• ০৮ জানুয়ারি ২০২১ ১৮:৩৭:২৩
  • ০৮ জানুয়ারি ২০২১ ১৮:৩৭:২৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনার টিকা প্রাপ্তি এবং ফানুস বুদ্ধিজীবীতা

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কদিন আগেই লিখে প্রশ্ন রেখেছিলাম, ভারতের টিকা কার্যক্রম শুরু এবং আমাদের কবে- এ বিষয়ে। সাধারণ বোধ-বুদ্ধি থেকেই এমন প্রশ্ন। ভারতের সাথে আমাদের চুক্তি। অথচ সোয়া’শ কোটির দেশ মাত্র ৫ কোটি টিকা তৈরি করেছে সেখানের সিরাম ইনস্টিটিউট, নিজেদের দেবে, না আমাদের দেবে। সঙ্গতই ভারত টিকা বিদেশে রপ্তানির ছাড়পত্র দেয়নি। যার ফলে আমাদের টিকা প্রাপ্তি নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে অস্বাভাবাবিক কিছু নেই। দেশ বিদেশের গণমাধ্যমে সে কথারই প্রতিধ্বনি হয়েছে আমার দুদিন পরে। যখন আনুষ্ঠানিক ভাবে জানা গেছে টিকা রপ্তানিতে ভারতের আপাতত না-এর কথা।

আমাদের প্রস্তুতির অবস্থা সবারই জানা। এ নিয়ে বলেছিও অনেকবার। বায়োএনটেক ও মডার্না’র টিকা সংরক্ষণের সক্ষমতা আমাদের নেই। চীনের সিনোভ্যাকের সাথে ট্রায়াল নিয়ে একটা দূরত্ব রয়েছে। রাশিয়ার টিকা প্রাপ্তি নিয়ে আলোচনাই হয়নি। সুতরাং ভারতই আমাদের টিকা প্রাপ্তির একমাত্র উৎস। আর সে উৎসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বরাবরই। পেঁয়াজ কাণ্ডটাই দেখুন। আর চাল রপ্তানির তোঘলকির কথা তো বিস্মৃত হবার নয়। এমন একটি উৎস থেকে টিকা প্রাপ্তি নিয়ে যে ঝামেলা হবে না, তা ভাবনা ও সংশয়ের বাইরের কিছু নয়। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের যে খবর তা সেই ভাবনা ও সংশয়েরই জানান দিচ্ছে।

আমাদের দেশ থেকে বলা হচ্ছে টিকা কেনার জন্য আগাম টাকা দেয়া হয়েছে। জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির প্রথমে টিকা আসছে দেশে। ঠিক আছে, তা নয় আসছে। কিন্তু ভারতের টিকা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা, সিরাম ইনস্টিউটের উৎপাদন ক্ষমতা, ভারতের নিজেদের চাহিদা- সব মিলিয়ে হিসাবটা এক কথায় ‘পাচ্ছি’ বলে দেয়ার মতন সোজা নয়। অগ্রিম টাকা দেয়া মানেই প্রাপ্তি নয় এটা বুঝতে হবে। তবে এ বিষয়ে একটা প্রশ্ন সঙ্গতই এসে যায় যে, আমাদের নিজেদেরই অ্যাস্ট্রা-জেনেকা’র সাথে চুক্তি করে টিকা প্রস্তুতির বিষয়টি খুব কি অসম্ভব ছিলো? আমাদের ওষুধ শিল্পের যে প্রসার ঘটেছে, তাতে সেই অসম্ভব কে সম্ভব করা খুব দুঃসাধ্য ছিলো না। দেখলাম ট্রল হচ্ছে, অন্য দেশের যে কোম্পানি টিকা তৈরি করছে তাদের শেয়ারের দাম বাড়ে আর আমাদের দেশে বাড়ে যারা আমদানি করছে তাদের। অথচ এই ট্রলের বিষয়ে পরিণত না হবার সম্ভাবনা আমাদের ছিলো।

জানি, অনেকে আপত্তি তুলবেন। না, আপাতত সে সুযোগ নেই। সে সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে আমাদের গ্লোব। আমরা যে ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারি, তা জানান দিয়েছে এই ওষুধ কোম্পানিটি। তারা তাদের ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য আবেদন করেছে। অথচ তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেয়ার কোনো খবর আমাদের দৃষ্টি ও কর্ণগোচর হয়নি। যতটা দেয়া হয়েছে ভারতের সিরাম ইনস্টিউটের ওপর। অতটা দিলে হয়তো আমরা ইতোমধ্যে নিজেদের ভ্যাকসিন নিয়ে পুরোপুরি আশাবাদী হয়ে উঠতাম। যেমন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরান নিজেদের ব্যাপারে শক্ত ভাবে জানান দিচ্ছে, তারা তাদের ভ্যাকসিন দিয়েই করোনা মোকাবেলা করবে। আমাদের পক্ষেও এমনটা বলা অসম্ভব ছিলো না। ছিলো কি?

দুই.

