• ০১ জুন ২০২১ ২০:০১:৩৯
  • ০১ জুন ২০২১ ২০:০১:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

একজন শাহের আলী, যিনি প্রাণ হারিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর

ছবি : সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগরে নির্মাণাধীন হলগুলোর একটি শহীদ রফিক জব্বার হলের মুখ বরাবর আকাশের দিকে উঠে গিয়েছে, অসমাপ্ত সে ভবনের নিচতলার একটি অংশে টিন ও প্লেইন শীটের বিভাজন তুলে রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে ইমারতটির অবকাঠামোগত কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের, সে কামরাগুলোর একটিতেই রাতে ঘুমাতেন শাহের আলী, পাশাপাশি ফেলে রাখা চৌকিতে ভাগযোগে আট দশজন ঘুমানো যায় কষ্টেশিষ্টে ।

শাহের আলীকে যারা দিনের পর দিন ঢালাই বা রড বাঁধাইয়ের কাজে দেখেছেন, যারা রাতের পর রাত ঘুমিয়েছেন তাঁর পাশে এবং ভাগ করে নিয়েছেন একই রূপের নির্মম দারিদ্রকে, যাদের কেউ কেউ তাঁর সাথে একই ট্রলারে করে নাগেশ্বরীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে কুড়িগ্রামে এসেছেন, তারপর সেখান থেকে সাভারের নির্মাণ সাইটে- অপরাহ্নের শুরুতে তারা ভীতসতস্ত্র মনে শুয়ে ছিলেন কামরাগুলোতে । 

শাহের আলীর মৃত্যু তাদেরকে কয়েকদিনের জন্য কর্মবিরতি দিয়েছে, দিয়েছে অসহায়ত্বে ভরা ক্ষোভ এবং নতুন করে জাগ্রত হওয়া সেই পুরোনো ভয় ‘একশজন শ্রমিকের জন্য দশ বারোটি সেইফটি বেল্ট আর অল্প কিছু হেলমেট, আমারো যদি একই পরিণতি হয় ? শাহেরের মত?’।

শাহের আলী যখন বিম ঢালাইয়ের কাজ করতে করতে ছাদে থাকা অন্যান্য সহকর্মীদের বার বার বলছিলেন সাবধানে কাজ করতে কারণ পিছলে পরে বিপদ ঘটতে পারে, তখনো বোধহয় তিনি ভাবেন নি আটতলা থেকে নিচতলা পর্যন্ত কোনোরূপ সেইফটি নেট অথবা পদচারী ক্যানোপি না থাকায় বিপদের ভয়াবহতা কতটা প্রকট হতে যাচ্ছে। আট তলার মত উচ্চতায় কাজ করতে গিয়ে শাহের আলীকে কেউ সেইফটি বেল্টের যোগান দেয় নি, এই ইমারতেই কাজ করতে গিয়ে সেইফটি বেল্ট চাইতে গেলে তাঁদের তিক্ত পূর্বঅভিজ্ঞতাও নিরুৎসাহিত করেছিলো তাদেরকে আবারো তা চাইবার বিষয়ে। 

শাহের আলী যখন সকলকে সাবধান করতে করতে বিমের জন্য কংক্রিট ঢালছিলেন তার কিছুক্ষণ আগেই চারপাশ শীতল করে দেয়া এক বৃষ্টি হয়েছে জাহাঙ্গীরনগরে, যাকে নাগরিকেরা খুব রোম্যান্টিক করে দেখতে চান, একই সাথে ভাওয়াল গড়ের পিচ্ছিল আঠালো কাদা জড়িয়ে থেকেছে শ্রমিকদের হাতে পায়ে ও শরীরে । শাহের আলী পারেন নি আটতলার উপরের লোহার পাইপের উপর পা রাখার পর নিজের পিছলে যাওয়া ঠেকিয়ে দিতে, শাহের আলী পারেন নি তিন তলা পর্যন্ত পতনের পর লোহার পাতের সাথে আঘাত পেয়ে হাঁটুর নিচ থেকে নিজের এক পায়ের বাকী অংশ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া আটকে দিতে, শাহের আলী পারেন নি মাটিতে পরার পর রড লোহা প্লেইন শিটে আঘাত পেয়ে নিজের মাথার কয়েকটি অংশ ফেটে যাওয়া প্রতিরোধ করতে।

