• ২১ জানুয়ারি ২০২১ ১৩:৩০:১৪
  • ২১ জানুয়ারি ২০২১ ১৩:৩০:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ফাগুনের ক্ষোভ, আমাদের মেনে নেয়া ও অক্ষমের প্রার্থনা

ফাগুনের খুব ক্ষোভ ছিলো, ঠিক জায়গা ঠিক লোক না থাকার ব্যাপারে। ওর দাদু মানে আমার বাবা যাকে ফাগুন দাদুবাবা ডাকতো। তাকে তার যোগ্য জায়গা কেন দেয়া হয়নি এ নিয়ে দারুণ ক্ষোভ পুষে রেখেছিলো ফাগুন। একজন রাজনীতিকের মোটামুটি আকাঙ্ক্ষা যা থাকে, সে আকাঙ্ক্ষা পূরণের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন আমার পিতা। কিন্তু দরোজাটা খোলা হয়নি। কেনো হয়নি তা বলতে গেলে রীতিমত রাজনৈতিক উপন্যাস হয়ে যাবে। এখনের আলাপ নয় সেটা। যদি সময় পাই সেটাও জানানোর চেষ্টা করবো। বোঝাতে চেষ্টা করবো রাজনীতির ভেতরকার রাজনীতি। চোরে চোরে মাসতুতো ভাইয়ের উপাখ্যান।

ফাগুন ছোট থেকেই বিষয়গুলো জেনে এসেছে। দেখেছে ওর দাদুবাবার সততা এবং মানুষের জন্য মায়া এবং সাথে দাক্ষিণ্য। দাদুবাবার না পাবার দুঃখটা তাকে স্পর্শ করেছিলো প্রচণ্ডভাবে। তাই সে দাদুবাবার অপ্রাপ্তির বিষয়টাকে মেনে নিতে চায়নি। তাই সকল অপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে তার চেষ্টা ছিলো প্রতিবাদের। তার বয়সে যতটুকু করা সম্ভব তার থেকে বেশি প্রতিবাদ করেছে সে। চোখের সামনে কোনো অন্যায় কখনো মেনে নেয়নি ফাগুন। সাংবাদিকতায় ঢুকেও তাই করতে চেয়েছে। তার কাজের মাধ্যমে অন্যায় অসঙ্গতি তুলে আনার চেষ্টা করেছে। ভয় পায়নি। ভয়কে জয় করেই সে তার জীবন শুরু করেছিলো, শেষ করতে পারেনি। তবে ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণও করেনি।

বংশ পরম্পরায় সাংবাদিকতা এবং রাজনীতি। ফাগুন রাজনীতিতে ঢোকেনি তার দাদুবাবার বিরুদ্ধে হওয়া রাজনৈতিক প্রতারণার কারণে। রাজনীতি তার নিজস্ব ট্র্যাক হারিয়েছে—বুঝতে পেরেছিলো ফাগুন। যেমন আমি বুঝতে পেরেছিলাম। যার ফলে সাংবাদিকতাটাই বেছে নিয়েছিলো ও। নিয়েছিলো মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছেতেই। বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাওয়া ফাগুনের জন্য কোনো ব্যাপারই ছিলো না। সুযোগ ছিলো, পেয়েছিলো, যায়নি। চেয়েছিলো দেশে থেকেই দেশের জন্য কাজ করার। যেমন করেছিলেন ওর দাদুবাবা, দাদুমা এবং পূর্বপুরুষেরা।

রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ ছিলো ফাগুন। কিন্তু রাজনীতি বুঝতো ও। নির্বাচনের আগে বলেছিলো কী কী কারণে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তার একটি কথাও ভুল হয়নি, বরং আমি তর্কে গেয়েছিলাম ওর সাথে এবং আমি ভুল ছিলাম। ফাগুন যা বলেছিলো তাই হয়েছিলো, হচ্ছে। এতটুকু একটা বাচ্চা ছেলে, কী পরিষ্কার চিন্তা, কী ধারালো চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভাবতে গেলে অবাক হই, বিস্মিত হই। এই বিস্ময় নিয়েই একদিন আমাকে চলে যেতে হবে।  

আমার এক অনুজ বলেছিলেন—‘ভাই আপনার আর চিন্তা নেই। ছেলেটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আপনাদের বংশ পরম্পরা ঠিক থাকবে। ও পারবে।’ ফাগুন তো পেরেছিলোই। কতটা পেরেছিলো তা তার সহকর্মীরা জানেন। কতটা পারতো তাও আন্দাজ করতে বিন্দুমাত্র কারো মধ্যে দ্বিধা ছিলো না। আমাদের পরম্পরা থামলো ফাগুনেই। কে এগিয়ে নেবে এই পরম্পরার ধারাবাহিকতা?

ইংরেজি নিঃসন্দেহে ভালো জানতো ফাগুন। বাংলাদেশের অনেক ভালোর চেয়েও ভালো। যারা তার সাথে কাজ করেছেন তারা জানেন। আমাদেরই পরিচিত একজন। ইংরেজি ভালো জানা নিয়ে তার অহঙ্কার হাঁটাচলাতেও প্রকাশ পেতো। এখনো পায়। বড় বিরক্ত ছিলো ফাগুন তার প্রতি। খুবই বিরক্ত। একদিন বললাম, ‘তুই এত বিরক্ত কেনো, অহঙ্কারি বলে?’ জবাবে বলেছিলো ফাগুন, ‘না, ভদ্রলোক এত ভুল ইংরেজি বলেন, তা নিয়েই বিরক্ত। ভুল যে বলেন, সেটাও তার বোঝার চেষ্টা নেই।’ সেই ভদ্রলোক এখন মহীরুহ। অথচ জানি, ইংরেজি বিষয়ে তিনটা প্রশ্ন করলে দুটোরই উত্তর তিনি দিতে পারবেন না। আরেকটা দিলেও সেটা ভুল হবে।

