• ০২ মে ২০২১ ১৮:১৫:৫০
  • ০২ মে ২০২১ ১৮:১৫:৫০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও রাজনীতি পাঠে নয় মাঠে, তত্ত্বে নয় সত্যে থাকে

ছবি : কাকন রেজা

কাকন রেজা:

একটি সাক্ষাতকারে, যেখানে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের এক বিশেষজন। লাইভ প্রোগ্রাম। নানা কথা হলো। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়েও কথা হলো। হোস্ট হিসেবে এমন প্রোগ্রামে সাধারণত নিজের মতামত দেয়া যায় না। তবে সাক্ষাতকার শেষে বলেছিলাম তৃণমূলের পুনরায় ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনার কথা। শুনে বাম সমর্থক সেই বিশেষজন আপত্তি তুলেছিলেন। মুখের আপত্তি মৃদু হলেও, তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে সেই আপত্তি ছিলো প্রবল। আমার পরিচিত দু’একজন বাংলাদেশি প্রায় হিসেব কষে দেখিয়ে দিয়েছিলেন বিজেপি এবার ক্ষমতায় আসছে।

সে সময় তাদের শারীরিক ভাষায় মনে হচ্ছিলো তারাই হয়তো ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছেন। অবশ্য দু’একজন বাম বন্ধু বামেদের সভা-সমাবেশে লোকের বহর দেখিয়ে বামদের উত্থানের অলীক কল্পনাতেও বিভোর ছিলেন। আমি সবাইকে তৃণমূলের কথা বলেছিলাম। সাথে যোগ করেছিলাম দু’শো আসনের কাছাকাছি পাবে তৃণমূল। সঙ্গতই তাদের বিরাগভাজন হয়েছিলাম। 

ভারতের একটি রাজ্যের নির্বাচন অবশ্য তেমন কিছু মাটির ঘটি উল্টে যাওয়ার মতন ব্যাপার নয় অন্তত আমাদের জন্যে। কেন্দ্রে যারা আছেন তারাই রাষ্ট্রীয় পলিসি নির্ধারণ করেন। তারপরেও পশ্চিমবঙ্গ পাশাপাশি এবং ভাষাগত ব্যাপারে সাদৃশ্যতার কারণেই আমাদের একটা বিশেষ টান থেকে যায়। সে টান থেকেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আমরা ফলো করি। এবারও করেছি। এছাড়া পাশাপাশি হওয়ায় রাষ্ট্রীয় কিছু ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়োজন দাঁড়ায়। তিস্তা চুক্তি যার বড় উদাহরণ। 

সাক্ষাতকারের সেই ভারতীয় বিশেষজনের ধারণা ছিলো, আমার রাজনীতির জ্ঞানগম্যি তেমন একটা নেই। বলেছিলেন, বাংলাদেশে থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিষয়টি আমি ঠিক অনুধাবন করতে পারছি না। তার ধারণা ছিলো সম্ভবত গেরুয়ারা এবার দখল করবে বাংলার মসনদ এবং বলেছিলেনও। তার উচ্চারিত বাংলার মসনদ শব্দটা আমার কানে লেগেছিলো। পলাশীর পরাজয়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো। বেনিয়াদের হাতে আমাদের পরাজয়। তখন বিদেশী বেনিয়াদের হাতে এখন সরাসরি দেশী বেনিয়াদের হাতে। ‘প্রতিষ্ঠিত শিল্পগোষ্ঠী’দের কাজ তো আমরা দেখতে পাচ্ছি, টিকার ডোজ থেকে মুনিয়ার মৃত্যু পর্যন্ত। ভয়ও হচ্ছিলো কারণ গেরুয়াদেরও কাজ-কারবার আমরা দেখেছি এবং দেখছি। আমাদের দেশেও গেরুয়া প্রধানমন্ত্রী আসার কারণে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গিয়েছিলো। গেরুয়াদের জন্যই এই মৃত্যুকালে আমাদের ভ্যাকসিনেশন থমকে গিয়েছে। ফলে ভয় না হওয়ার, না পাওয়ার কোনো কারণ নেই।  

গেলো ভারতীয়জনের কথা। এখন বাংলাদেশের দু’একজনের কথা বলি। তারাও এদেশের বিশেষজন। তাদেরও ধারণা ছিলো বিজেপিই ক্ষমতায় আসছে। মুশকিল হলো, এমন ধারণা বয়ান করার সময় তাদের আনন্দিত মনে হচ্ছিলো। কেন হচ্ছিলো তা আন্দাজ করা খুব কঠিন না। মমতার মতন একজন কমিটেড ও ডেডিকেটেড মানুষের সামনে অনেকেই বড় তুচ্ছ হয়ে যান। তুচ্ছতা মানুষকে প্রতিহিংসা পরায়ন করে তোলে। না, মমতার এসব গুন বর্ণনা করতে বসবো না, প্রয়োজনও নেই। তবে যারা সত্যিকার অর্থেই রাজনীতি ও মানুষ বোঝেন, তারা জানেন মমতা সম্পর্কে। 

