• ১৩ জানুয়ারি ২০২১ ১০:০৫:৪৭
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২১ ১০:০৫:৪৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মহিলা কাজি ও না জানা দ্বিতীয় লাইন

ছবি : প্রতীকী

মহিলারা কাজি হতে পারবেন না—এটা হাইকোর্টের আদেশ। কেন পারবেন না, তার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে আদেশে। বাংলাদেশে বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কথা চলে না। আদালত অবমাননার দায় চাপে কাঁধে। সুতরাং সেই আদেশ নিয়ে কোনো কথা নেই। তবে যিনি এই রিট করেছিলেন তিনি বলেছেন, আশা ছাড়েননি, আপিল করবেন। তাকে সাধুবাদ। শেষ দেখাটা জরুরি। মাঝপথে থেমে যাওয়াটা বোকামি কিংবা চালাকি। বোকামিটা হলো হাল ছেড়ে দেয়া। চালাকিটা হলো ‘বাগিয়ে’ নেয়া। ওই যে হঠাৎ করে মামলার আপোস যেভাবে হয়ে যায়।

এক যুগ আগের রিপোর্টিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা বলি। এক পোশাক শ্রমিক গ্যাংরেপের শিকার হয়েছেন এমন খবরে গেলাম হাসপাতালে। কথা বললাম সেই নারী শ্রমিকের সাথে। আমার জিজ্ঞেস করতে হলো না, তিনিই বললেন, ‘ছয় জন কাজ করেছে আমার সাথে।’ সাংবাদিকতা অনেক দিন ধরেই করি। ‘কাজ’ শব্দটা কানে বাজলো। মনে হলো, ‘কাজ’ শব্দটা ব্যবহার করেন সাধারণত যারা শরীরজীবী, তারা। মনের মধ্যে খটকা লেগেই রইলো। মামলা হলো, আসামি কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেন। একমাস পর ফলোআপের জন্য গেছি আদালতে। দেখি সেই পোশাক শ্রমিক পান খেয়ে লাল মুখে আদালতের ভেতরেই আসামিদের সাথে চুটিয়ে আলাপ করছেন। অনেকেই বিস্মিত হলেন, অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে আমার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় পৌঁছালো না। চেষ্টা করলাম খবরের পেছনটা জানতে। কোর্ট ইন্সপেক্টর পরিচিত। তাকে বললাম, ভিক্টিমের বান্ধবী, যে কিনা মামলার প্রধান সাক্ষী তার সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতে। ব্যবস্থা হলো।

‘তোমাকে তো কিছু দিলো না, ওতো একাই সব নিয়ে গেলো’, অনেকটা আন্দাজের ওপর বলা। লেগে গেলো। রীতিমত কথার কলেরা। কী কারণে ওই পোশাকশ্রমিক সেখানে গিয়েছিলেন। গোলটা বাঁধলো কোথায়। কেন মামলা এবং শেষ পর্যন্ত কত টাকায় ফায়সালা হলো। ওকে কেন দেয়া হলো না, সব বলে দিলেন সেই বান্ধবী। নিজের ধারণা ভুল ছিলো না, নিশ্চিত হলাম। এটাই হলো সেই চালাকি মানে ‘বাগিয়ে’ নেয়া, আপোসের কাহিনি। তবে আজকের প্রসঙ্গের সাথে এ উদাহরণ যায় না। হওয়া ও যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তার ওপর আশার কথা, এখানে যিনি বাদি, তিনি শক্ত ধরনের মানুষ। মনে হচ্ছে সহজে হাল ছাড়বেন না। আশা করবো আপিলে যেনো তার পক্ষে ফায়সালা আসে। নারীদের মানুষ হিসেবে কাজের অধিকার মেলে।

বিয়ের নিয়ম বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। আমাদের কাজিদের ম্যারেজ রেজিস্টার হিসেবে কাজ করতে হয়, আবার দোয়াও পড়াতে হয়। অথচ এ কাজটি দু‘জনে ভাগ করে করা যায় এবং তাই উচিত। ইসলামে বিয়ে মানে দু’জনের ‘কবুল’ বলা। দু’জন মানুষের পরস্পরকে গ্রহণের প্রকাশ্য সম্মতি। রেজিস্ট্রেশনটা আইনি কায়দা। পরস্পরের স্বীকারোক্তির সরকারি সিলমোহর। রেজিস্ট্রেশনের কাজটুকুর সাথে শারীরিক শূচিতার কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়। যা দোয়ার ক্ষেত্রে হয়। আর দুটো কাজ একজনকে দিয়ে না করানোই ভালো। অনেক ক্ষেত্রে করানোও হয় না। দোয়া পড়ান আত্মীয় বা স্থানীয় মুরুব্বিদের কেউ। এমন হলে শূচিতার বিতর্ক এড়ানো হয়তো সম্ভব।