যাকগে, এ ধরণের ব্যক্তিগত সমালোচনা সাধারণত আমি করি না। মন বিক্ষিপ্তু ও বিক্ষুব্ধ বলেই করলাম। এসব উচ্চিংড়েরাই আজকে অনেক জায়গা দখল করে আছে। ফাগুনের ক্ষোভটাও এই জায়গাতেই ছিলো। যোগ্য লোকের যোগ্য জায়গায় না থাকার বিষয়ে। তার দাদুবাবা পাননি যোগ্য জায়গা। অথচ উচিত ছিলো। তার থেকে অনেক বেশি অযোগ্য লোক সেসব জায়গায় বসে আছেন তখন থেকে আজ অবধি। ফাগুনের দাদুবাবা মানে আমার পিতাকে তার কর্মীরা বোকা বলতেন। কারণ তার টাকা-পয়সার প্রতি কোনো লোভ ছিলো না। নিজের জায়গা-জমি বিক্রি করে রাজনীতি করেছেন। মানুষের জন্য, দলের জন্য খরচ করেছেন। নিজের উত্তরপুরুষদের চিন্তা করেননি। তার ধারণা ছিলো তিনি মানুষের জন্য করছেন, তার উত্তরপুরুষদের জন্য ঈশ্বরের কৃপা নেমে আসবে। জানি না, কী নেমে এসেছে তার উত্তরপুরুষের ওপর। উল্টো তার পরম্পরারই সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিলো না। ফাগুনের মতন একজন অসম্ভব মেধাবী তরুণের খুন হয়ে যাওয়া কোনো ভাবেই উচিত ছিলো না। এ আমাদের ব্যর্থতা, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।

ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন, ফাগুন রেজা। একজন নির্ভীক গণমাধ্যমকর্মী। এত অল্পবয়সে গণমাধ্যমে, তারোপর ইংরেজি মাধ্যমের সহ-সম্পাদকের কাজ করা খুব ছোট কথা নয়। সাথে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং, যা অনেক অভিজ্ঞজনের জন্যও অসম্ভব ছিলো, করেছে সে। বাধার সম্মুখীন হয়েছে। প্রলোভন দেখানো হয়েছে। হুমকি দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাকে টলানো যায়নি। কেউ কেউ বুঝতে শুরু করেছিলো পরম্পরার ধারাতে সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র এটি। এটিকে এখনই থামিয়ে দিতে হবে। দিয়েছে। এক ঢিলে অবশ্য দুটো পাখি মারার চেষ্টা করা হয়েছে। এক পরম্পরা থামিয়ে দেয়া। একই সাথে আমাকেও থামিয়ে দেয়া। তাদের হিসেবে বড় ভুল ছিলো, আমি তো ফাগুনেরই বাবা।

ফাগুন চলে যাবার বিশ মাস হলো। এখন পর্যন্ত জানা যায়নি, তাকে হত্যার কারণ। নানা ধানাইপানাই দেখেছি, শুনেছি। মূল আসামিদের একজন ধরা পড়েছে। আশা ছিলো পুরো রহস্যটা এবার উন্মোচিত হবে। না, কিছুই হয়নি। বরং যে ধরা পড়েছে, সে অসুস্থ—তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না, এমন অজুহাত জানতে পেরেছি দায়িত্বশীলদের কাছ থেকেই। বিস্মিত হইনি। এই তো আমাদের দেশ। সাগর-রুনি’র উদাহরণ তো সমুখেই রয়েছে। রয়েছে অনেক আরো। খুন-গুম এখন সয়ে গেছে। যেমন কোভিড গা সওয়া হয়ে গেছে। মানুষের আর মৃত্যুভয় নেই। তারা জানে উপায় নেই, মৃত্যুকে সাথে করেই চলতে হবে। আমরাও চলছি তাই। সর্বক্ষণ মৃত্যুকে সাথে করে। ঘর থেকে বের হলে আবার ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। এমনকী বেডরুমের নিরাপত্তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। সাগর-রুনি খুন হয়েছে বেডরুমেই। নবারুণ ভট্টাচার্য ভারতের প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, ‘এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়’ —আমরা চাই না আমাদের দেশ মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠুক। চাই আমাদের উত্তরপুরুষরা বেঁচে থাকুক। মেধাবী সে পুরুষেরা গড়ে তুলুক আমাদের প্রার্থিত দেশটি। এ আমার আশা, আমাদের প্রার্থনা।

পুনশ্চ: আশা আর প্রার্থনা আমাদের পূরণ হবার কোনো উপায় আছে কি? থাকলে কেন ফাগুনেরা খুন হয়ে যাচ্ছে? কেন মেধাবীরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে নিরাপদ জীবনের আশায়? এসব প্রশ্নের উত্তর আছে কি কারো কাছে? জানি, আপাতত নেই।

ফুটনোট : জানেন তো, প্রতিমাসের একুশ তারিখটা এলে নিজের অজান্তেই হাত কিবোর্ডে চলে যায়। ক্ষোভ উগরে দেয় আঙুল। কী করা, সন্তানহারা পিতার আর কী করার আছে, ক্ষোভের প্রকাশ ছাড়া। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট, আততায়ীর হাতে নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজা পিতা।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ফাগুন রেজা কাকন রেজা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0871 seconds.