• ১৪ এপ্রিল ২০২১ ২১:৫৫:৩৫
  • ১৪ এপ্রিল ২০২১ ২১:৫৫:৩৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বৈশাখ-চৈত্র সংক্রান্তি-করোনাকাল ও অন্ধ অনুগামী

কাকন রেজা :

করোনার নিদানকালে কে যে কখন অনন্তযাত্রার যাত্রী হবেন বলা মুশকিল। এখন সময় হলো জীবন রক্ষার। এখন উৎসবের সময় নয়। তারপরেও অনেকের আহাজারি শুনি বৈশাখ পালন করা নিয়ে। পয়লা বৈশাখ পালন করা হলো না, চৈত্র সংক্রান্তির খাওয়া-দাওয়া হলো না, এ নিয়ে আফসোসের শেষ নেই। কেউ আবার বাঙালিয়ানা গেলো গেলো বলে মাতম করছেন।

একজনের তো আফসোস বাঙালি সংস্কৃতি ক্রমেই আরব সংস্কৃতির দখলে চলে যাচ্ছে বলে। চৈত্র সংক্রান্তি ক্রমেই তার উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ঢংয়ে আফসোসে ভরা তার বিলাপ। এখানেই শেষ নয়, তার দুঃখ বাংলা ভাষায় ক্রমেই আরব-পারস্যের ‘দুবৃত্ত’ শব্দ প্রতিস্থাপিত হচ্ছে তা নিয়েও। বিশেষ করে বাংলাদেশ নিয়ে তার আশংকার শেষ নেই।

রবিঠাকুরকে উদ্ধৃত করে তিনি সেই শোকের ভাব প্রকাশ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, উনি সম্ভবত ভুলতে বসেছেন কিংবা তার জানা ও বোধের বাইরে যে, ‘ঠাকুর’ শব্দটিও বাংলা নয়, এমনকি সংস্কৃতও। রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরও ধার করা। সেটাও সেই ‘দুর্বৃত্ত’ আরব-পারস্য শব্দ। তাও আবার যে সে দুর্বৃত্ত না এরদোয়ানের দেশ ‘জঙ্গি’ তুরস্কের তুর্কি শব্দ। বিশ্বাস হচ্ছে না, তাহলে ঘেটে-টেটে দেখুন। যারা কথায় কথায় বাংলা বইয়ে ওড়নার মতন শব্দ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় থাকেন তারাও ঘেটে দেখতে পারেন।

খোদ ‘হিন্দু’ শব্দটিই বাংলা কিংবা সংস্কৃত নয়, ফার্সি শব্দ। সেই ‘দুর্বৃত্ত’ আরব-পারস্য থেকে আসা। বিষয়টি হজম করা অবশ্য হিন্দুত্ববাদী ভারতের জন্য মুশকিল হয়ে যায়, বিশেষ করে বিজেপির জন্য। এই যে ‘হজম’ লিখলালম এটাও কি বাংলা শব্দ? প্রশ্ন রয়ে গেলো।

এখন শব্দের উৎপত্তির প্রশ্নে হিন্দুত্ববাদী’র হিন্দুই যদি বাদ দিতে হয় তাহলে তো মুশকিল। কী করে খাবেন তারা। তাদের তো আর কিছু নেই। যারা করোনাকালে বৈশাখ আর চৈত্র সংক্রান্তি নিয়ে আফসোস করেন তাদেরও হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মতনই মুশকিলে পড়তে হবে যদি ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলা শুরু করতে হয়। তাদেরও তো আর কিছু নেই, সংস্কৃতির গাজন ছাড়া।

বৈশাখের প্রচলন নিয়ে কথা বলতে গেলে সে মুশকিল বাড়বে বই কমবে না। সাথে চৈত্র সংক্রান্তিকে যারা উৎসব হিসেবে বলতে চান, তাদের হিসেবেও একটু ভুল আছে। এটা মূলত উৎসব তবে তা ধর্মীয়। এর সাথে সার্বজনিনতার কোনো সম্পর্ক নেই। ভারতের একটি গণমাধ্যমে সৌমিতা চৌধুরী নামে একজন লিখলেন চৈত্র সংক্রান্তি সম্পর্কে। তার ভাষায়, ‘চৈত্র সংক্রান্তি যেসব অঞ্চলে পালিত হয়, গ্রাম বাংলায় আদিদেবতা শিবের মন্দিরকে ঘিরে চলে উৎসব। শিবকে সেখানে বুড়ো ঠাকুরও বলা হয়।’ সুতরাং এই উৎসব মূলত একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উৎসব। সার্বজনিন নয়।

তবে প্রশ্ন ওঠে মৌমিতার লেখার শুরুটা ধরলে। তিনি শুরুতে বললেন, ‘চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব আসলে বাঙালিদের ঐতিহ্যের বড় উদাহরণ।’ এখানে প্রশ্নটা ওঠে বাঙালি পরিচয় নিয়ে। যারা চৈত্র সংক্রান্তি পালন করেন তারাই যদি বাঙালি হন, তাহলে বাংলাভাষি মুসলমানদের আইডেন্টি কী? অনেক বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে, পড়াশোনা শুধু নয়, নিজের চিন্তার জায়গাটাও পুষ্ট হতে হবে। এ বিশদ আলোচনার ব্যাপার। করোনাকালে যারা এসব নিয়ে আহাজারি করেন তাদের জন্য শুধু প্রশ্নটা রেখে যাওয়া। পারলে লকডাউনের অবসরে নিজেরা যাতে উত্তরটা খুঁজে নিতে পারেন।

পুনশ্চ: যারা সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলেন তাদের মধ্যে ভারতীয়রা উৎপত্তির বিষয়টা সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে চান। না পারলে না ভুজং-ভাজং তথা মিথ নির্ভর, কল্পনা দিয়ে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন। আর বাংলাদেশে তাদের অনুগামীরা জানার চেষ্টা না করেই তার অন্ধ অনুগমন করেন। মিথ আর ইতিহাসের পার্থক্যটাও সাথে তারা বিস্মৃত হন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0900 seconds.