• ০২ জুন ২০২১ ২১:৫৩:০৬
  • ০২ জুন ২০২১ ২১:৫৩:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গরুর গোশত ও অসাম্প্রদায়িকতা এবং আমাদের আজবগণ

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। মাঝে-মধ্যেই মালিবাগে বড়বোনের বাসায় যেয়ে থাকি। বোনের সে বাসায় থাকে আরেক ভাতিজা, ভাইয়ের ছেলে। দুই চাচা-ভাতিজা বয়সে প্রায় সমান, তারোপর ছোট থেকে একসাথে বড় হওয়া। সম্পর্কটা তাই বন্ধুত্বের চেয়ে বড় কিছু। সুতরাং গেলেই আড্ডা চলে। আর রাতে মৌচাকের সমুখে গোল সড়কদ্বীপের আড্ডার তো তুলনা নেই। 

এখনের প্রজন্ম সে সময়ের মালিবাগ-মৌচাকের চেহারা চিন্তাই করতে পারবে না। সাথে পারবে না সে সময়ের রাজনীতি, সমাজ সচেতনতা এবং প্রতিরোধ করার সম্মিলিত প্রয়াসের কথা ভাবতেও। কতটা সচেতন ছিলাম আমরা, সে সময়ের তরুণরা; এখনের অন্তর্জালে ডুবে থাকা তরুণদের মোবাইল ফ্রিকোয়েন্সি ব্যর্থ হবে সেই সচেতনতার সামান্যটুকুও ধরতে। যদি ধরতে পারতো তাহলে হয়তো এখনের সময়টা অন্যরকম হতো। মানুষ প্রাণ খুলে হাসতে, কথা বলতে পারতো। 

মৌচাকের সড়কদ্বীপে রাতের আড্ডা শেষে একদিন মনে হলো গরুর গোশত দিয়ে পরোটা খাবো। কিন্তু মুশকিল হলো, পাশেই রয়েছে সুনীলের হোটেল, যেখানে বড় করে লেখা ‘নো বিফ’। আশেপাশে ছোটখাটো যে কয়টা হোটেল রয়েছে, সবখানেতেই ‘নো বিফ’ ঝোলানো। না সে রাতে কোনো ভাবেই গরুর গোশত খাওয়ার সাধ মিটলো না। শেষমেশ হাতের কাছে তখনকার ‘পশ’ এবং ‘ভাব’ এর চাইনিজ চাংপাই এর উপর ভর করতে হলো। গরুর গোশতের বদলে সুপ দিয়ে পেট ভরালাম। 

সুপ্রিম কোর্ট ক্যান্টিনে গরুর গোশত রান্না করা বা না করা নিয়ে যে বাহাসের উৎপত্তি হয়েছে, সে নিয়ে বলার জন্যই উপরের ভূমিকা বয়ান। আমাদের তারুণ্যে ঢাকা শহরে হোটেলে বসে গরুর গোশত অর্ডার করলেই এসে যাবে এমন ভাবা ছিলো দুষ্কর। এখনো তাই। এখনো ‘নো বিফ’র আধিপত্য প্রবল। চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চল এবং দেশের হাতেগোনা কিছু এলাকায় হোটেলে গরুর গোশত রান্না হয়। স্বয়ং আমার জেলাতেও অসংখ্য হোটেলের মধ্যে দু’একটাতে গরুর গোশত পাওয়া যায়। অর্থাৎ আপনি ইচ্ছে করলেই যে কোনো খাবার হোটেলে বসে গরুর গোশত খেতে পারবেন না। 

অদ্ভুত না! দেশের আঠেরো কোটি মানুষের সতেরো কোটিরই গোশত ক্যাটাগরিতে প্রথম পছন্দ গরু। ধনীদের তো কথাই নেই, অতি দরিদ্রদেরও যদি ছয় মাসে একবার গোশত খাবার সঙ্গতি হয়, তখনও তার পছন্দ গরু। অথচ এই গরুর গোশত আপনি হোটেল-রেস্তোরাঁয় পাবেন না। কেন পাবেন না, এই প্রশ্নের যে উত্তর শুনতে পাবেন, তার যৌক্তিকতা খুঁজতে গেলে আপনি বোকা বনে যাবেন। ভাববেন, সতেরো কোটি মানুষের খাদ্যাভাস, তাদের পছন্দের বিপরীতে এই উত্তর তো চরম সাম্প্রদায়িক। হ্যাঁ, সেই উত্তর ও উত্তর বিষয়ক অজুহাত দুটোই চরম সাম্প্রদায়িক। 

