কেও ধর্মীয় উৎসব বলছেন, অথচ ‘জুম্মা’কে বলছেন না। ‘জুম্মা’ও মুসলমানদের সাপ্তাহিক মিলন উৎসব। জুম্মা’র নামাজের মূল দার্শনিক দিক হলো সম্মিলন, যা মূলত সম্প্রীতির লক্ষ্যে। এটাকে ঈদ-এর ছোট সংস্করণও বলা যেতে পারে, বলা হয়। খ্রিস্টানদের রবিবারের প্রার্থনাও একই অর্থে। অথচ দেখেন, রবিবার মেনে নিতে সোকল্ড সেক্যুলারদের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু শুক্রবারে তাদের বাধে। এই বাধাবাধির ক্ষেত্রে এই সকল সেক্যুলারদের আইসিস, আরএসএস-এর আরেক রূপ বলতে পারেন। যারা অন্যের দর্শন বয়ানে বা ব্যাখ্যায় বাধা দেন, ঘৃণা ছড়ান তারাই চরমপন্থী। আর চরমপন্থা পরিত্যাজ্য। বলতে পারেন, বাধা দেন কীভাবে? না দিলে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের কেনো আগে বলে নিতে হয়, ‘আমরা ধর্মীয় রীতি পালন করি না’? সোকল্ড সেক্যুলারদের প্রশ্নের উত্তর এমন অসংখ্য প্রশ্ন দিয়েই দেয়া যায়।

মুশফিকের ভাষায় সমাজতান্ত্রিক সোশ্যাল মিডিয়ার ন্যারেটিভ হচ্ছে, ধার্মিক বা তাদের পক্ষে কথা বলা মানুষরা মূর্খ বা মেধাহীন। এই যে মূর্খ বা মেধাহীন বলা এটার কারণও রাজনৈতিক। মোটাদাগে রাজনীতির মূল চেষ্টা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা। যার বড় প্রমাণ দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিনটি দেশ। সোকল্ড সেক্যুলারদের প্রতি তো সাধারণের সমর্থন নেই। কিন্তু তারাও ক্ষমতার স্বাদ পেতে চায়। সাধ আছে সাধ্যি নেই, তাই তারা বিকল্প পন্থায় যায়। বাংলাদেশে সেই বিকল্প পন্থা হচ্ছে ইসলাম বিরোধিতা। এখন এই ইসলাম বিরোধিতায় লাভ কাদের এটা অনুধাবন করাই সত্যিকার পাণ্ডিত্যের লক্ষণ। তাহলেই সোকল্ড সেক্যুলারদের সাথে ধর্মের সংঘাতের কারণটা উদঘাটিত হবে। ধর্ম হিসেবে ইসলামের নানা দিক নিয়ে, কারো মতে যেটা অসঙ্গতি, তা নিয়ে কথা বলা নিষিদ্ধ কিছু নয়। স্বয়ং ইসলামই বিতর্ক নিরসনে ইজমা, কিয়াসের কথা বলেছে।

অনেক নারীবাদীকে দেখেছি তাদের লেখায় বিজ্ঞান ও রাজনীতি, অর্থনীতিসহ নানা বিষয় টেনে ধর্মকে ধুয়ে দিতে। সবচেয়ে মজার কথা হলো, এইসব ‘বাদাবাদী’রা বরাবরই ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করার কথা বলেছেন। সাথে বলেছেন ধর্মের সাথে বিজ্ঞান ও অর্থনীতির সম্পর্কহীনতার কথা। অথচ তারাই যখন ধর্ম বিষয়ে কথা বলতে গেছেন, তখন অস্ত্র হিসেবে রাজনীতি, বিজ্ঞান, অর্থনীতিসহ তাবত কিছু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি এক নারীবাদীর লেখা পড়লাম। সেই নারীবাদীও এসবের বাইরে নতুন কিছু করে দেখাননি। সেই বিতর্কের পুরানো ফর্মেই এগিয়েছেন। তবে তার লেখা পড়ে অন্তত এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিজ্ঞানের সাথে পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির বিষয়ে তার বেশ চর্চা রয়েছে। অন্তত পড়াশোনাটা করেন। তারপরও তার লেখা মনে করিয়ে দিয়েছে সেই প্রকৌশলীর কথা। যিনি চায়ের কাপে বিস্কুট ডুবানো যায় না দেখে, নানা রকম মাপজোক করে, যন্ত্রপাতি দিয়ে কেটে কাপের মাপে করে নিয়েছিলেন বিস্কুটগুলোকে। অথচ মাঝখানে ভেঙে ফেললেই যে চায়ের কাপে ডুবিয়ে বিস্কুট খাওয়া যায় তা তার প্রশিক্ষিত মাথায় সহজে ঢুকেনি। সেই যে বিদ্যা, যার চর্চা তিনি করেছেন, সেই ধারণা দিয়েই তিনি বিস্কুট ছোট করতে লেগে গিয়েছিলেন। বিষয়টি ট্রল সম্পৃক্ত হলেও অস্বীকারের জো অনেক ক্ষেত্রেই নেই। 

