• ০৯ জুন ২০২১ ১৯:২৭:১৮
  • ০৯ জুন ২০২১ ১৯:২৭:১৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কানাডায় বিদ্বেষের গাড়িচাপা ও ঘৃণাবাদীরা

ছবি : কাকন রেজা

কাকন রেজা :

কানাডায় একটি মুসলিম পরিবারের চার সদস্যকে গাড়িচাপায় খুন করা হয়েছে। বেঁচে গেছে পরিবারের এক সদস্য। যে কিনা নয় বছরের এক বালক এবং সেও গুরুতর আহত। গ্রেপ্তার হয়েছেন খুনের সাথে সংশ্লিষ্ট কানাডিয় তরুণ। 

মুসলিম বিদ্বেষ থেকেই এই খুন, জানিয়েছে কানাডিয়ান পুলিশ। এই হলো ঘটনার সারসংক্ষেপ। এটা একটা হেট-ক্রাইম, ঘৃণাজনিত অপরাধ। শুধু কানাডা কেন সারা ইউরোপেই এমন ঘটনার অভাব নেই। এই কানাডাতেই ২০১৭তে একটি মসজিদে ছয় জনকে হত্যা করা হয়। মূলত হত্যার ঘটনাগুলো গণমাধ্যমে আসে বলে আমরা জানতে পারি। কিন্তু এর বাইরে ঘৃণাজনিত অসংখ্য অপরাধের কাহিনি আমাদের অজানা রয়ে যায়। ইউরোপে মুসলিম বিদ্বেষের পরিসংখ্যান যদি দেখেন তবে অবাক হয়ে যেতে হয়। 

২০১৩ সালের ডয়চে ভেলে থেকে উদ্ধৃত করি, ‘আমাকে বেশ কয়েকবার আক্রমণ করা হয়, মারা হয় ঘুসি৷ এমনকি মুখে থুথু ছিটিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলেও দেয়া হয়৷ শুধু তাই নয়, আমাকে নৃশংসভাবে মাথায় আঘাত করা হয় এবং আমার স্বামী ও আমার ছোট ছেলের চোখের সামনে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া হয়৷ তখন আমি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম৷’ এটা ইংল্যান্ডে সংঘটিত এক মুসলিম নারীর প্রতি ঘৃণাজনিত অপরাধের ঘটনা। ডয়চে ভেলে’র নাম দেখে বিভ্রান্ত হবেন না, এই ঘটনা কোনো গণমাধ্যমে আসেনি। বৃটিশ সাহায্য সংস্থা ‘টেলমামা’র নির্মিত একটি ডকুমেন্টারি থেকে ঘটনাটি নিয়েছে ডয়চে ভেলে। 

এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যা দৃষ্টির আড়ালে। ২০১২ থেকে ‘টেলমামা’ কাজ করছে ইসলাম বিদ্বেষ নিয়ে। সংস্থাটি শুরুর আঠারো মাসেই ১২শটি এমন ঘৃণার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। সবচেয়ে মজার বিষয়, এরপর থেকে ‘টেলমামা’র আর কোনো পরিসংখ্যান কোনো খবরের মাধ্যমে নেই বা থাকলেও তা তেমনভাবে পাঠক-দর্শকদের সামনে আসেনি। ২০১৩ সালের এই নিবন্ধে ডয়চে ভেলে জানাচ্ছে, এত বেশি মুসলিম বিদ্বেষের ঘটনা ঘটছে যার সঠিক পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই বা করা সম্ভব হয়নি। 

ডয়চে ভেলে স্বয়ং নিজের দেশ জার্মানের কথা বলছে, জার্মানিতে ইসলাম বিরোধী তৎপরতার কোনো হিসেব রাখা হয় না। কোনো পরিসংখ্যান নেই। অর্থাৎ মুসলিম বিদ্বেষের কোনো ঘটনা ইচ্ছে করেই দৃষ্টির আড়ালে রাখা হয়। অথচ বিপরীতে সংখ্যায় অল্প খ্রিস্টান বা ইহুদি বিদ্বেষের ঘটনা গণমাধ্যমের বড় শিরোনাম দখল করে নেয়। ইউরোপ অ্যামেরিকাতে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহতের ঘটনা এখন হরহামেশাই। এসব ঘটনার সাথে ইসলামি ঘৃণাবাদীদের যোগ শতাংশের হিসেবে একেবারেই নগণ্য। অথচ সেই নগণ্যই গণ্য হয়ে ওঠে গণমাধ্যমের শিরোনামে। আর এটা ইচ্ছাকৃত। 

