• ০৮ মার্চ ২০২১ ০৯:৫৭:৫০
  • ০৮ মার্চ ২০২১ ০৯:৫৭:৫০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

নারী দিবস ও আমাদের নারীবাদ

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা :
তাসনুভা আনান ট্রান্সজেন্ডার মানুষ। একজন রূপান্তরিত নারী। যিনি খবর পাঠিকা হিসেবে কাজ পেয়েছেন। তাকে নিয়ে খবরের মাধ্যমগুলো খবর করছে। সেই খবর করতে গিয়ে তার সবচেয়ে খারাপ সময়গুলোকে বারবার মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে। তার বাল্যকাল যে কতটা ভয়াবহ ছিলো তা বারবার সামনে আনা হচ্ছে। তিনি যে সে সময় যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন সেটাই তার মুখ থেকে বলানো হচ্ছে। অথচ এটাকেই খবরে হাইড করা উচিত ছিলো। উচিত ছিলো তার বর্তমান অবস্থানটাকে মুখ্য করে দেখানো। অথচ তাকে বারবার তার বাল্যকাল এবং তার সেক্সুয়াল হ্যারেন্সমেন্টের কথা বলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তাকে তার খারাপ সময়ে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। যার ফলে কাঁদতে হয়েছে তাকে। 

এই কান্নাটা এবং যৌনতাটা হলো সোকল্ড সেসব নিউজের ক্যাশ। যেটা গণমাধ্যমের নৈতিকতার সাথে যায় না। যা খবটাকে মূলত পণ্যে পরিণত করেছে। অন্যান্য মুখরোচক খবরের মতই ছিলো এ খবরটার ট্রিটমেন্ট। যা সাধারণত দেখা যায় যৌন নিগ্রহের খবরগুলোতে কিংবা বিনোদনের গসিপে। সেখানে নিগ্রহজনিত যৌনতার বর্ণনাটা থাকে যাতে মানুষ তার আদিম প্রবৃত্তির কারণে খবরটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। এখানেও তাই করা হয়েছে। আর তাসনুভার প্রতি সমবেদনাটা ছিলো খবরের কভার। এই যে সুক্ষ্ণ ভাবে মানুষ সে নারী হোক বা পুরুষ হোক তার অমর্যাদা, তা রোখাই নারীবাদের মূল চিন্তার একটা অংশ।
 
মূলত নারীবাদ বিষয়টিকেই আমি অন্যভাবে দেখি। যেটা বলতে গেলে আগে পুরুষতান্ত্রিকতার বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে হবে।

ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থের কথা যদি বলি, তবে পুরুষ শব্দটির উৎপত্তি ‘পুর’ থেকে। ‘পুর’ এর একটা অর্থ ক্ষমতা বা শক্তি। অর্থাৎ যার ক্ষমতা বা শক্তি তথা ‘পুর’ রয়েছে সেই পুরুষ। এখানে লিঙ্গ বিবেচ্য বিষয় নয়। ক্রিয়া ভিত্তিক শব্দার্থ বিশ্লেষণ করতে গেলে লিঙ্গ বিষয়টি উহ্য হয়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। এই যে আমাদের দেশ, তার প্রায় সমস্ত কর্তৃত্বই প্রধানমন্ত্রীর হাতে এবং তিনি একজন নারী। অথচ ‘পুর’ তার হাতে। সুতরাং সে অর্থে তিনি ক্ষমতাবান। আর ক্রিয়া ভিত্তিক শব্দার্থ অনুযায়ী তিনিও পুরুষ। অর্থাৎ পুরুষতন্ত্র মানে ক্ষমতাতন্ত্র, শক্তিতন্ত্র। যারা কথায় কথায় পুরুষতন্ত্র উচ্চারণ করেন এবং সেই তন্ত্রের বিরুদ্ধে অর্থহীন শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেন, তাদের বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত। তাদের বোঝা উচিত তারা যা বলছেন তার মূলত কোনো মানেই নেই। অথবা তারা পুরুষতন্ত্র বিষয়টিই বোঝেন না। 

