• ০১ মে ২০২১ ১৫:০৪:০২
  • ০১ মে ২০২১ ১৫:০৪:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

লজ্জা থাকলে মধ্যবিত্ত, লজ্জা হারালেই...

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

যখন লিখছি, তখন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সাহায্যের জন্য ৩৩৩ এ কল করেছেন দু’লক্ষের মত মানুষ। সরকারের সাহায্য পৌঁছেছে আড়াই হাজারের উপর মানুষের কাছে। অনুপাতটা করুন তো। বলবেন না আবার, গণিতে কাঁচা। স্কুলে পাটিগণিত তুলে দেয়া হয়েছে। 

এসব সাহায্য পাওয়ার কারা যোগ্য তা বাছাই করার কমিটি ১৬ হাজার আবেদনকারীকে যোগ্য বলে ঘোষণা করেছে। এই গণিতেও ঝামেলা রয়েছে। কীভাবে বলবেন তো, শুনুন তবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, কোনো মধ্যবিত্ত পরিবার যদি খাদ্য সংকটে থাকেন তবে ৩৩৩ এ কল দিলে তার বাসায় খাদ্য পৌঁছে যাবে। দু’লাখের মধ্যে ১৬ হাজার বাছাই করা হলো বাকিগুলো কারা। তারা কি ‘একটি প্রতিষ্ঠিত শিল্প গোষ্ঠী’র মতন ধনী, সাহায্য পাবার অযোগ্য! একজন মধ্যবিত্ত একান্ত নিরুপায় না হলে সাহায্য প্রার্থী হন না। মধ্যবিত্তদের আর যাই হোক লজ্জাটা আছে বলেই তারা মধ্যবিত্ত। লজ্জাটা না থাকলে তারা ‘একটা প্রতিষ্ঠিত শিল্প গোষ্ঠী’ হয়ে যেতেন। সামাজিক এই লজ্জাবোধটার জন্যই মধ্যবিত্ত চুরি করতে পারে না, ঘুষ খাওয়ার সময় ইহকাল-পরকালের অঙ্ক কষে। কারোটা আত্মসাত করার আগে চোখের সামনে কবরের আজাব দেখতে পায়। তাই তাদের আর সেসবে সাহস করা হয়ে ওঠে না। 

এই মধ্যবিত্ত নিচে ছেড়া গেঞ্জি থাকলেও উপরে ইস্ত্রি করা শার্ট পরে। সেই ছেড়া গেঞ্জির লজ্জা ঢাকতে তাকে সকালের নাস্তার টাকা লন্ড্রিওয়ালাকে দিতে হয়। এমন লজ্জা যদি ধনীদের থাকতো তাহলে মুনিয়াদের মরতে হতো না। এমন মানুষেরা যখন সাহায্যের জন্য ফোন করে তখন তাদের সেই অসহায়ত্ব পরিমাপের যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয়নি। সাহায্য চাওয়া দুই লক্ষ মানুষই তেমন অসহায়, না হলে তারা ফোন করতো না। যারা দুপুরে শুকনো মরিচ ডলে ভাত খেয়ে প্রতিবেশীর কাছে মোরগ পোলাওয়ের গল্প করে, তারা নিতান্ত অপারগ হয়েই সাহায্যের হাত বাড়ায়। এই অপারগতাও যখন বাছাইয়ের চালুনিতে ছাকা হয়, তখন চালুনির ব্যর্থতাটাই প্রকট হয়ে ওঠে। 

লকডাউন উঠে যাচ্ছে। যদিও লকডাউনের ফলাফল ভালো। কমেছে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার। আমি যখন লিখছি সেদিন করোনা আক্রান্তের মধ্যে ৫৭ জন মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন ২১৭৭ জন। একশ’র ঘর পার করেছিলো করোনায় মৃত্যু। লকডাউন না দিলে হয়তো আরো উর্ধ্বমুখি হতো সে সংখ্যা। এটা না বোঝার কিছু নেই। কিন্তু আমাদের মধ্যম আয়ের দেশের মধ্যম সাইজের ধনী লোকেদের ক্ষমতা নেই টানা এক মাসের লকডাউনের বোঝা বওয়ার। আমাদের ফুটানি সাত দিনেই শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই দোকানপাট খুলে দিতে হয়, কলকারখানা চালু রাখতে হয়, গণপরিবহন না চলতে দিয়েও উপায় থাকে না। বাগাড়ম্বরের উঁচু গলা মিনমিনে কণ্ঠে স্বীকার করে নেয়, ‘এ ছাড়া উপায় নেই’। 

আমাদের সত্যিই উপায় নেই। হাতেগোনা কিছু পথভ্রষ্ট ছাড়া বেশির ভাগ মানুষ উপায়হীন। আমাদের বেকার, দরিদ্র মানুষের পরিসংখ্যান অনেকে দিয়েছেন, সেটা আর উল্লেখ করতে চাই না। না চাওয়ার কারণও আমাদের মধ্যবিত্ত মানসিকতা। আমরা আমাদের দুর্বলতা মানুষকে জানাতে চাই না। বলবেন, তারপরেও জানাই কেন, ওই যে উপায় না থাকায় মিনমিনে দুর্বল কণ্ঠে বলতে হয়, মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে...।

দুর্বল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হচ্ছে, সব কিছু বাহিনি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সামান্য একটা মাস্ক পরাতে পেটানোর ক্ষমতা দেয়ার আইনের চিন্তা করতে হয়! তরমুজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে বিশাল লাট-বহর লাগে! আরো কত কি যে লাগে। তারমধ্যে বিশেষ করে লাগে অনুগত প্রচার মাধ্যম। নতজানু প্রচারক। এমন ব্যবস্থায় গণমাধ্যম গণের বিপক্ষে চলে যায়। সমুখে যুক্ত হয় ‘অ’ বিশেষণ। এমন বিশেষণযুক্ত মাধ্যমগুলোকে ইতোমধ্যেই মানুষ চিহ্নিত করেছে। গণমাধ্যমকে মাড়িয়ে এগিয়ে যাওযা সামাজিকমাধ্যম অন্তত তাই জানান দেয়। লজ্জা থাকলে প্রশ্ন তোলা উচিত হবে না, কীভাবে সামাজিকমাধ্যম গণমাধ্যমকে মাড়িয়ে গেলো। সদ্য প্রমান দিয়ে দিই, এই মুনিয়ার মৃত্যুর বিপরীতে যতটুকু আইনি কাজ হয়েছে, তা শুধু সামাজিকমাধ্যম সোচ্চার ছিলো বলেই।  

যাকগে, সময় গেলে বুদ্ধি বাড়ে। আমাদের দেশে চীনা টিকার ট্রায়াল যখন চলার কথা ছিলো, তখন চলেনি। সে সময় চললে আমরা এতদিন টিকা উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতাম। ভারতের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে পারতাম নেয়ার জন্য নয়, দেয়ার জন্য। তাদের এই দুঃসময়ে আমরা টিকা দিয়ে সাহায্য করতে পারতাম। এখন যেমন দিচ্ছি রেমডেসিভির ইনজেকশন। তবে মুশকিলটা দাঁড়ায় সময়ের বুদ্ধি সময়ে না বাড়লে। লালন বলেন, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। আসলেই হয় না। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মধ্যবিত্ত

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0761 seconds.