পশ্চিমবঙ্গে এবার একটা নিরব স্লোগান ছিলো, ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’। বামেরা বলেন, এটা বিজেপি ছড়িয়েছে, এটা বিজেপির চাল। ভারতের অনেক বামই বাংলাদেশ থেকে সম্ভবত শিক্ষা নিয়েছেন এবং সেটা ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার। তাই তারা এই স্লোগানের প্রবল বিরোধীতা করেননি। একটা জোক রয়েছে এমন, 
‘আপনি কি বিজেপির সমর্থক? 
না, আমি ধর্মনিরপেক্ষ আমি তৃণমূল বিরোধী। আমি চাই বামেরা ক্ষমতায় আসুক। 
কট্টর হিন্দুরা কি বামেদের ভোট দেবে? 
না, দেবে না। ওরা গেরুয়াদের দেবে। 
তাহলে তৃণমূলের ভোট কমলে ক্ষমতায় আসবে কে? 
কে আবার বিজেপি।’ 

কথায় আছে ফ্যাসিজম টিকে থাকতে কিছু নষ্ট বাম ও উগ্র ডানদের প্রয়োজন হয়। মিলিয়ে দেখুন তো, আমাদের দেশের অনেকের ধরণ-ধারণের সাথেও উল্লেখিত ‘জোক’ এর অন্তর্নিহিত কথাটি মিলে যায় কিনা। 

আমাদের দেশের কথায় আসি। যারা বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসছে ভেবেছিলেন কিংবা ভেবেছিলেন বামেদের কথা। এসব মানুষের আসলে রাজনীতি ছেড়ে দিয়ে অন্য কিছু করা উচিত। এরা মূলত তত্ত্ব বোঝেন মানুষ বোঝেন না। মে দিবসে’র একটি লেখায় বলেছিলাম, শ্রমিকদের সামনে মার্ক্স-লেনিন, ভস্কি-মস্কি এসব বলে লাভ নেই, তারা এসব বোঝে না। তারা বোঝে তাদের দিনমজুরি করতে  হবে, তাদের বাঁচতে হবে। সুতরাং তত্ত্বকথা না বলে তাদের ভাষাতেই তাদের বোঝাতে হবে, তাদের পথ ধরেই তাদের দুয়ারে পৌঁছতে হবে। যদি তাদের পরিবর্তন চান। আর যদি তত্ত্ব কথা বলে নিজেকে তাত্ত্বিক রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত করতে চান, তবে তা আলাদা কথা। তার রাস্তা আলাদা। 

আমাদের দেশে কেন আন্দোলন গড়ে উঠছে না, মানুষ কেন পথে নামছে না, এ নিয়ে অনেকেরই আফসোস রয়েছে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলছেন, মানুষকে পথে নামতে। উনার মতন ভালো মানুষের ডাকেও মানুষ পথে নামছে না। কেন নামছে না, এ কথাটাও পথে নামার ডাক দেনেওয়ালা সুশীলরা বুঝতে পারেননি এখনো। এটা হলো দেশের মানুষের পালস তথা মন না বোঝার ফল। দেশের মানুষ যাদের বিশ্বাস করে, যাদের কথা শোনে তাদের ফেলে রেখে আপনারা মানুষকে কথা শোনাতে চাইছেন! আপনাদের ভাষা তো সাধারণ মানুষ বোঝেই না। 

আপনাদের ভাষা বইয়ের ভাষা, প্রমিত ভাষা। মানুষ বই নয়, মাটির ভাষা শুনতে চায়। শুনতে চায় তাদের কথ্য বয়ান। আপনারা সেখানেই ব্যর্থ। নিজের দেশের মানুষের মনের ভাষাই আপনারা বোঝেন না, আর পশ্চিমবঙ্গ তো দূর-কা-বাত। 

পুনশ্চ : রাজনীতি শুধু পাঠে থাকে না, মূল রাজনীতি মাঠে থাকে। রাজনীতি তত্ত্বে নয় সত্যে থাকে। এ কথাগুলো বুঝতে পারলেই রাজনীতি সফল হওয়া সম্ভব। 

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1151 seconds.