শাহের আলীদের এগুলো পারার কথাও নয়, যাদেরকে ব্রহ্মপুত্রের জনবিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল থেকে নিজের ও পরিবারের পেটের ভাত যোগানোর জন্য নগরগুলোতে এসে নির্মম অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিতে হয়, যাদেরকে ক্রয় করা হয় দিনপ্রতি মাথাপ্রতি হিসেবে, যাদেরকে দেয়া হয় না কোনোরূপ সুরক্ষা সামগ্রী, দেয়া হয় না নিজেকে রক্ষার কোনোরূপ ট্রেনিং, যারা আহত হন, নগ্ন পায়ে কাজ করতে করতে যাদের পায়ে মরচে ধরা লোহা ফোটে, ঝালাই ও বিদ্যুৎের কাজ করতে গিয়ে যারা বার বার ইলেক্ট্রিক শক খান, মুখমন্ডল দিয়ে ঠেকিয়ে দেন ঝালাইয়ের ফুলকি তাঁদের এমন অতিপ্রাকৃত উপায়ে নিজেদের জান রক্ষা করার সক্ষমতা থাকে না । 

জান রক্ষা করার দায়িত্ব থাকে প্রযুক্তির এবং প্রকৌশলীদের, দায়িত্ব থাকে প্রশাসক ও নির্ধারকদের । অথচ আজব জবর এই দেশে একটি বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ইমারত নির্মাণে শ্রমিকদের কোনোরূপ সুরক্ষা সামগ্রী কেন দেয়া হয় নি সে প্রশ্ন করলে উত্তর আসে ‘শ্রমিকরা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, ফলে আর কিছু ছিলো কীনা বলতে পারছি না’। উন্নয়ন ও নয়াউদারনৈতিক প্রযুক্তির লেবু কচলে কচলে তিক্ত বানিয়ে ফেলা এই ভূমিতে সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে প্রতিস্থাপিত করা হয় অভিজ্ঞতার ছুঁতোয় ফেলে, বেতন কম পেয়ে প্রতিবাদ করলে বা সুরক্ষা সামগ্রী না থাকার কারণে কাজ করতে ভয় পেলে সেই শ্রমিকদেরকেও প্রতিস্থাপিত করা হয় অন্য শ্রমিকদের দিয়ে যারা কম বেতনে রাজি হতে বাধ্য থাকবেন বা ভয়ানক ঝুঁকিও মুখ বুঝে সহ্য করে কাজ করে যাবেন। 

পুঁজিপতিরাও জানেন ক্রমাগত বাড়তে থাকা অতিধনী ও অতিদরিদ্রের এই দেশে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে হলেও পরিবারের মুখে খাবাার পৌছে দিতে বাধ্য হবেন উত্তরবঙ্গের আরো অনেক ভুখা নাগরিক, বাধ্য হবেন আরো অনেক ভূমিহীন ঘরভাঙা নিঃশেষ হতে থাকা মানুষেরা। পুঁজিপতিদের এই অশ্লীল আত্মবিশ্বাস, এই ভেংচিকাটা বড়লোকিপনা তাদেরকে অল্প কিছু টাকা ব্যায় করে একশজন মানুষের জন্য একশটি সেইফটি বেল্ট কিনতে, একশটি হেলমেট নিশ্চিত করার বিষয়েই কৃপণ করে দেয় । একজন এক বেলা খাওয়া হতদরিদ্র মানুষের জীবন চলে যাওয়ার পর আইন ও রাষ্ট্রের অশালীন নীরবতা, ক্রীয়াহীনতা আরো বেশি করে মানুষের জীবন নিয়ে যাচ্ছেতাই করার সাহস দিয়ে দেয় পুঁজিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে । সারা বিশ^জুড়েই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিপ্রতিষ্ঠানগুলো সর্বজনের স্বার্থ ছিনিয়ে নিয়ে কর্পোরেশনের স্বার্থ উন্নত করার প্রচেষ্টায় থাকে, কিন্তু কোনো রাষ্ট্রে সুশাসন ও জবাবদিহীতা যত বেশি কার্যকর থাকে রাষ্ট্রও তত বেশি করে পুঁজিপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নাগরিকদের স্বার্থকে নিরাপদ ও টেকসই রাখতে সচেষ্ট হয়, নাগরিকদের কথা ভাবেন এবং জবাবদিহীতা জায়গা পরিষ্কার থাকে এমন রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিশ্চয়ই কোনো নাগরিককে শাহের আলীর মত পরিণতি দেখতে হয় না। 