এই করোনাকালে মানুষ বাঁচানোর চিন্তাই হলো ফার্স্ট প্রায়োরিটি। আর প্রায়োরিটি নির্ধারণে আমরা বরাবরই ভুল করি। আমেরিকার দিকে তাকান, দেখুন তাদের নির্বাচন থেকে রাজনীতি সব টিকা কেন্দ্রিক। আর আমাদের রাজনীতি ব্যস্ত ভাস্কর্য ইস্যুতে। এমনকি অন্যতম বৃহত্তম দল বিএনপিরও টিকা নিয়ে কোনো কথা নেই। সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির কোনো চেষ্টা নেই। কোনো প্রশ্ন নেই, কেন টিকা প্রাপ্তিতে দেরি হচ্ছে? কেন একমাত্র উৎস হবে ভারত? না, তারা এ ব্যাপারে একদম স্পিকটি নট। অন্যরাও।

এই যে বিপ্লবের দাবিদার বাম, তাদেরও টিকার ব্যাপারে কোনো কথা নেই। তারা আছেন সেক্যুলারিজম নিয়ে। তাদের মাথাব্যথার বিষয় মৌলবাদ। কেউ অস্থির ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বে। করোনা’র ম্যাসাকার নিয়ে তাদের অত চিন্তা নেই। আর বুদ্ধিজীবীদের কথা। আরে ভাই, ‘জীবী’ শব্দটাই তো জীবিকা নির্বাহের সাথে যুক্ত। তাই তারা জীবিকার ধান্ধাতেই আছেন। অথবা তারা রোগ, জরা এবং শোক থেকেও নির্বাণ লাভ করেছেন। তাদের স্বজাতির অনেকেই করোনা’র মৃত্যু-মিছিলে যোগ দিয়েছেন, তাতেও তাদের বোধোদয় ঘটেনি।

অবশ্য আমাদের দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা সবসময়ই ‘দূরদর্শী’। মানে সময়েরটা সময়ে চিন্তা না করে, পরবর্তী সময় নিয়ে ভাবেন। আমি সব সময়ই বলি, তারা পুরুষ না মহাপুরুষ হবার চিন্তা করেন। কিন্তু পুরুষ হবার শর্তটা ভুলে যান। বেঁচে থাকলে কী করবেন, তা ভাবেন। বেঁচে থাকার চেষ্টার ব্যাপারে নিরাসক্ত থাকেন। এই জন্যই তাদের চিন্তা ‘দূরদর্শী’।

অনেকে দেখলাম করোনা পরবর্তী অর্থনীতির চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। কিন্তু করোনা থেকে রক্ষা পাবার বিষয়ে তাদের কোনো ভাবনা নেই। ওই যে বললাম, তারা সম্ভবত নির্বাণ লাভ করেছেন। মুক্তি পেয়েছেন রোগ-শোক-জরা-মৃত্যু থেকে।

আমাদের বুদ্ধিজীবীতার নির্বাণ লাভ অবশ্য আগেই ঘটেছে। কীভাবে ঘটেছে, তা বলতে গেলে অনেক কথা। আর সে কথায় অনেকে রেগে যাবেন। জ্ঞানীরা বিনয়ী হন, আমাদের দেশের জ্ঞানের দাবীদাররা তার উল্টো। তার অল্পতেই অভিমান করেন, রেগে যান। তাদের অনেকে দৌড় অনেকদূর। আবার কারো দৌড় ফেসবুক পর্যন্ত। ধুমায়া গালি দেন। পরবর্তীতে আড়ি, মানে ব্লক করে দেন।

উদাহরণ দিতে গেলে, সম্প্রতি ‘লিভ টুগেদার’ করা এক বুদ্ধিজীবী যুগলের কথা বলতে হয়। বিয়ে নামক ধর্মীয় বা আইনি কোনো বন্ধন ছাড়াই তারা একসাথে রইলেন। যে রওয়ার মধ্যে কোনো কমিটমেন্ট নেই। কারণ, কমিনমেন্টের কথা উঠলেই আইনের কথা উঠবে। কমিটমেন্ট মানেই আইন। সুতরাং তারা রইলেন কমিটমেন্ট বিহীন। যতদিন ভালো লাগবে ততদিন থাকা। না লাগলে আলাদা। কিন্তু সেই আলাদা হবার সময় রেগে গেলেন যুগলের একজন। সামাজিকমাধ্যমে অভিযোগ করলেন এবং তা পাবলিকলি। বললেন, তাকে মারধর করা হয়। তাকে নির্যাতিত হতে হয়। আরে বাবা, কমিটমেন্ট ছাড়া যে সম্পর্ক ইচ্ছে করলেই ছেড়ে দেয়া যায়, তাতে মারধর-নির্যাতন সহ্য করতে হবে কেন? ছেড়ে দিলেই হয়। আর যদি অভিযোগ করতে হয় তাহলে তো কমিটমেন্টের প্রশ্ন ওঠে। আর কমিটমেন্ট মানে আইন। যেখানে প্রতিকার সম্ভব। সে আইনে তো নিজেরা বাঁধা পরেননি। সুতরাং আর অভিমান-অভিযোগ বা রেগে যাওয়াই কেন?

আমাদের সো কল্ড বুদ্ধিজীবীদের অবস্থা এমনই। তারা অল্পতেই রেগে যান। তারা কমিটমেন্ট বোঝেন না। অথচ কথায় কথায় কমিটমেন্টের আলাপ ঝাড়েন। বুদ্ধিবৃত্তি বোঝেন না, লেখায়-বলায় বুদ্ধির ‘স্ফুরণ’ ঘটান। সে ‘স্ফুরণ’ অনেকটা ফানুসের মতন, দেখতে সুন্দর লাগে এবং স্বল্পায়ু। যে ফানুস কিংবা তার আলো কোনোই কাজে লাগে না। লাগে কি?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0854 seconds.