কেউ যদি মদ্যপানে আপত্তি জানান, তাহলে দেখতে পাবেন সেই উত্তর আর অজুহাতের রিভার্স পজিশন। শুরু হয়ে যাবে প্রতিবাদ। যে আপত্তি করলেন, তার চৌদ্দগোষ্ঠী ধুয়ে দেয়া হবে। খোঁজা হবে নানা কানেকশন। সাথে আরো নানান কেচ্ছা-কাহিনি। অর্থাৎ যিনি মদ্যপানের বিরোধীতা করলেন, তিনি গেলেন ভোগে। একপাল রামবুদ্ধিজীবী নেমে পড়বেন কোমর বেঁধে। ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্বের তত্ত্ব উঠবে। কেন ‘মাল’ খেতে দেয়া হবে না, বলে ‘বেওরা’ জবান প্রচুর শুনবেন। ফেসবুক আলোচনায় কান গরম হয়ে যাবে। মাধ্যমের ‘মতামত’ ক্যাটাগরি ভরে যাবে ‘সিক্সটি-নাইন’ প্রবন্ধ-নিবন্ধে। সবকিছুর মোদ্দা কথা হবে, কেন মদ্যপানের বিরোধীতা করা হলো। 
অথচ বিপরীতে দেখেন, গরুর গোশতের কথা উঠলেই তাদের রিভার্স পজিশন। একেবারে গো-রক্ষক বনে যাবেন তারা। রীতিমত ভারতীয় আরএসএস। এক যাত্রায় এমন দুই ফলকে কী বলবেন, দ্বিচারিতা? নাকি চরিত্রহীনতা? 

ইউরোপিয় দেশগুলোতে খুঁজলেই ‘হালাল ফুড’ পাওয়া যায়। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তা খুঁজে বের করেই খায়। কই তারা তো বলে না, আমরা ‘সংখ্যালঘু’রা খাই না তাই তোমাদের ‘পর্ক’ খাওয়া চলবে না। সরকারকে বলে না, শুয়োর কাটা বন্ধ করো। বরং তারা নিজেদের হালাল খাবারটা খুঁজে খায়। বাংলাদেশেও কিছু মানুষ, বিশেষ করে ট্রাইব’রা শুয়োর পালে এবং খায়। কই কোনো মুসলমানকে কখনো বলতে শুনিনি তোমরা শুয়োর পালতে এবং খেতে পারবে না। 

পুলিশের এক উর্ধতন কর্মকর্তা, যিনি এখন অবসরে, তিনি এবং আমি বড়দিনের এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে মূল খাবারই ছিলো ‘পর্ক’। কই, সেখানে সংখ্যায় বেশি মুসলমানরা তাদের সেই উৎসবে বাধ সাধেনি। বলেনি, মুসলমান প্রধান এলাকায় ‘পর্ক’ চলবে না। মদ্যপানের ব্যবস্থাও ছিলো অনুষ্ঠানে। সেই পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন সেখানে প্রধান অতিথি, ‘বিশেষ’ হিসেবে আমিও ছিলাম। আমরা আমাদের ধর্মের নিষিদ্ধ খাদ্য, পানীয় খাইনি। কিন্তু তাদের উৎসবে বাধ সাধিনি। সরকারের অংশ হিসেব পুলিশ প্রশাসনও তো বাদ সাধেনি তাদের ‘খাদ্য’ ও ‘পান’ এর উৎসবে। তারা তাদের পছন্দের খাবার ও পানীয়ের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছে এবং এখনো করে। 

ট্রাইব অধ্যুষিত কিছু এলাকায় রান্না করা শুয়োরের গোশতও বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি বাজারে ছোটখাটো খাবারের হোটেল, ইদানিংকালে যেগুলো হিন্দির আগ্রাসনে ‘ধাবা’ বলে পরিচিত। বাজারেও বিক্রি হয় কাঁচা গোশত। আর মদ্যপান দেশের সবখানে প্রায় প্রকাশ্যেই হয়। বিক্রিও হয় প্রকাশ্যে। নাটকে-সিনেমায় প্রেমিক প্রেমে ছ্যাকা খেলেই, মদের বোতল নিয়ে বসে যান। কমন থাকে ভ্যাট সিক্সটি-নাইনের বোতল। 
এই যে, এত কথা বললাম, এত কাহিনি এসব যদি বাধার মুখে না পড়ে, মদ দোকানে বিক্রি হতে পারে, প্রকাশ্য পানও চলে। সিনেমা-নাটকে অবাধে প্রদর্শিত হয়। শুয়োর খেতেও বাধা নেই। কচ্ছপও চলে। তাহলে সতেরো কোটি মানুষের পছন্দের খাবার কেন বাধার মুখে পড়বে। কেন প্রশ্ন উঠবে গরুর গোশত রান্না বিষয়ে! এমন প্রশ্ন ও বাধার চেয়ে চরম সাম্প্রদায়িকতা আর কী হতে পারে! এই চরম সাম্প্রদায়িকরাই আবার রিভার্স পজিশনে নিজেদের দাবি করেন প্রবল অসাম্প্রদায়িক হিসেবে! আজব না?

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0972 seconds.