• ১০ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৫১:৫৬
  • ১০ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৫১:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আমাদের সাংবাদিকতা

কাকন রেজা :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক কালের কণ্ঠে। বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর নির্মাণে অনিয়ম। অবশ্য এসব ঘর নির্মাণে নিয়ম মানা কয় জায়গায় হয়েছে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তবুও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের এ বিষয়টি একটু অন্যরকম। 

কী কারণে অন্যরকম? অন্যরকম এ কারণে যে, এই ঘর নির্মাণের দেখভালের দায়িত্ব প্রশাসনের থাকা সত্বেও তার দেখভাল করেছেন একজন সাংবাদিক। যিনি কিনা দৈনিক সমকালের উপজেলা প্রতিনিধি। এই সাংবাদিক আবার সাবেক যুবলীগ নেতা, নবীনগর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক। আর একই উপজেলার কালের কণ্ঠ প্রতিনিধি জানাচ্ছেন তার অনিয়মের কথা। বিষয়টি কৌতুহল উদ্দীপক না? 

খবরের ভেতরে আরো বিষয় আছে। ঘরগুলি হিন্দু পাড়ার। শাহবাজপুরের ওই হিন্দু পাড়ায় গিয়ে কালের কণ্ঠ প্রতিনিধি দেখতে পান হাত দিলেই ঘরগুলোর পলেস্তরা খসে পড়ছে। যারা নির্মাণ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেই রাজমিস্ত্রিরা বলেছেন, সমকালের ওই সাংবাদিক যা করতে বলেছেন, যেভাবে বালি-সিমেন্ট দিতে বলেছেন, সেভাবেই তারা দিয়েছেন। আর সে কারণেই কাজের মান খারাপ হয়েছে। কালের কণ্ঠের সেই খবরে আরো বলা হয়েছে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় সমকালের ওই সাংবাদিকের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ইন্টারেস্টিং না? 
পাঠক কী বুঝলেন? এই হলো হালচাল। সাংবাদিকদের রাজনৈতিক যোগাযোগ, ঠিকাদারী, বিভিন্ন পদ-পদবীতে থাকা সব মিলিয়ে একটা চিত্রতো পরিষ্কার, সাংবাদিকতা এখন বেশ লাভজনক।

সুতরাং প্রতিষ্ঠানের দেয়া বেতনের ধার কে ধারে। এই যে মফস্বল সাংবাদিকতায় বেতন ছাড়া কিংবা নামমাত্র বেতনে যারা কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগেরই আয়ের অন্য উৎস আছে। এরমধ্যে অনেকের আয়ের উৎস সমকালের সেই সাংবাদিকের মতন সম্ভাব্য অনৈতিক। তাই তারা বেতনের জন্য উচ্চকণ্ঠ হন না। হলে হয়তো বেতন বাড়বে কিছুটা, বিপরীতে বুমেরাং হয়ে যদি চাকরি চলে যায়, তবে উপরি হারাতে হবে। যে দেশে বেতনের চেয়ে উপরি বেশি, সে দেশে কে আর বেতন বাড়ানোর দাবি করতে চায়। 

এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথায় আসি। কাকে নাকি কাকের গোশত খায় না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দেখা গেলো উল্টোচিত্র। সমকালের প্রতিনিধির বিরুদ্ধে খবর করলেন কালের কণ্ঠের প্রতিনিধি। আমার ভেবে নিলাম সমকালের প্রতিনিধি অনৈতিক কাজ করেছেন। কিন্তু কালের কণ্ঠের প্রতিনিধির ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট কে দেবেন? উনিও হয়তো কিছু ঘর দেখভালের সুযোগ পেলে, বঞ্চিত আরেকজন সেই সার্টিফিকেট দেবেন। ঘরের কথা পরে জানলো স্টাইলে চলতে থাকবে এই পরম্পরা। চলাটা উচিত। আমাদের জানা উচিত আমাদের সাংবাদিকতা কারা করছেন, সাংবাদিকতা কোন পর্যায়ে গেছে। 

