• ২৫ মে ২০২১ ০০:৩৭:২১
  • ২৫ মে ২০২১ ০০:৪৩:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আফ্রিকান চে; ইতিহাসের অন্তরালে থাকা এক মহা নায়ক!

পশ্চিম আফ্রিকার বুরকিনা ফাসোর রূপকথার নায়ক মাস সানকারা।


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ বুরকিনা ফাসো। ছোট এই দেশটির এক রূপকথার নায়ক থমাস সানকারা। যাকে অনেকেই আফ্রিকান চে হিসেবে চেনে। এই বিপ্লবীর গল্প আমাদের দেশে বসে আমাদের বাস্তবতায় পড়তে গিয়ে রূপকথাই মনে হতে পারে।

ছোট একটি ঘটনা দিয়েই শুরু করা যাক অন্তরালে থাকা এক বিপ্লবী মহা নায়কের গল্প। তখন তিনি বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট। ৩৩ বছর বয়স্ক টগবগে যুবক। ক্ষমতা গ্রহণের পর সব ধরনের বিলাসিতা এড়িয়ে চলছেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি তার সরকারী বাসভবন ও অফিসে এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ তার কাছে মনে হয়েছিলো দেশের জনগণকে তীব্র গরমের ভেতর রেখে প্রেসিডেন্ট হয়ে এসির ভেতর বসবাস করা একটা বিলাসিতা মাত্র! আর সেই সময় তিনি এবং তার মন্ত্রী পরিষদসহ দেশের সকল উদ্ধর্তন কর্মকর্তাদের বিলাসি জীবন যাপনের উপর নানা রকম বিধি নিষেধ আরোপ করেন।

যেমন, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রুখতে নিজের জন্য ব্যবহৃত মার্সিডিজ গাড়িটি বিক্রি করে দেন। প্রেসিডেন্টের জন্য ব্যবহার করার জন্য কেনেন সস্তা একটি গাড়ি। মন্ত্রী পরিষদকে নির্দেশ দেন সবার গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে বাই সাইকেল চালিয়ে কাজে যাওয়ার জন্য। তিনি নিজেও সাইকেল চালাতেন। মন্ত্রী পরিষদসহ সকল উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের বিমানে প্রথম শ্রেনিসহ বিভিন্ন যানবাহনের প্রথম শ্রেনিতে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেন। তিনি বলতেন ‘যে প্রথম শ্রেনির আসন ছাড়া চলাচল করতে পারে না, সে দেশের সেবা করবে কিভাবে? রাজনীতি করতে হলে বিলাসিতা করা যাবে না। আর বিলাসিতা করতে হলে দেশ ছাড়তে হবে।’ শুধু তাই না সরকারের সকল উদ্ধর্তন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তাদের যাবতীয় চিকিৎসা নিজ দেশের হাসপাতালে করতে হবে। আর এইসব নির্দেশ নিজের জন্যও বলবত রাখেন ।

এই মার্কসবাদী কমিউনিষ্ট বিপ্লবী থমাস সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তখন তিনি ক্যাপ্টেন থমাস নামে পরিচিত। তার আগে দেশটিতে ২৭ বছর স্বৈরাশাসন চালিয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের মদদপুষ্ট স্বৈরশাসক ব্লাসিই কমপাওর। এরপর ১৯৮০ সালে সাজানো ভোট চুরির নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় বসেন ব্লাসিই। তখন জন-অসন্তোষ চরমে পৌছায়। এই পরিস্থিতে ১৯৮৩ সালে এক সামরিক অভুত্থ্যানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন থমাস সানকারা।

তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেই যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ নেন। বদলে দেন দেশের নামও, নতুন নাম রাখা হয় বুরকিনা ফাসো। যার অর্থ ন্যায়পরায়ণ মানুষের দেশ। এর আগে দেশটির নাম ছিলো রিপাবলিক অব আপার ভোল্টা।

