• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ১৮:৪৩:০৯
  • ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ ২১:৪৬:১৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘পরীক্ষাতেই ৪ বছর, পরিবার চলবে কিভাবে?’

ওলোরা আফরিন। ছবি : সংগৃহীত

অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী ও বিনয়ী ভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন ব্যারিস্টার ওলোরা আফরিন। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এই ব্যারিস্টার নেতৃত্ব দিচ্ছেন কপিরাইট আইন সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। দেশ থেকে আইনে স্নাতক-স্নাতোকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি লন্ডনের সিটি ইউনির্ভাসিটি থেকে অর্জন করেছেন বার এট ল ডিগ্রি।

ওলোরা দেশে ফিরে কাজ করছেন কপিরাইট আইন নিয়ে। তারমতে যেকোনো কাজের শুরুটা জরুরি। শক্ত গাঁথুনির মাধ্যমে কোনো কাজের শুরু করলে সেটি টেকসই প্রফেসনে পরিণত হয়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদানের পাশাপাশি নিজেকে মেলে ধরতে চান দক্ষ ও যোগ্য সংগঠক হিসেবে।

একই সঙ্গে পরামর্শ দেন হবু ব্যারিস্টারদের প্রতিও। এসব বিষয়ে তার সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন বাংলা’র সিনিয়র রিপোর্টার আমিনুল ইসলাম সিরাজী

বাংলা : দেশ ছেড়ে বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়তে কোন কোন সমস্যার সম্মুখিন হয়েছেন?

ওলোরা আফরিন : আমি এলএল.বি অনার্স সম্পন্ন করে বিলেতে যাই বার এট ল’ ডিগ্রি অর্জন করতে। ২০১২ সালের কথা এটি। বাইরে পড়তে গিয়েছিলাম। অনেক একসাইডেট ছিলাম। নতুন একটা দেশে যাব। নতুনভাবে চলাফেরাসহ সবকিছু। তো আমরা প্রায় ৫০ জনের মতো বাঙালি সেখানে ছিলাম। বাঙলিরা সেসময় ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ওখানেই (লন্ডনে) যেত। এখন কি অবস্থা জানিনা। সেসময় আমার কাছে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিলো যে খাওয়া দাওয়া, রান্না করার পাশাপাশি পড়ালেখা। আবার নিজেরা নিজেদের কাপড়-চোপড় ধোয়া। এবং সবকিছু একইসঙ্গে মেনটেইন করা। সবচেয়ে কম সময়ে তাড়াতাড়ি ডেলিভারি দেওয়া। এটা ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। কারণ প্রচুর ট্রেইনিং, প্রচুর পড়ালেখা গ্যাপ খুব কম পেতাম আমরা। সব সময়ই পড়াশোনায় পরে থাকতো হতো কিন্তু মন তো পরে থাকতো অন্যদিকে। মন চাইতো একটু ঘুরে আসি, শহরটা একটু দেখে আসি। একটু সিনেমা দেখে আসি। বন্ধুরা মিলে কোথায়ও একটু আড্ডা দেই। এগুলো কিন্তু সব সময় মনে হতো। হ্যাঁ, পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে সেগুলো করতে পেরেছি। কিন্তু বারের যে ইন্ট্রানসি ট্রেইনিংটা আসলে খুব কম সময়ের মধ্যে তাড়াতাড়ি ডেলিভারি দিয়েছি।

বাংলা : আপনি কোন দেশ থেকে বার এট ল’ডিগ্রি নিয়ে এসছেন? পড়ালেখার সময় সে দেশের পরিবেশ আপনার কাছে কেমন লেগেছে?

ওলোরা আফরিন : আমি সিটি ইউনিভার্সিটি লন্ডনে পড়তে গিয়েছিলাম। আমাদের প্রতি সেপ্টেম্বরে সেশন শুরু হয় এবং নয় মাসের সেশন থাকে। ওখানে খাপ খাওয়ানোটা শুরুতে কঠিন ছিলো। আসলে বলতে গেলে ঠান্ডা একটা ইস্যু, অনেকে কিন্তু ঠান্ডায় কমফরটেবল। আমি কিন্তু ঠান্ডা একদম ভালো লাগে না। গরমকালটা আমি খুব উপভোগ করি। কিন্তু এরপরেও দেখা গিয়েছে আমরা সবাই খুব ঐক্যবদ্ধ ছিলাম। যে কয়জন ছিলাম সুবিধা-অসুবিধা কোনটা পাচ্ছি, কোনটা পাচ্ছি না, কি লাগবে, না লাগবে এগুলো বিষয়ে আমরা একসাথে টিম হিসেবে কাজ করেছি। একই ব্যাচের একই বয়সের আমরা অনেকেই গিয়েছিলাম। যার কারণে আগেও পরিচয় ছিলো। পরেও পরিচয় হয়েছে ওখানে। এবং ওখানে একসাথে থেকে পড়তে পড়তে সময়টা কিভাবে যেন কেটে গেল বুঝতে পারলাম না।

