• ২৪ মে ২০২১ ১৯:৩৩:০৭
  • ২৪ মে ২০২১ ১৯:৩৩:০৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

প্রদর্শনবাদ, ক্ষমতার জাহির ও ফরিদ শেখ

ছবি : কাকন রেজা

কাকন রেজা :

প্রদর্শনবাদিতায় আমাদের সমাজ এতটাই আক্রান্ত যে, ‘খুশিতে-ঠেলায়-ঘুরতে’ কী কারণে সেই প্রদর্শন তাই অনেক সময় ভুলে বসেন প্রদর্শনবাদীরা। গণমাধ্যমে দেখা যায় একজন বিপন্ন চেহারার মানুষকে জোর করে জাপটে ধরে তার এক হাতে অন্তত দশ জোড়া হাত সাহায্যের নামে একটা লুঙ্গি বা অন্য কিছু তুলে দিচ্ছেন! অনেকে বলেন এটা ‘সিম্বলিক’। হ্যাঁ, অবশ্যই এটা ‘সিম্বল’, তবে তা প্রদর্শনবাদের। 

এই প্রদর্শনবাদী কারা, এরা হচ্ছেন ক্ষমতাবান শ্রেণির মানুষ। কেউ রাজনৈতিক ভাবে, কেউ অর্থনৈতিক, কেউ বা প্রশাসনিক ভাবে ক্ষমতাবান। বিগত দশকগুলিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কোটার ক্ষমতাবানদের ক্যারিশমা মানুষের দেখা হয়েছে। প্রথমে ছিলেন রাজনীতিকরা ক্ষমতাবান। আর ধনীরা থাকতেন অনেকটাই ব্যাকস্টেজে। এরপর ধনীরা ভাবলেন, অন্যদের কেন, আমরা কেন নয়। এই ভাবনা থেকে ধনীরা ক্ষমতাবান হয়ে উঠলেন। এরপর বর্তমান সময়ে প্রশাসনের লোকজনদের কেউ কেউ ভাবলেন, আমরাই বা কম কিসে। অবশ্য তারা যে কম নন তার নমুনা তারা প্রদর্শন করেছেন। আমাদের চোখের সমুখে এই তিন শ্রেণির ক্ষমতার নমুনা-নিদর্শন রয়েছে। 

প্রদর্শনবাদিতার সদ্য নমুনা হলো নারায়গঞ্জ ফতুল্লার কাশিপুরের ফরিদ শেখে’র হেনস্তা। করোনাকালে মানুষের বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্মমধ্যবিত্তদের অবস্থা কতটা বিধ্বস্ত তারই উদাহরণ সেই ফরিদ শেখ। বয়স্ক একজন মানুষ এবং স্ট্রোকে আক্রান্ত। কথা গুছিয়ে বলতে পারেন না। চারতলা পৈতৃক বাড়ির্ চিলেকোঠা ভাগে পেয়েছেন। সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকেন। ছিলো একটি ছোট গেঞ্জি কারখানা। করোনা’র এক বছরে সে কারখানা বন্ধ। মালিক হয়ে নিজে কাজ করেন অন্যের কারখানায়। বৃদ্ধ মানুষ, তারোপর স্ট্রোকের রোগী, কাজকাম তেমনটা পারেন না, তবুও মালিক রেখেছেন সম্মান করে। সেই মালিক বুঝতে পেরেছেন একজন মালিকের শ্রমিকে পরিণত হওয়ার বেদনাটা। কিন্তু নারায়নগঞ্জ উপজেলা সদরের নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা সে বেদনাটা বুঝতে পারেননি। 