তাদের সুবিধার জন্য একটু মোটাদাগে উদাহরণ দিই। অনেক স্বামীকে তার স্ত্রীর হাতে মার খেতে হয়। কেনো খেতে হয়, কারণ সেই পুরুষ দৈহিক দিক থেকে স্ত্রীর চেয়ে দুর্বল। জানি, সামাজিক কারণে স্বামীরা বিষয়টি প্রকাশ করেন না, কারণ সমাজের কাছে তিনি হেয় হবেন। সমাজ যে ‘পুর’ এর কথা বলে, শক্তির কথা বলে, তাতে তিনি খাটো প্রমানিত হবেন। এটা তার জন্য লজ্জার। মূলত পুরুষদের এ লজ্জাই মোটা মাথার মানুষদের মগজে পুরুষতন্ত্র শব্দটি স্থায়ী করে দিয়েছে। পুরুষরা যদি লজ্জা ভেঙ্গে কথা বলতো, তাহলে হয়তো অনেক নারীই লজ্জা পেতেন। আর নারীরা পুরুষদের মতন পুরুষদের বিপরীতে লজ্জা পাওয়া শুরু করলে, পুরুষতন্ত্রের বিপরীতে নারীতন্ত্রের প্রকাশ্য উত্থান ঘটতো। যা আমাদের সমাজে বিদ্যমান থাকলেও পুরুষদের লজ্জার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে। বলা যেতে পারে নারীতন্ত্র ছাপা না হওয়া লেখার মতন অপ্রকাশ্য। 

বাংলাদেশসহ সারা দক্ষিণ এশিয়ায় মূলত আজব ধরণের এক নারীবাদের চর্চা হয়। নারী ও পুরুষ যারা একসঙ্গে বাস করেন। হতে পারেন স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্রেফ বন্ধু। তাদের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরলে, বনিবনা না হলে শুরু হয়ে যায় নারীবাদের ক্যাচাল। বিশেষ করে নারীরা দক্ষিণ এশিয়ার নারী প্রধান আইনের সুবিধা নেয়ার জন্য পুরুষদের উপর এক তরফা দোষ চাপানো শুরু করেন। সাথে উজবুকের পাল এর সাথে যোগ করেন নারীবাদের উদ্ভট ব্যাখ্যা। যেনো পারিবারিক ক্যাচালের মধ্যেই রয়েছে নারীবাদের প্রকৃত নির্যাস। যৌন নিগ্রহের অভিযোগে নারী প্রধান আইনের সহায়তায় পুরুষকে হেস্তনেস্ত করার মধ্যেই নারীবাদের সফলতা। চেয়ে দেখুন আশেপাশে এমন অনেক উদাহরণ পাবেন। এই যে, পুরুষকে হেস্তনেস্ত করার মাধ্যমে শক্তিমত্তার প্রকাশ এটাই হলো সেই ছুপা ‘নারীতন্ত্র’। যা পুরুষতন্ত্রের চেয়ে অন্যায্য ভাবে অনেক শক্তিশালী। 

অবশ্য আইনও এখন বিষয়গুলোকে বুঝতে শুরু করেছে। ভারতীয় আদালতের কয়েকটা রায়ই তার প্রমান। আশ্চর্য হতে হয়, লিভ টুগেদার যাকে বলে। যেখানে আইনের কোনো বাঁধন নেই, স্বেচ্ছায় ভালোলাগার মৌখিক বা মানসিক কমিটমেন্টে দুজনের একসাথে বসবাস। যে বসবাসের কমিটমেন্টটা হলো ভালোলাগার প্রশ্নে। অর্থাৎ যতদিন ভালো লাগবে ততদিন একসাথে থাকা। এখানে একজনের যদি খারাপলাগা শুরু হয়, তাহলে তো সেই কমিটমেন্ট থাকে না। সাথে এক ছাদের নিচে থাকার বিষয়টিও অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। সুতরাং আলাদা হও, আলাদা থাকো। এখানে অভিযোগের কোনো যৌক্তিকতা নেই। অভিযোগ তখনই আসে যেখানে আইনের বাধ্যতা থাকে। কমিটমেন্টের সাথে ডেডিকেশন যুক্ত হয়। মোটাদাগে বুঝিয়ে দিই। বিষয়টি হলো ফুটপাতে রাত কাটানোর মতন। আপনি ফুটপাতে ঘুমালেন, পুলিশ এসে উঠিয়ে দিলো। আপনার অভিযোগ করার কিছু নেই। এখানে ভালো না লাগাটা হলো সেই পুলিশ। সুতরাং দুজনার পথ দুদিকে। এখানে অভিযোগের কিছু নেই। 