বাংলা : ব্যারিস্টারি ডিগ্রি নিতে কত সময় লেগেছিল?

ওলোরা আফরিন : সময় লেগেছিল নয় মাস। আমি দেশ থেকে অনার্স কমপ্লিট করে গিয়েছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি বার এট ল ডিগ্রি অর্জনের পর।

বাংলা : যারা ব্যারিস্টার হতে চান তাদের জন্য আপনি কি ধরনের পরামর্শ দিবেন?

ওলোরা আফরিন : আমার পরামর্শ হলো বাস্তবতা এবং থিউরিটিক্যালি বিষয় দুটি কিন্তু পুরোপুরি ভিন্ন । কোর্টে প্রাকটিস বা জুনিয়রশীপ যেখানে আপনি কাজ করেন না কেন, এখানে কতটুতু আমরা পেতাম বা আমাদেরকে দেওয়া হতো তাই না? আসলে কোর্ট ভিত্তিক যদি কেউ হতে চায়, তখন আসলে এখানে লাইসেন্সটা বাধ্যতামূলক। আবার অনেকেই আছেন যারা কোর্টে যাবেন না। যেমন- আমি কোর্টে যেতে আগ্রহী নই। আমার ইন্টারেস্ট নেই। কেউ যদি বলে আমি এখানে কাজ করবো। করপোরেট কাজ করবো। তখন তারা বার এট ল’ ডিগ্রি করে এসেও এখানে চাকুরি করতে পারে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সনদ ছাড়া এখানে শুনানির জন্য তিনটি অপশন আছে। তা হলো কপিরাইট অফিস, কাস্টসম ও ট্রাইব্যুনাল নিয়ে। এগুলো করতে বার কাউন্সিলের কোনো অনুমতি লাগে না। বারের এনরোলমেন্ট লাগে না।

তাই আমার মনে হয়, এই জায়গাগুলো মাথায় রেখে তারা (ব্যারিস্টার) বিলেত থেকে ডিগ্রি অর্জন করে ভালোভাবে কাজ করতে পারবে। কিভাবে, কেমন করে তারা এসব কাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় সেভাবে তা নির্ধারণ করে নিতে হবে। কারণ একেকটা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে একেকটা সমস্যা থাকে। তাই নিজ নিজ সমস্যাগুলো কিভাবে সমাধান করবে সেটি তাকে মাথায় রাখতে হবে। কোন সময়ের মধ্যে কোর্সটা শেষ করবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাংলা : বার এট ল’বড় একটি ডিগ্রি, তারপরও বাংলাদেশে এসে বার কাউন্সিলের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে সনদ নিয়ে ওকালিত করতে হয়। এ বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?

ওলোরা আফরিন : বার এট ল’ অবশ্যই বড় একটা ডিগ্রি আমরা যখন প্রথম লন্ডনে বার করলাম। তখন আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা দিলাম। সাতটা বারে একইরকম প্রশ্ন, একই সময়ে পরীক্ষা। ২০১২ সাল থেকে কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে এমসিকিউ পরীক্ষা শুরু হয়েছে, যেটা আগে ছিলো না। এই যে আগে শুধু বছরে দুইটা পরীক্ষা হতো বাংলাদেশ বারে ছ’মাস পর পর। এখন দেখা যাচ্ছে তিন বছর পর পর পরীক্ষা হয়। রেজাল্ট নিয়ে ভাইবা দিতে চার বছর চলে যাচ্ছে। তাহলে একটি পরিবার চলবে কিভাবে? আপনি ছেলে বলেন বা মেয়ে বলেন- যার উপরে পরিবারটি নির্ভর করে। সেই অবস্থায় কি করবেন? এইটা তো অনেক বড় একটা বিষয়।