আরেকটা কথা, অনেক নারীবাদীই নিজের শরীর প্রদর্শনের স্বাধীনতার কথা বলেন। এক্ষেত্রে তারা বিজ্ঞানের সহজ, প্রচলিত  ও অকাট্য যুক্তিটাকে অস্বীকার করেন। অর্থাৎ এখানে তিনি বিজ্ঞান থেকে সরে আসেন। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণের কথা বিজ্ঞান কী বলে। বলে, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ প্রাকৃতিক। আর আকর্ষণের প্রধান কারণ হচ্ছে দৈহিক গড়ন, গঠন। সোজা কথায় গোপনাঙ্গ। অঙ্গ কেনো গোপন হলো সেটাও বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাতেই রয়েছে। এখানে সমকামিতার কথাও উঠবে জানি, কিন্তু সে কথা সংখ্যাস্বল্পতার কারণে অনুল্লেখ্য। ব্যতিক্রম উদাহরণ নয় সেটা বিজ্ঞানই বলে।

অনেকে বলেন, পোশাকস্বল্পতা দেখতে দেখতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যান। হ্যাঁ, যান। কিন্তু আগ্রহ হারান না। হারালে মনুষ্য প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যেতো। মোটাদাগে একটা উদাহরণ দিই। কুকুর প্রজাতি কাপড় পরে না। গোপনাঙ্গ ঢাকার বিষয়টি কুকুর সমাজে প্রচলিত নয়। কিন্তু যৌনতার ক্ষেত্রে একটি কুকুরের লক্ষ্য থাকে নিরাভরণ কুকুরির যৌনাঙ্গই। অর্থাৎ আভরণ বা নিরাভরণ যাই হোক, যৌনতা তথা উত্তেজনার ক্ষেত্রে লক্ষ্য হয় গোপনাঙ্গই। কাপড় আবিষ্কারের আগে আদিম সমাজে মানুষও তাই ছিলো। মানুষ সভ্য হয়েছে কাপড়ের মাধ্যমে লজ্জাকে আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই। এই যে আমরা ধর্ষণের কথা শুনে লজ্জিত হই, বিক্ষুব্ধ হই এটাও তারই ধারাবাহিকতা।

ধর্মকে সবকিছু থেকে আলাদা রেখে আবার তাকেই সবকিছু দিয়ে চেপে ধরার প্রচেষ্টা এক ধরনের প্রচঞ্চনা। ধর্মকে সবার ধর্ম বলেই বিনা আপত্তিতে মেনে নিতে হবে এমন কথা কেউ জোর দিয়ে বলেনি। ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা তাহলে পৃথিবীতে এত হতো না। সেই ক্ষেত্রে ধর্মকে আলোচনা করতে গেলে তাকে দর্শন হিসেবেই আলোচনা করতে হবে। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে প্রতিপক্ষ বানালে সংঘাত বাড়তেই থাকবে, কমবে না। তবে এর বড় বাধা হলো ‘বিচার মানি তালগাছ আমার’ প্রবণতা। গোঁয়ার্তুমি অজ্ঞানতারই প্রতিচ্ছবি। গোঁয়ার আর সায়েন্স ফিকশনের ‘জম্বি’র মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এই পার্থক্যহীনতার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে সবপক্ষকেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0821 seconds.