ফরিদ শেখ ৩৩৩ এ কল করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফা জহুরা চারতলা বাড়ি দেখেই সহায়তার বিপরীতে শাস্তি দিয়ে দিলেন। বললেন, ফরিদ শেখকে উল্টো ১শ জন মানুষকে সহায়তা দিতে হবে। বৃদ্ধ হতদরিদ্র ফরিদ শেখ প্রশাসনিক ক্ষমতার ভয়ে তার স্ত্রী, ভাইয়ের স্ত্রীর গয়না বন্ধক রেখে, টাকা জোগার করলেন। তারপর নিজের ঘরের কোনে চোখ মুছতে বসে গেলেন। করলেন দুই দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টা। আর বিপরীতে সেই নির্বাহী কর্মকর্তা ক্ষমতার প্রদর্শন করলেন, বন্ধকের টাকায় কেনা সে সহায়তা প্রদানের ফটোসেশন করে। ওহ, বলতে ভুলে গেছি এই ঘটনার আরেক অনুঘটক আছেন। সে এলাকার ইউপি সদস্য, জনপ্রতিনিধি। সুতরাং তিনিও ক্ষমতাবান। তিনিই নাকি নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেছিলেন ফরিদ শেখর চারতলা বাড়ি আছে। এক ক্ষমতাবান আরেক ক্ষমতাবানের উপর নির্ভর করেছেন। এমন ক্ষমতাবানদের পরস্পরের নির্ভরতার কথা আমপাবলিকের জানা। 

বিষয়টা গণমাধ্যমকর্মীদের নজর এড়ায়নি। এটাও অবশ্য ফরিদ শেখের সৌভাগ্য বলতে পারেন। কারণ গণমাধ্যমের দৃষ্টি শক্তির প্রখরতা কমে এসেছে। অনেক কিছুই চোখে পড়ে না। আবার কেউ কালো চশমা এঁটে থাকেন। কিন্তু ফরিদ শেখের বিষয়টা নজরে পড়েছে সহৃদয় গণমাধ্যমকর্মীদের। আমি এমন একজন গণমাধ্যমকর্মীর সামাজিকমাধ্যমের পোস্ট দেখেই ঘটনাটি জেনেছি। দৃষ্টি রাখছিলাম কী হয় তা জানার জন্য। সর্বশেষ জানা গেছে নারায়নগঞ্জের জেলা প্রশাসক বলেছেন, ফরিদ শেখের টাকা ফেরত দেয়া হবে। ভালো কথা। কিন্ত কোথা থেকে দেয়া হবে, প্রশ্নটা এখানেই। এটা তো রাষ্ট্র্রের ভুল নয়, সরকারেরও নয়, স্রেফ ব্যক্তির। তাহলে রাষ্ট্র বা সরকার এর দায় নেবে কেন? 

একটা গণমাধ্যম দেখলাম সেই ফরিদ শেখকে উদ্ধৃত করেছে। সেই উদ্ধৃতিতে ফরিদ শেখ বলছেন অনেকটা এরকম, ‘আমার মানসম্মান গেল তার ক্ষতিপূরণ কে দিব’। জুতা মেরে গরুদানের এই প্রক্রিয়াটা সত্যিই ভুক্তভোগীর জন্য যাতনার। যারা ক্ষমতাবান, যাদের সঙ্গতি আছে, ফরিদ শেখের মতন অবস্থায় পড়েননি, তারা তার যাতনাটা বুঝতে পারবেন না। একজন মধ্যবিত্ত মানসিক ভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত না হলে কারো কাছে হাত বাড়ায় না। বিপরীতে নির্লজ্জভাবে রাষ্ট্রের সম্পদ ও নগদ টাকার দিকে হাত বাড়ান অনেক ক্ষমতাবানরাই। অথচ সেই টাকা এই ফরিদ শেখদেরই। 

ফরিদ শেখ’রা নিগৃহিত হয়, তাদের সামাজিক সম্মান নষ্ট হয়। তারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কেউ কেউ সফলও হয়। যেমন কিছু দিন আগেই এক মা সন্তানকে নিয়ে রেলের নিচে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। এক বাপ সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছিলেন। এদের কথা কেউ মনে রাখে না। গণ ও সামাজিকমাধ্যম যদি ফরিদ শেখকে নিয়ে শোর না তুলতো তাহলে ফরিদ শেখও অলখে থেকে যেতেন। হয়তো এক সময় আত্মহননের পথ বেছে নিতেন। আমরা কেউ জানতেও পারতাম না। আর সেই নির্বাহী কর্মকর্তা যথারীতি পদোন্নতি পেয়ে আরো উপরে উঠে যেতেন, যেখান থেকে নিচতলার মানুষকে খুবই ক্ষুদ্র মনে হয়। যেহেতু এই ঘটনা মানুষের দৃষ্টিতে এসেছে দেখা যাক, সেই কর্মকর্তার কপালে কী জোটে, তিরস্কার না ক্ষমতা প্রদর্শনের পুরস্কার। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0990 seconds.