সানকারা সম্পর্কে দেশটির অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক নোয়েল নেবেল বলেন, ‘সানকারা বুরকিনা ফাসোকে স্থানীয় জনশক্তি ও জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করতে চেয়েছিলেন। সকল প্রকার বৈদেশিক সাহায্য সহযোগিতার বিরোধী ছিলেন তিনি। আত্মনির্ভরশীল হতে চেয়েছিলেন। আর এর শুরু করেছিলেন কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে। তিনি দেশের ধনী শ্রেনীকে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন যাতে দেশের কৃষজীবী মানুষগুলো তাদের প্রাপ্য পায়।’

একবার এক ভাষণে সানকারা থমাস বলেন, ‘যখন কেউ আমাকে প্রশ্ন করে কোথায় সাম্রাজ্যবাদ। তখন আমি বলি তুমি তোমার খাবার প্লেটের দিকে তাকাও। দেখবে তুমি যা খাচ্ছো ভাত, ভুট্টা, মিলেট (এক ধরনের শস্য) সব কিছুই আমদানী করা! এটাই সাম্রাজ্যবাদ!’

মাত্র চার বছরের শাসনে ওলট-পালট করে দেন দেশটিকে লুটপাট করে চুষে খাওয়া পশ্চিমা বণিক এবং তার দেশীয় দোষরদের সব হিসেব নিকেশ। থমাস সব বিদেশি ঋণ নির্ভর উন্নয়ন থেকে সরে আসেন।

বিপ্লবী থমাস বলতেন- ‘যে তোমাকে খাওয়াবে সে তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে’। আর তাই বিদেশি ঋণের মাধ্যমে চড়া সুদে দেশ বন্ধকী উন্নয়ন নীতি থেকে সরে আসেন তিনি। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। দেশের ভূমি জাতীয়করণ করে ভূমিহীন তৃণমূল কৃষকদের হাতে ভূমি তুলে দেয়াসহ তার হাতে নেয়া অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রনীতি ছিল দেশের দূর্ভিক্ষ মোকাবেলা, খাদ্যাভাব হ্রাস, খাদ্যশষ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ভূমিব্যবস্থা পুনর্গঠন, দেশব্যাপী স্বাক্ষরতা অভিযানসহ শিক্ষায় গুরুত্বারোপ এবং জনস্বাস্থ্য অবস্থার উন্নয়ন।

তার শাসন আমলে জাদুর মতো কাজ করতে থাকে সবকিছু। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়তে থাকে। যেখানে আগে প্রতি হেক্টরে ফসল উৎপাদন হতো ১৭০০ কেজি , সেখানে তার শাসন আমলে তা বেড়ে দাড়ায় ৩৮০০ কেজিতে। দ্বিগুনেরও বেশি বেড়ে যায় উৎপাদন। যার ফলে খুব দ্রুতই খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠে দেশটি। তিনি স্থানীয় পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করণের উপর ব্যপক গুরুত্ব দেন। এমনকি নিজেও দেশিও তৈরি পোশাক পরতেন।

তিনি গ্রামীণ জনপদের সকল ট্যাক্স, টোল ও সরকারি কর বিলোপ করেন। বিদেশি সহায়তা ছাড়াই দেশের সড়ক, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নতি সাধন করেন। মাত্র চার বছরে দরিদ্র এই দেশের স্বাক্ষরতার হার ১৩% থেকে ৭৩% এ উন্নীত করেন। হাত দেন দেশের পরিবেশ উন্নয়নেও। দেশটির আবহাওয়ার গঠন অনেকটা রুক্ষ ও শুষ্ক। তাই মরুকরণ রোধে ১০ মিলিয়নেরও বেশি বৃক্ষরোপণ করে মোট বনভূমির পরিমাণ বাড়ান। সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের বেতন কমিয়ে রাষ্ট্র গঠনে সে তহবিল কাজে লাগান। এমনকি নিজের বেতনও ৪৫০ ডলার থেকে কমিয়ে ১৫০ ডলার করেন। নারীদের শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। অনেক আফ্রিকান দেশের ভেতর তারাই প্রথম নারীদের বিভিন্ন উচ্চপদে নিয়োগ দেন।

