• ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:২৯:২৭
  • ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:২৯:২৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও আমরা

ছবি : প্রতীকী

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। অনেকেই নিজের মতন করে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন অনুসন্ধানের। কেউ কেউ স্কুপ জার্নালিজম কিংবা লিক জার্নালিজম যাকে বাংলায় ‘ফাঁস সাংবাদিকতা’ বলা যায় তার সাথে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে মিলিয়ে ফেলছেন। আমাদের অনেক রথী-মহারথীর সাংবাদিকতার জ্ঞানও এই আলাপে ‘লিক’ হয়ে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে তাদের ‘আপার চেম্বার’-এর অবস্থা।

সত্যিকার অর্থেই যা সংবাদ অর্থাৎ খবর তার সাথে অনুসন্ধানের যোগ থাকবেই। তাই ঘটনা আর খবরের পার্থক্যটা প্রথমে বোঝা উচিত। সব খবরই ঘটনা, কিন্তু সব ঘটনাই খবর নয়, সাংবাদিকতার এই প্রথম পাঠের ‘বিসমিল্লাতেই অনেকের গলদ’ থাকে। ঘটনাও মানুষকে জানাতে হয়। অনুসন্ধানের শুরুটা ঘটনা কখন খবর হয়ে ওঠে তার মধ্যদিয়ে।

ইত্তেফাকের উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন আখতার-উল-আলম। যিনি আমার সাংবাদিকতার দ্বিতীয় শিক্ষক। তিনি বলতেন, ‘অনুসন্ধান কী। কীভাবে শুরু তার। সাধারণ একটা বিষয়ের মধ্যে দিয়েও তার শুরু হতে পারে। যা দিয়ে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের পার্থক্য করা যায়।‘ তিনি বলতেন, ‘ধরো একটি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, রাস্তার উপর দিয়ে নোংরা পানি বয়ে যাচ্ছে। একজন সাধারণ মানুষ জায়গাটুকু পার হয়ে যাবে। আর একজন সাংবাদিক পার হবার আগে-পরে চিন্তা করবে, পানিটা কোথা থেকে আসছে, কেন আসছে।’ এখানেই খবরের অনুসন্ধান শুরু। একজন সাংবাদিককে অনুসন্ধানী হতেই হয়। না হলে সাংবাদিকতা হয় না।

এটা হলো খবরের অনুসন্ধান। কথা উঠেছে অনুসন্ধানের খবর নিয়ে। অর্থাৎ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম। আমার একজন সিনিয়র কলিগ এ প্রসঙ্গে বলছিলেন উইকিলিকস’র কথা। আমি বললাম, এটা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নয়, স্কুপ বা লিক জার্নালিজম। আপনি হঠাৎ একটি উৎস থেকে একটা কাগজ পেয়ে গেলেন কিংবা টেলিফোনের গোপন আলাপ, সেটা আপনি প্রকাশ করে দিলেন। এটা স্কুপ জার্নালিজম। এর সাথে অনুসন্ধানের যোগ নেই। অনুসন্ধান যোগ হবে তখনি, যখন সেই ফাঁস হওয়া কাগজ বা তথ্যের সূত্র ধরে মূল বিষয়টিকে প্রকাশ্যে আনা হবে। স্কুপ জার্নালিজম আর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের মধ্যে পার্থক্য হলো, স্কুপে শুধু ফাঁস হওযা তথ্যটাই প্রকাশিত হয়। আর ইনভেস্টিগেশনে ফাঁস হওয়ার কারণটাও উদঘাটিত হয়। অর্থাৎ যারা তথ্যটা লিক করলো তাদের চেহারাটাও উন্মোচিত হবে মানুষের সম্মুখে। ফলে বিষয়টি বুমেরাংও হয়ে উঠতে পারে। শুধু স্কুপ জার্নালিজম সে কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অসৎ হবার সম্ভাবনা থাকে।

মূল বিষয় প্রকাশ্যে আনার কথায় বলি। কেউ বলেন, অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ে সলিড প্রুভ থাকতে হবে। এটা স্রেফ বোকার মতন কথা। কেন বোকার কথা। খবর কোনো বিচার নয়। সাংবাদিক বিচারক নন যে তার অকাট্য প্রমাণ লাগবে। বরং সাংবাদিকের খবর হলো বিচারের সূত্র। জার্নালিজমের কাজ হলো কোনো বিষয়কে জাস্টিফায়েডে সহায়তা করা, জাস্টিফাই করা নয়। মুশকিলটা লাগে এই জায়গাতেই। আমাদের কিছু রামবুদ্ধিমান এমনটাই বলছেন ইদানিং। অনুসন্ধানে যদি অকাট্য প্রমাণই দিতে হয় তাহলে আর বিচারে যাবার দরকার কী, খবর দেখেই শাস্তি দিয়ে দেয়া যায়। রামবুদ্ধিমানদের আলাপে অন্তত তাই প্রতীয়মান হয়।