আমাদের দেশে হুটহাট করে কাজি ডেকে আনা হয়। এমন ধরন দেশের বাইরে নেই। উন্নত দেশগুলোতে বিয়ের জন্য আগাম নোটিশ দিতে হয়। তারপর রেজিস্ট্রেশনের ডেট হয়। অথচ এ দেশে তা হয় না। এখানে কাজিদের এলাকা ভাগ করে দেয়া আছে। এক এলাকার কাজি আরেক এলাকায় বিয়ে পড়াতে যেতে পারেন না। এক্ষেত্রে হুটহাট ডাকার ঘটনায় যদি কাজি অসুস্থ থাকেন কিংবা কোনো কারণে রেজিস্ট্রেশনের কাজ করা সম্ভব হলো না, তবে? তাই বিয়ের ডেটের ব্যাপারে কাজিকে আগাম নোটিশ দিয়ে রাখলে ঝামেলার সম্ভাবনা থাকে না। এই চিন্তাগুলো খুব কঠিন নয়, সহজ চিন্তা। সমাধানটাও সহজ হওয়া উচিত।

যাকগে, অন্য কথায় আসি। মহিলারা কাজি হতে পারবেন না, এমন আদেশের পর অনেকের আহাজারি দেখেছি সামাজিকমাধ্যম থেকে গণমাধ্যম অবধি। তারা অবশ্য সাহসী। তারা আদালতের আদেশ নিয়েও কথা বলেন। তবে মুশকিল হলো যেখানে বলা দরকার সেখানে বলেন না। আমাদের দেশে ‘আহাজারি’র মানুষের অভাব নেই। প্রয়োজনে ভাড়ায় আহাজারি করতে লেগে যান। ভারতের রুদালি সম্প্রদায়ের মতন। কেউ মারা গেলে তাদের ডেকে আনা হয় কাঁদার জন্য। তাও রীতিমত মোটা অঙ্কে। এই যে, মহিলারা কাজি হতে পারবেন না, তাদের ঋতুকালের জন্য। আর ঋতুকালে ইসলামে ধর্মীয় কাজ নিষিদ্ধ। সুতরাং ইসলামের হাতে হ্যারিকেন তুলতে ‘রুদালি’রা মাঠে নেমে পড়লেন। তাদেরই আহাজারিতে সরগরম মাধ্যমগুলো।

বুদ্ধিজীবী, মুক্তমনা বলে দাবিদারদের হাউকাউ দেখলেই বুঝতে পারবেন, আমি মিছে বলছি না। বাংলাদেশের এই শ্রেণিটা ধর্মকে কব্জা করার মতন কোনো জায়গা পেলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হিতাহিত জ্ঞানের কথায় বলছি। ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’। বহুল প্রচলিত কথা। এ কথা দিয়েই পুরুষেরা সংসারের অসুখের দায়িত্বকে নারীর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে চালাকির হাসি হাসেন। হ্যাঁ, চালাকরা হাসেন, বুদ্ধিমানরা নন। কারণ বুদ্ধিমানরা জানেন, ওই প্রচলিত কথার পরের লাইনটি। আর সেটা হলো, ‘গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে’। অর্থাৎ একটা পার্ট যারা জানেন তারাই বেশি হাউকাউ করেন। তেমনি আমাদের কথিত বুদ্ধিজীবী, মুক্তমনাগণ এক পার্ট জানা পার্টি।

সেই মুক্তমনাদের তীর্থক্ষেত্র রাশিয়ায় মেয়েদের ট্রেনের চালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হতো না। সেই সোভিয়েত আমল থেকেই। কারণ হলো, ট্রেনের চালক হতে হলে আন্ডারগ্রাউন্ডে প্রশিক্ষণ নিতে হয়, যাতে মেয়েদের স্বাস্থ্যহানি হতে পারে, এমন ধারণা। অর্থাৎ সোজা ভাষায় মেয়েরা দুর্বল। ঘটনাটি মনে করিয়ে দিলেন, তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক নয়, একজন সত্যিকার বিজ্ঞানী। যিনি রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। রাশিয়াতে আরো নানা কাজে মেয়েদের নিষেধাজ্ঞা ছিলো। যেগুলোকে রাশিয়ান পুরুষরা ভারী কাজ বলে বিবেচনা করেছিলেন। এখন সে ট্রেন্ড থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে রাশিয়া। সম্প্রতি নারীদের ট্রেনের চালক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে রাশিয়া। বাংলাদেশেও নারী ট্রেনচালক রয়েছেন। কিউবার কথাও বলা যায়। সেখানেও মেয়েদের অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অতএব, ইসলামের বলা ঋতুকালই বাধ্যবাধকতার একমাত্র কারণ নয়। আমাদের কথিত মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীদের দ্বিতীয় লাইন—মানে সেই পার্টটাও জানা উচিত।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0798 seconds.