• ১৯ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৩৭:৫৪
  • ১৯ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৩৭:৫৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভয় দেখিয়ে জয়ের চেষ্টা এবং শক্তির চর্চা

সাংবাদিক ও কলাম লেখক কাকন রেজা।

কাকন রেজা:

শ্রদ্ধা, সম্মান, শক্তি। এই তিনটি বিষয়ের গুন তিন রকম। শ্রদ্ধার সাথে যুক্ত হয় ভলোবাসা। সম্মানের সাথে সমীহ। আর শক্তির সাথে ভয়। আপাত দৃষ্টিতে এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরী হচ্ছে ভয়। শক্তির সাথে যুক্ত ভয়ের চর্চাই চলছে এখন আমাদের দেশে। সবাই তাদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছেন। আর সেই প্রদর্শণের উদ্দেশ্য হলো অন্যকে ভয় দেখানো। ভয় দেখিয়ে জয় করার চেষ্টা।

নারী ডাক্তার, প্রশাসন ও পুলিশ এই তিন চরিত্রের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে সবাই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন কে কত শক্তিধর। জানি, কেউ কেউ বলবেন ডাক্তার মহিলাতো যাতা বললেন। হ্যাঁ, বলেছেন। শক্তিকে শক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। দেখাতে চেয়েছেন তার শক্তির জোর। এই যে জোর তা কিন্তু নিজের নয়, ধার করা। যে জোর নিজের বাবার কাছ থেকে ধার করতে হয়। করতে হয় মন্ত্রীর কাছ থেকে।

ঘটনার প্রথম থেকে আসি। সরকার বলেই দিয়েছে কার কার মুভমেন্ট পাস লাগবে, কার লাগবে না। যাদের লাগবে না, তাদের কেউই দায়িত্বজ্ঞানহীন নন। তাদের মুভমেন্ট পাসের বাইরে রাখা হয়েছে সেজন্যই। নেহাতই তাদের যদি বাজার বা মার্কেটে কেনাকাটার জন্য কেউ পান তাহলে হয়তো তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

এখানেও কথা রয়েছে, একজন ডাক্তার কিংবা একজন পুলিশ ডিউটি শেষ করে বাড়ির জন্য দশ কেজি চাল কিনতে বাজারে যেতেই পারেন। তার হয়তো বাজার করার মানুষটাও নেই। ডিউটি শেষে নিজেরই নিয়ে যেতে হয়। কিংবা কারো ওষুধ প্রয়োজন। ডিউটি শেষে কিনে বাড়ি ফিরতে হবে। অথবা বাড়িতে গিয়ে দেখলেন বাড়ির কারো জরুরি কোনো কিছু লাগবে। তখন হয়তো একজন পুলিশ সাধারণ পোশাকে, একজন ডাক্তার অ্যাপ্রোন ছাড়াই বের হলেন। তাদের মুভমেন্ট পাস বিষয়ে এখানে প্রশ্নের জায়গাটা কোথায়। সুতরাং এসব ব্যাপারও মাথায় রাখতে হবে।

ডাক্তার মহিলার গাড়ির কাচেই যেহেতু তার প্রতিষ্ঠানের পাস বা পরিচয়ের বিষয়টি চিহ্নিত করে দেয়া আছে। তখন সে গাড়িটি না থামালে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না। আর থামালেও যখন দেখা গেলো ভেতরে একজন অ্যাপ্রোন পরা মহিলা নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিচ্ছেন, তখন তাকে তার পরিচয়পত্র দেখানোর জন্য উঠেপড়ে লাগাটাও সমীচীন নয়। বলতে পারেন, আইন তার নিজ গতিতে চলবে না? এমন বললে, আপনাকে এত বেশি আইনের গতি বদলানোর উদাহরণ দেয়া যাবে যে আপনি ক্যালকুলেটরে গুনেও শেষ করতে পারবেন না। আপনি তখনই জোর দিয়ে আইনের নিজস্ব গতির কথা বলবেন, যখন এক্ষেত্রে আপনার টলারেন্স থাকবে জিরো।

প্রশ্ন করি, একজন পুলিশ বা একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মা বেসরকারি একটি হাসপাতালে আইসিইউ-এ রয়েছেন। অবস্থা এমন দাঁড়ালো, জরুরি ভাবে বিশেষ একজন ডাক্তারকে কল করতে হলো। সেই ডাক্তার হয়তো ঘরের স্যান্ডেলটিও বদলানোর সুযোগ পেলেন না। বাড়িতে যা পরা ছিলো সে পোশাকেই তড়িঘড়ি করে চলে এলেন। তার মাথায় রোগী বাঁচানোর চিন্তা। পাস-পরিচয়পত্র তার মাথায় নেই। আপনি কি সেই ডাক্তারকে আটকে তাকে জেরবার করবেন, না তাকে ছেড়ে দেবেন? প্রশ্নটা আপনাদের কাছেই।

এখন সেই ডাক্তারের কাছে আসি। তার জোর তার পেশা। তিনি যুক্তি দিন। না, তিনি যুক্তি দিলেন না। নিজের পেশার মহৎ জোরটা খাটালেন না। খাটালেন কী, বাবার পরিচয়। মন্ত্রীর কাছে ফোন করার শক্তি। তিনি যদি সেই পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটকে বলতেন, ভাই এই অবস্থায় অনেক সময় পরিচয়পত্র আনতে মনে থাকে না। রোগীদের অবস্থা দেখে পাস-ফাসের কথা মাথায় থাকে না। তখন কি সেই পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট এমনটা করতে পারতেন? পারতেন, যদি তারা খুব বেশি অমানুষ হতেন। সে প্রশ্নটা এখন হাইপোথিটিক্যাল।

এমন মুহূর্তে ডাক্তারের জায়গাটা হলো শ্রদ্ধার। প্রশাসনের লোকজনের সমীহের। পুলিশেরটা শক্তির। অথচ এখানে প্রতিটি ক্যারেক্টারই ভয় দেখানোর চর্চা করেছেন। কার কত শক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মুশকিলটা এইখানেই, আমাদের দেশে হালের ট্রেন্ড হলো শক্তি প্রদর্শন। অপরকে ভয় দেখানোর চর্চা।

এমন চর্চায় শ্রদ্ধা আর সমীহের জায়গাটা পরিণত হচ্ছে অশ্রদ্ধায়। শক্তির অপ্রয়োগে যা দাঁড়াচ্ছে ঘৃণায়। সাথে শক্তির পূজারীরা ক্রমেই মনস্টার হয়ে উঠছেন। তারা শক্তির সাফল্যে একধরণের ঘোরের মধ্যে আছেন। বুঝতে পারছেন না। শক্তি হলো সেই জাদুদণ্ডের মতন, যা প্রতিবার ব্যবহারের সাথে কমতে থাকে। এক সময় শেষ হয়ে যায়। বেশিরভাগ মানুষই শক্তির এই জাদুদণ্ড হাতে পেলে হুশ হারিয়ে ফেলেন। যখন হুশ ফেরে তখন তারা আরেক শক্তিমানের খপ্পরে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

পড়ুন 'ডাক্তার বড় না পুলিশ বড়, আমি দেখব'

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা ডাক্তার-পুলিশ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0951 seconds.