৭০ লাখ জনগোষ্ঠীর ভেতর ২৫ লাখ শিশুকে হাম, কালাজ্বরসহ নানা রকম টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। স্কুলে শিশুদের জন্য দুপুরের ফ্রি খাবারের ব্যবস্থা করেন। নারী শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেন। গ্রামে একটি করে মেডিক্যাল ডিসপেনসারি গড়ে তোলেন। যে আফ্রিকাকে লুটপাট আর ঋণের জালে বেধে লুটে পুটে খাচ্ছে সবাই সেই আফ্রিকার জনগণের মুক্তির স্বপ্ন দেখছিলেন থমাস। তিনি আফ্রিকান জাতিগুলোর ঐক্যের ডাক দেন যাতে তারা মাথার ওপর চাপানো ঋণের বোঝা লাঘবে সবাই একসাথে কাজ করতে পারে।

একটি বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়তে থমাস সানকারা যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তাতে তিনি হয়ে উঠেছেলেন আফ্রিকার এক অনন্য নায়ক। ফলে তিনি লুটেরা সাম্রাজ্যবাদীদের চোখে হয়ে উঠেছিলেন শত্রু। যার ফলে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৪ বছরের মাথায় ১৯৮৭ সালের ১৫ অক্টোবর আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান আফ্রিকার চে থমাস। চে’র বুকে লেগেছিলো ৯ টি গুলি আর থমাসের বুকে লাগে ১৪টি। দুজনেই মারা যান অক্টোবরে... আর দুজনেরই হত্যাকাণ্ড ঘটে সিআইয়ের মদদে! কি অদ্ভুত মিল। থমাস চে গুয়েভারা দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত ছিলেন। তিনি চে গুয়েভারার সামরিক পরিকল্পনা অনুসরণ করে ‘কমিটিস ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য রেভলিউশন (সিডিআর)’ গঠন করে ছিলেন।

থমাসের মৃত্যুর পর তার বাসা থেকে পাওয়া যায় ৪টি বাইসাইকেল । যার একটি চালাতেন তিনি একটি তার স্ত্রী ও বাকি দুইটি তার দুই সন্তান চালাতেন। সাথে ৩টি গিটারও পাওয়া গিয়েছিলো। সান অব সয়েল খ্যাত থমাস গিটার বাজাতে ভালোবাসতেন। বলা হয়ে থাকে তিনিই প্রথম কোন প্রেসিডেন্ট যে তার দেশের জাতীয় সঙ্গিতের রচয়িতা ও সরকার।

তিনি দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেই ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। না হওয়ারই বা কি কারন থাকতে পারে? হঠাৎ করেই ফিনিক্স পাখির উদয় হয়ে নিপীড়িত মানুষের জন্য এক স্বপ্নময় সমাজ গড়ে তুলতে শুরু করা মানুষটিকে কে না পছন্দ করবে ভালোবাসবে।

একবার এক সাংবাদিক থমাস সানকারাকে প্রশ্ন করে, ‘আপনি প্রেসিডেন্ট হওয়া স্বত্বেও কোথাও আপনার কোন ছবি টাঙানো নেই, মূর্তি নেই, ভাস্কর্য নেই, কেন?’

উত্তরে এই বিপ্লবী বলেছিলেন, ‘আমার দেশের ৭০ লক্ষ থমাস সানকারা, তাদের সবাই প্রেসিডেন্ট।’

আর এসব শুধু তার মৌখিক ভাষণ ছিল না রাজনৈতিক আদর্শ বিশ্বাস জীবন দর্শনও। তাইতো মৃত্যুর পর আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন থমাস সানকারা। দেশটির যে কোন জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে তার নামটিই এখন একটি প্রেরণা।

 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0821 seconds.