শাহের আলীর একজন সহকর্মী বার বার আফসোস করতে করতে বলছিলেন, ‘যদি এই বিল্ডিংয়ে তিন তলা থেকে উপর পর্যন্ত সেইফটি নেট অথবা এমনকি টিনের ক্যানোপিও দেয়া থাকতো তাহলেও শাহেরে কপালে এমনটা হতো না, সে উপর থেকে পিছলে পরে গেলেও টিনের পাতাটনের উপর পরতো, তাতে হয়তো হাত পা ছিলতো বা ভাঙতো, কিন্তু জীবনটা তো থাকতো। জ্যান্ত যে ছেলেকে আমরা গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিলাম তাকে জ্যান্তই নিয়ে যেতে পারতাম।’ শাহেরে আরেকজন কিশোর সহকর্মী যার বাড়ী শাহেরে পাশেরই গ্রামে, তিনি কথা বলতে ভয় পাচ্ছিলেন আমাদের সাথে, কামরা থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছিলেন, ইমারতটির দিকে চোখ ফিরে তাকাতে ভয় পাচ্ছিলেন, তিনি ইচ্ছা ব্যক্ত করছিলেন যে যত দ্রুত সম্ভব এই স্থান ত্যাগ করে তিনি গ্রামে চলে যাবেন। গ্রামের একজন কিশোর, যার হয়তো একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ার কথা, যিনি প্রত্যন্ত চর থেকে পেটের খোরাকী জুটাতে ঢাকায় এসে হাজির হয়েছিলেন, তিনি আমাদের চোখের দিকে চোখ ফিরে তাকাতে ভয় পাচ্ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পেটিবুর্জোয়া শিক্ষিতরা যে দালানে থাকবেন ঘুমাবেন পড়বেন বা গান গাইবেন সেই দালানের দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছিলেন, দালানের ভেতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছিলেন। একজন শাহের আলীর চোখে, একজন কিশোর শ্রমিকের চোখে আমরা শহুরে দায়িত্ববোধহীন ফুলবাবুরা এমনই এক দানবে পরিণত হয়ে উঠেছি, আমাদের স্বার্থপর কর্ম আবাসন ও নিদর্শন এমনই এক জাহান্নামে পরিণত হয়েছে।