অনুসন্ধানী রিপোর্ট হয় টার্গেটভিত্তিক। এখানে টার্গেট অর্থাৎ লক্ষ্যে পৌঁছতে লাগে প্রথমে সোর্স বা উৎস। যেখান থেকে খবর পাওয়া যায়। তারপর লাগে উইটনেস মানে সাক্ষী। এই তিন উপকরণ মিলে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাঁড় করিয়ে ফেলা যায়। আর এর জন্যে প্রথম প্রয়োজন সোর্সের সাথে টার্গেটের যোগাযোগ। যা সত্যটাকে যাচাই করতে সহায়তা করে। এরচেয়ে বেশি প্রয়োজন উইটনেস বা সাক্ষীর সাথে টার্গেটের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের উপর নির্ভর করে সাক্ষীর কথার যৌক্তিকতা ও সত্যতা। এই ট্রায়াঙ্গলটা মিলে গেলেই খবরের নির্ভরযোগ্যতা মোটামুটি দাঁড়িয়ে যায়।

অনেকে বলেন, ‘নিখুঁত’ভাবে সত্যতা যাচাইয়ের কথা। এ কথাও বোকার মতন। কোনো বিচারেই সেটা আদালতে হলেও ‘নিখুঁত’ সত্য ওঠে আসে না। কারণ, ঘটনা কারো চোখের সামনে ঘটে না। সেটা মানুষের কথা শুনেই, পরিস্থিতি জেনে ও বুঝে ধারণা করে নিতে হয়। আর ধারণা সবসময় সত্যের কাছাকাছি হয়, পুরো সত্য হয় না। এ জন্যেই খবরের ক্ষেত্রে ‘নিখুঁত’ শব্দটা ব্যবহার একটা বড় বোকামি। 

অনেকে বলেন, অনুসন্ধানী খবরের জন্য নানা প্রযুক্তিগত সহায়তা লাগে। গবেষণার প্রয়োজন হয়। যানবাহন থেকে নানা সরঞ্জাম লাগে। এরজন্যে লাগে একটা বড়সড় ফান্ড। হ্যাঁ, স্বীকার করি, এসব লাগে। তারচেয়ে বেশি লাগে মগজ। মগজ না থাকলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অসম্ভব। একজন ধুরন্ধর স্পাইয়ের যতটা মগজ প্রয়োজন ঠিক ততটাই লাগে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের। মগজ থাকলে অনেক কম ফান্ডেও ভালো কাজ করা সম্ভব। আর না থাকলে কাড়ি-কাড়ি কড়িতেও কোনো কাজ হবে না।

আমার সিনিয়র কলিগ একটা খবরের লিঙ্ক ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই যে দেখেন আমাদের দেশেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হয়।’ দেখে বললাম, এখানে অনুসন্ধান দেখলেন কই। এখানে তো ফাঁস হওয়া একটা কাগজ, আর সরকারি কিছু লোকের কথা। স্কুপ জার্নালিজম। বুঝলাম, আমার কলিগের বয়স বাড়লেও মনে কিশোর রয়ে গেছেন। আর আমাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাল্যে।

পুনশ্চ : ‘স্টিং অপারেশন’ বিষয়ে এর আগে লিখেছিলাম। তাই আমার সিনিয়র কলিগের এ বিষয়ের আলাপ আর তুললাম না। ওই যে বললাম, বলতে গেলেই অনেকের ‘আপার চেম্বার’-এর সক্ষমতা ‘লিক’ হয়ে যাবে। শুধু স্টিং অপারেশন বিষয়ে বলি, এটা হলো বকপক্ষী দিয়ে আরেক বকপক্ষী শিকার করার মতন। এখানে অপরাধী ধরতে সূত্রও অপরাধী, সাক্ষীও অপরাধী। পুলিশ অনেক সময় যেমন করে।

২০১৭ এর ‘প্রথম আলো’র একটি শিরোনাম তুলে দিই উদাহরণে। ভারতীয় ক্রিকেটকে নাড়া দিল আরেক ‘স্টিং অপারেশন’-এমন শিরোনামে একটি খবর করেছিলো ‘ইন্ডিয়া টুডে’ অবলম্বনে ‘প্রথম আলো’।

মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের পিচ কিউরেটর পান্দুরাং সালগাওনকারকে বাজিকররা ইচ্ছামতো পিচ বানানোর কথা বলেছিলেন। সালগাওনকার তাতে রাজি হয়েছিলেন। আর তাতেই বাজিমাত করেছিলো সেই স্টিং অপারেশন। সেখানে স্টিং অপারেশন করতে নিজেকে বাজিকর সাজতে হয়েছিলো ‘ইন্ডিয়া টুডে’র প্রতিবেদককে। আর তা করতে হয়েছিলো বাজিকরদের সহায়তা নিয়েই। এখানেও অপরাধীকে ধরতে অপরাধীদের সহায়তা নেয়া হয়েছিলো। কিন্তু বিপরীতে কেউ প্রশ্ন তোলেনি, অপরাধীর কথা মানবো কেন? যারা তোলেন তাদের জন্য অবশ্য আলেকজান্ডার সেলুকাসকে ডেকে বলতে পারেন, কী বিচিত্র এই দেশ!

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0768 seconds.