• ২৮ জানুয়ারি ২০২১ ১২:২৭:০৭
  • ২৮ জানুয়ারি ২০২১ ১২:২৭:০৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর অনশন ও আমাদের শিক্ষা

ফাইল ছবি

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ সামাজিকমাধ্যমে পরিয়ে যারা অহং প্রকাশ করছেন তাদের কাছে বিনীত প্রশ্ন, নিজেকে প্রশ্ন করুন তো শিক্ষিত হয়েছেন কি? হলে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী নিজ অধিকার আদায়ের জন্য অনশন করছেন, তাদের সমর্থনে কোনো ছাপ নেই কেনো আপনাদের নিজ প্রোফাইলে?

অনশনরত দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাদের একজন একটু সুস্থ হয়েই আবার অনশনে ফিরে এসেছেন। আরেকজন হাসপাতালে। তার বদলে তারই এক বন্ধু অনশনে বসেছেন। ছাপ লাগানো আপনাদের অনশনে বসতে বলছি না, অন্তত সহমর্মিতাটা দেখান, তাতেই হবে। জানি, আপনারা সাতে-পাঁচে থাকেন না। বারান্দা থেকেও নামেন না, রুদ্রনীল ঘোষ তা জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সামাজিকমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপের সাথে সংহতির ছাপ লাগালে দোষটা কোথায়?

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সে দুই শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলা হয়েছে। কারা করেছেন, যাদের শিক্ষার্থীদের জীবন নিশ্চিত করার কথা তারাই। দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ অসদাচারণের। সেই শিক্ষকদের বলি, আচরণ শেখান কারা? শিক্ষক শব্দটার মানে কী? শিক্ষার সার্বিক মানে কোনটা, শুধু পাঠদান, নাকি সমূহ সকল দান? শিক্ষালয়ের কাজ কী শুধু শিক্ষার্থী বানানো না মানুষ বানানো? এই উত্তরগুলো অসদাচরণ শব্দটির সাথে খুবই প্রাসঙ্গিক। এর উত্তর না জানা থাকলে অসদাচরণের অভিযোগ তোলাও সঙ্গত নয়। আর জানা থাকলে তো আরো নয়।

সামাজিকমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ লাগানো যেমন ক্ষেত্র বিশেষে অহং-এর প্রকাশ। তেমনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তার জানান দেয়াও তাই। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের জানান দেয়ার চেয়ে কী শিখেছেন তার জানান দেয়া উচিত। অনেককে দেখি শান্তিনিকেতন থেকে পাশ করেছেন—তার জানান দেন নানান উছিলায়। আর সেই জানান দেয়ার সাথে থাকে চর্চিত অহং। সেই অহংধারীদের সদয় অবগতির বলছি, অবস্থানগত হিসেবে আলোচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মধ্যে শান্তিনিকেতনের ক্রম হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও নিচে। আর ১৪০০-এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রম এক হাজারের উপরে। সুতরাং অহংকারের কিছু নেই। শিক্ষা অহংকারী করে না বিনয়ী করে। যারা অহংবোধে ভোগেন তারা আসলে মূল শিক্ষাটাই আত্মস্থ করতে পারেননি। কলকাতার সেই বাবুর মতন আপনাদের ‘ষোল আনাই মিছে’।

আপনি কোথা থেকে শিখলেন সেটা বড় কথা নয়, আপনি কী শিখলেন সেটাই আসল। একজন উম্মি মানে নিরক্ষর ‘মুহম্মদ’ জাহেলিয়াত থেকে একটা জাতিকে বের করে এনেছিলেন। জানি, অনেকের এ উদাহরণটা মনে ধরবে না। কারণ এতে ইসলাম জড়িত। তারা অহংবোধের সাথে আরেকটা জিনিস আয়ত্ত করেছেন, ইসলামফোবিয়া। সেদিকে আর না যাই, বলি লালনের কথা। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শেখেননি। কিন্তু তার আখড়ায় অনেক নামজাদাদের দেখি গিয়ে ধন্য হতে। এমন উদাহরণ দিতে গেলে হাজারো দেয়া যায়। উদাহরণ বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, আপনি কী শিখেছেন। আর আপনার কাছ থেকে সমাজ কী আশা করে। পরবর্তী প্রজন্মকে আপনি কী শেখাবেন।

কালকে আপনার বাচ্চাও সেই দুটো বাচ্চার মতন অনশনে বসতে পারেন। তাদের বিরুদ্ধেও অসদাচরণের অভিযোগ ওঠতে পারে। কারণ আপনাদের মতন লোকেরাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। শিক্ষক যেখানে ঋষিসম হওয়ার কথা উল্টো তাদের অহংবোধ হয়ে ওঠেছে প্রবল। অনভূতিপ্রবণতার এই কালে কথায় কথায় তাদের অহং অনুভূতি চাগিয়ে ওঠছে। ঋষি থেকে তারা ক্রমেই বৃষ হয়ে ওঠছেন। চাচ্ছেন গুতিয়ে দিয়ে নিজ শক্তিমত্তার প্রমাণ দিতে। বোঝাতে চাচ্ছেন ক্ষমতার যোগসূত্রতা।

ছবিতে যখন দেখলাম অ্যাম্বুলেন্স থেকে সেই অনশনরত এক শিক্ষার্থীকে নামানো হচ্ছে। তিনি হাসপাতাল থেকে একটু সুস্থ হয়েই ফিরে এসেছেন অনশনে। তার ন্যায্য দাবি আদায়ে। চোখ ভিজে উঠলো। এই তীব্র শীতে, করোনাকালে দুটি বাচ্চার এই অসম যুদ্ধে আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপ লাগানো একজন হয়েও ঘরে বসে কম্বলের ওম নিচ্ছেন। দুটো বাচ্চা যখন নিজের অধিকারের জন্য লড়ছেন, তখন আপনি হিসেব করছেন নিজ সন্তানের ভবিষ্যতের। মনুষ্যত্ব দিয়েই মানুষ পশু থেকে আলাদা হয়েছে। আপনাদের নিরবতা সে কথাই মনে করিয়ে দেয়, ‘মানুষ পশুও বটে’। বড় বিস্ময় লাগে। এ কেমন অনুভূতিহীন সময় পার করছি আমরা। এ কেমন সময়!

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0889 seconds.