আটতলা থেকে নিচ অব্দি তাঁকে পরে যেতে দেখেছিলেন শাহেরের আরেক সহকর্মী, তিনিই প্রথম গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন রক্তাক্ত বিক্ষত শাহেরকে, পঁচিশ বছরের টগবগে শরীর তখন লাল রক্তে ভেসে গিয়ে কাঁতরাচ্ছিলো প্রাণপনে। তাৎক্ষণিকভাবে কী করা হবে এই কাঠামোবদ্ধভাবে খুন হতে থাকা শ্রমিককে? কয়েকজন জানালেন অ্যাম্বুলেন্সের জন্য, বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মত জায়গার একটি স্থান থেকে অন্য একটি স্থানে অ্যাম্বুলেন্স আসতে সময় নিলো পাক্কা আধাঘন্টা। এই আধাঘন্টায় শাহের আলীর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পা আর ফেটে যাওয়া মাথা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরতে লাগলো, সহকর্মী শ্রমিকেরা কাপড়পট্টি বাঁধলেন, জড়িয়ে ধরে রাখলেন তাকে, নিজেরাও ভিজে উঠলেন ফিনকি দিয়ে বেরুনো রক্তে। অ্যাম্বুলেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার হয়ে সাভারের একটি হসপিটালে যেতে সময় নিলো আরো আধঘন্টা। হাসপাতালে পৌছে শাহেরে পায়ের কাপড়পট্টি যখন খোলা হচ্ছে ততক্ষণে তিনি হারিয়ে গিয়েছেন সকলের থেকে, বিশাল বিশাল উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করা অসংখ্য শ্রমিকের ভেতর থেকে একজন শাহেরের হারিয়ে যাওয়া কোনো বিশেষ ব্যাঞ্জনা যুক্ত করছে কীনা তার উত্তর আমাদের কাছে নেই। 

শাহের আলীর বিয়ের জন্য কন্যা ঠিক করে রেখেছিলো তাঁর পরিবার, কথা ছিলো আগামী কোরবানী ঈদে কাজ থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ীতে গেলেই তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো হবে । নিশ্চয়ই সেই নারীও অপেক্ষা করছিলেন শাহের আলীর জন্য, তিনি কোনোভাবেই হয়তো হারিয়ে যেতে দিতে চাইতেন না শাহেরকে, ঠিক যেভাবে যে কোনো সম্মানবোধসম্পন্ন সমাজের নাগরিকেরাই অপরাপর নাগরিকদের এমন অস্বাভাবিকরূপে হারিয়ে যাওয়া মেনে নিতে চাইবেন না। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানতম দায়িত্বই থাকে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার পাশাপাশি নিজেদের চর্চার মাধ্যমেও রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে এমন এক জনকল্যাণমুখী অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যার থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ নিজেও শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সম্বৃদ্ধ করতে পারে । আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা,২০২০ অনুসারে অবকাঠামো নির্মাণ ক্ষেত্রে কাজ করা শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কোনোরূপ নীতি না মেনে, কোনো প্রকার শ্রমিক সুরক্ষা না দিয়ে কাঠামোবদ্ধ খুনের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত রাখার কাজ বীরদর্পে করে গেছেন। যে নাগরিকদের করের টাকায় বিশ^বিদ্যালয়ের ভরণপোষণ হয় সেই নাগরিকেরা নিশ্চয়ই এমন কুৎসিত দৃষ্টান্ত ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবেন। 
শাহের আলী ঠিক যে স্থানটিকে রক্তাক্ত হয়ে পরে ছিলেন সেখান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর একজন নির্মাণ শ্রমিক জানালেন এই জায়গাটি ভরে উঠেছিলো লাল রক্তে, পরবর্তীতে তা ধুয়ে মুছে ফেলা হয়েছে। 

আমার বার বার মনে হতে লাগলো এই ধুয়ে মুছে ফেলার সাথে আমাদের নাগরিক জীবনের নানাবিধ সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, মুক্তমতের বিরুদ্ধে সসিংসতার ছোপ ছোপ রক্তের দাগ, দুর্নীতি ও লুটপাটের দগদগে ক্ষতর মত চিহ্নগুলোর মুছে ফেলার, ধুয়ে ফেলা, স্বাভাবিক করে ফেলার কী এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ঠিক যেভাবে ওই স্থানটিকে দেখে মনে হচ্ছিলো যেন একদিন আগে এখানে কিছুই হয় নি, কেউই অন্যায্যভাবে প্রাণ হারান নি । স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের মাথায় এমনই এক ভয়ানক বাংলাদেশ, এমনই এক ভূতুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছি আমরা। 

লেখক: ইয়াসির আরাফাত বর্ণ 
(শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

শাহের আলী জাহাঙ্গীরনগর

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0728 seconds.