একজন ট্রান্সজেন্ডার মানুষ খবর পড়বেন। এটা খুবই ভালো কথা। তার সাফল্যের কথা মানুষকে জানান। তার নিগ্রহের কথাগুলো নয়। এক তাসনুভা হয়তো চিন্তা করেছে পড়াশোনা ছাড়া যাবে না, তার পড়াশোনার জন্য সাপোর্টও ছিলো। কিন্তু অন্য তাসনুভারা যাদের সাপোর্ট নেই, তাদের কেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাসনুভার নিগ্রহের কথা। তারা তো আরো ভীত হয়ে উঠবে। ভাববে, তাসনুভাকেই এত কষ্ট সইতে হয়েছে আমরা তো কোন ছাড়। তার থেকে তাদের মনে এই ভাবনা গেঁথে দিন তাসনুভা কত ভালো ভাবে জীবনযাপন করছে, আপনারাও পারবেন। তাসনুভার এখনের শোবার ঘর দেখান। তার লাইফ স্ট্যান্ডার্ড দেখান। তিনি কতটা সম্মান পান সেটা দেখান। তবেই না মানুষ উৎসাহিত হবে। তা না করে খবরকে পণ্য বানাবার চেষ্টা করছেন। 

নারীবাদের আরেকটা কথা বলি, নারীবাদের উৎপত্তিটা হয়েছিলো কী কারণে, পারিবারিক ঝগড়া মেটানোর জন্য, কিংবা পুরুষকে কোনঠাসা করার জন্য। না, পেটের দায় মেটানোর জন্য। কাজের ন্যায্য মজুরি পাবার জন্য, খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য। বিষয়টা বোধে নিয়ে আমাদের দেশের নারীবাদকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখানে পোশাক শ্রমিকদের কথা বলি। নারীবাদ শুধু দেখা যায় দেশের অভিজাতদের পারিবারিক ক্যাওয়াজ বা যৌনতার বিষয়ে। কে কার বৌকে পেটালো। কার বউকে কে ভাগিয়ে নিয়ে গেলো। কে কাকে স্ত্রী হিসেব মেনে নিচ্ছে না, তালাক দিচ্ছে। এর বাইরে পোশাক শ্রমিক, সেই নারী মানুষদের যে পুরুষদের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে কম মজুরি দেয়া হচ্ছে। কম সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তা নিয়ে তো কোনো নারীবাদী আন্দোলনতো দেখলাম না। বামপন্থী সংগঠনগুলো শুধু শ্রমিকদের মজুরির বিষয়ে আন্দোলনে গিয়েছে। আলাদাভাবে নারীদের জন্য কোনো আন্দোলন হয়েছে কি? 

কিছু মাধ্যমে কথিত অভিজাত ও উচ্চবিত্তদের চিৎকারই মূলত নারীবাদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অবস্থাও অনেকটা সে রকমই। এমন নারীবাদীদের অনেকে প্রান্তিক নারীদের কথা বলেন। হাসি পায় শুনলে। নারীবাদের কোনো কিছু না বুঝেই আমাদের প্রান্তিক নারীরা তথাকথিত অভিজাত নারীবাদীদের চেয়ে অনেক বেশি প্রকৃত নারীবাদী। তারা পুরুষের সাথে তালমিলিয়ে খেতেখামারে কাজ করে। ইট ভাঙে। দিনমজুরি করে। পুরুষের সাথে মিলে যৌথভাবে সংসার চালায়। বিপরীতে কথিত অভিজাত নারীবাদীরা নিজের টাকার হিসেব লুকিয়ে স্বামীর উপার্জনের হিসেব নিতে ব্যস্ত থাকেন। না দিলেই শুরু হয় নিগ্রহের গীত। আর পালের অন্যরা এসে সাথে ধোয়া ধরে। আমাদের নারীবাদ হলো সেই ধোয়া ধরা নারীবাদ। যার সাথে প্রকৃত নারীবাদের কোনো মিল নেই। না চিন্তার, না পথের। 

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 1.2173 seconds.