যারা ব্যারিস্টার হয়ে আসার পরে কোর্টে প্র্যাকটিস করতে চায়, তাদেরকেও কিন্তু চার বছর অপেক্ষা করতে হবে। একটা মানুষের জীবনে কিন্তু চার বছর অনেক সময়। যদিও হাইকোর্ট অ্যাপিলেট ডিভিশনের একট অর্ডার আছে যে প্রতি বছরই বারের তালিকাভুক্তির জন্য একটা করে পরীক্ষা নিতেই হবে। কিন্তু এরপরেও পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না। আমি মনে করি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল তাড়াতাড়ি সবার জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করুক। যারা এনরোলমেন্ট হবেন তারাসহ সবার জন্য এটা ভালো হবে এবং সেশন জট কমানো। বছরে অন্তত একটা করে পরীক্ষা নিলেও আমার মনে হয় সুবিধা হয়।

পরীক্ষা কঠিন হোক কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ট্রেনিং এবং নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া উচিত। সেশন জট না রেখে ওয়েলকাম করলে ভালো। আমার মনে হয় যারা ভালো পড়াশোনা করবে তারা বারের এনরোল হতে পারবে, অসুবিধা নেই। কিন্তু পরীক্ষা প্রতিনিয়ত হতে হবে। এই যে দেখেন, আইন শিক্ষানবিশরা ধর্মঘট করছে। আন্দোলন করছে। অনশন করছে। এগুলো তো খুবই দুঃখজনক, তাই না? আমাদের দেশের জন্য। প্রতিবছর ৩০ হাজার ৪০ হাজার করে পরীক্ষা দিচ্ছে। মনে হয় এই জিনিসগুলোর প্রতি যথাযথ কর্তৃপক্ষ নজর দিবেন। এগুলো নিয়ে সলিউশন করা দরকার।

বাংলা : ব্যারিস্টারি ডিগ্রি নিয়ে এসে বাংলাদেশে যে পেশায় আছেন সেটি কেমন লাগছে আপনার কাছে?

ওলোরা আফরিন : এই পেশাটা আসলে খুবই চ্যালেঞ্জিং। যে পেশাতেই যাই না কেন চ্যালেঞ্জিং। আমার কাছে গতানুগতিক কাজ কখনোই ভালো লাগে না। আমি সব সময়ই নতুন কিছু খুঁজি। তখনই আমি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপারটি ল’ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলাম। এখানে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। এখানে অনেক ভালো কাজ করার সুযোগ আছে। যদিও আল্লাহর মতে আমার বাবা, ভাই আমার স্বামী ও শশুর আইনজীবী। তারা যেহেতু কোর্টে আছেন। আমি কোর্ট ভিত্তিক প্রাকটিস করতে অনাগ্রহী। তবে ভবিষ্যতে কোনোদিন যদি প্রযোজন মনে করি, আমিও বার কাউন্সিলের সনদ নিব। কোর্টে যাব।

এই সময়ের মধ্যে যেহেতু তারা এই চেম্বারটা রানিং করতে পারছে, এজন্য আমি গবেষণা করার সুযোগ পাচ্ছি। আমি অন্য সাইটে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি। ডেভলপমেন্ট সাইটটা, কোন দিকটা দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভুমিকা রাখবে। যেটি দেশের উন্নয়নে ভুমকিা রাখবে সেটি নিয়ে কাজ করতে আমার খুবই ভালো লাগে। যা বললাম- কপিরাইট অফিস, ট্রেডমার্ক অফিস, কাস্টম ট্রাইব্যুনাল, ক্লায়েন্ট পাওয়ার অফ রিপ্রেজেন্টাশন। যেটি বার কাউন্সিলের সনদ ছাড়া শুনানি করা যায়। কোনো জিনিসের শুরুটা খুব জরুরি। শুরুটা যদি ঠিক মতো ধরিয়ে দেওয়া যায়, তখন কিন্তু পুরো প্রেক্ষাপটই পরিবর্তন হয়ে যায়। এই জায়গায় মেধাসত্ব ল-ইয়ার বলেন বা বিশেষজ্ঞ বলেন- বাংলাদেশে কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই কম।

 বাংলা : সময় দেয়ার জন্য অপনাকে ধন্যবাদ।

ওলোরা আফরিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0903 seconds.