আচ্ছা সমকালের যে প্রতিনিধির কথা খবরে বলা হলো, সেকি নিজ দলের বিরুদ্ধে কোনো খবর করার নৈতিক জোর রাখেন? অবশ্য দলের মধ্যে গ্রুপিং থাকলে অন্যপক্ষের বিরুদ্ধে লেখা অসম্ভব কিছু না। যেমনটা হয়তো কালের কণ্ঠ এবং সমকালের প্রতিনিধির মধ্যে হয়েছে। না, হয়তো শব্দটা ব্যবহার করেছি, সম্ভাবনার কথা বলেছি। এমনটা হয়েছে তা বলিনি, মনখারাপ করার কিছু নেই। নোয়াখালিতে তো দেখলেন। মির্জা কাদেরের ওখানে। সাংবাদিক মারা গেলেন, দুই পক্ষই বলছেন, সে তার লোক। সাংবাদিকরা যখন কারো লোক হয়ে যায়, তখন আর সাংবাদিক থাকেন না, গৃহপালিত ‘ইয়ে’ হয়ে যান। খুঁদ-কুড়ো খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়। নৈতিক জোর কিংবা আত্মসমান সবই ভক্তির পায়ে লুটিয়ে দিতে হয়। 
আমাদের সাংবাদিকতা এখন প্রায় বিগত। যায় যায় অবস্থা। সাংবাদিকদের সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক কথা শুনতে শুনতে এমনটাই মনে হয়। অনেকেই সাংবাদিক বলা ছেড়ে দিয়েছেন। বলছেন, সাংঘাতিক। না, সাংবাদিকদের সবাই খারাপ নন, বেশির ভাগই এসেছেন একটা প্রত্যয়ে, সমাজকে কিছু একটা দিতে। কিন্তু এসে তারা পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। কেউ চাপে মিইয়ে যাচ্ছেন, চুপচাপ হয়ে যাচ্ছেন। কেউ আপোস করছেন। খুব অল্প কিছু মানুষ আছেন, যারা সাহস করে এখনো সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করছেন। সেজন্যে তাদের অনেকেরই চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।

অবশ্য সত্য কথা বলতে গেলে, সত্যের প্রকাশ করলে রক্তচক্ষুর ভয় নতুন কিছু নয়। বিশ্বের সবদেশেই কমবেশি গণমাধ্যমে কাজ করা মানুষের উপর চাপ থাকে। তবে উন্নত দেশগুলিতে সে চাপ অগ্রাহ্য করা যায়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যা অনেকটাই অসম্ভব। পার্শ্বের দেশ মিয়ানমারের চিত্রটাই দেখেন। ভারতেও চাপ আছে, সে চাপ হয়তো চাকরি হারানো পর্যন্ত। খুব বেশি হলে কয়েকদিনের কারাবাস। যে চাপ অগ্রাহ্য করে সত্য প্রকাশ করা যায়, লেখা যায়। এর বেশি হলে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। জান বাঁচানোটা ফরজ হয়ে যায়। সেই যে বললাম, কেউ চুপ হয়ে যান, কেউ আপোস করেন। যারা করেন না, তারা দুর্গতি পোহান। 

পুনশ্চ : সাংবাদিক শব্দটির অর্থ ও প্রয়োগ নিয়ে কিছু কথা আছে। সাংবাদিক বলা যায় কাকে, তারও ব্যাখ্যা আছে। আমাদের দেশে এর সহজ সমাধান বের করা হয়েছে ‘প্রতিনিধি’ শব্দে। যা হোক, কলেজে পড়ালেই যেমন ডাকা হয় ‘প্রফেসর সাহেব’ বলে, তেমনি গণমাধ্যমে যুক্ত থাকলে প্রচলিত কথা হয়ে যায় ‘সাংবাদিক সাহেব’। তাই এই লেখা প্রচলিত প্রচলনেই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা সাংবাদিকতা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0799 seconds.