এখন ২০১২ সালের বিবিসি থেকে উদ্ধৃত করি। না, বিবিসি’র নিজস্ব বিষয় নয়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের কাঁধে ভর করে প্রতিবেদন ও নিবন্ধের মাঝামাঝি একটা কিছু করেছে তারা। শিরোনাম হলো, ‘ইউরোপে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়ছে’। বিবিসি অ্যামনেস্টির ১২৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন থেকে বলছে, ‘ইউরোপ জুড়ে মুসলিমরা তাদের ধর্ম পালন থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ---সব জায়গাতেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।’ 

আমাদের দেশে যারা মানবিক কথা খুব বলেন। ইসলামকে সুযোগ পেলেই অমানবিক ধর্ম বলে আখ্যা দেয়ার কোশেস জারি রাখেন তাদের জন্য অ্যামনেস্টির আরেকটু অবজার্ভেশন তুলে দিই। অ্যামনেস্টি বলছে, ‘ইউরোপীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অন্য এক সংকটের মুখে , সেটা হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধের সংকট এবং এই সংকটের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে মুসলিমদের প্রতি তাদের অসহিষ্ণু আচরণে।’ ধর্মপালনের অধিকারের ক্ষেত্রে অ্যামনেস্টির মাধ্যমে বিবিসি জানাচ্ছে, ‘ধর্মপালনের অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকারগুলোর একটি। ইউরোপের এই দেশগুলোর সব কটির সংবিধানে ধর্মপালনের অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমরা তাদের দৈনন্দিন প্রার্থনা করতে গিয়েও সেখানে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।’

২০১৯-২০ সালের জার্মানির কথা বলি, অ্যামনেস্টিসহ অন্যান্য সংগঠনের ধাক্কায় জার্মান সরকার শেষ পর্যন্ত মুসলিম বিদ্বেষের কিছু ঘটনা নথিভুক্ত করছে। সে হিসেবে ২০১৯ সালে ৮৮৪টি মুসলিম বিদ্বেষের ঘটনা নথিভুক্ত করে জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২০২০ সালে বেড়ে ঘটনা দাঁড়িয়েছে ৯০১টি। মুসলিম বিদ্বেষের বিপরীতে খ্রিস্টান ও ইহুদি বিদ্বেষের ঘটনা কয়টি ঘটেছে, তার পরিসংখ্যান দেখতে গেলে অনেকেই হতাশ হবেন। তাদের আর হতাশ করি না। বিশেষ করে আমাদের দেশের হাফ পণ্ডিতদের। হাফ বলার ব্যাখ্যাটা খুব কঠিন নয়। যাদের দুই চক্ষুর একটা দেখে, দুই কানের একটা শোনে, মস্তিষ্কের একটা অংশ কাজ করে, তাদের আর কী বলা যায়।  

ফ্রান্সের দিকে আর না যাই। ম্যাক্রোঁ’র থাপ্পড় খাওয়া দেখেছেন সবাই। এর পেছনের কারণটাও অজানা নয়। শার্লি অ্যাবদো’র কার্টুনের কথাও থাক। তারচেয়ে নেদারল্যান্ডের কথা বলি। যাকে অনেকটাই শান্তির দেশ বলা যায়। যেখানে রয়েছে বৈষম্যবিরোধী আইন। তারপরেও অ্যামনেস্টির ভাষায়, সেখানে মুসলমানরা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অথচ বৈষম্যবিরোধী আইন মুসলমানদের জন্য প্রয়োগ হচ্ছে না। 

অ্যামেরিকার ইসলাম বিদ্বেষের প্রকৃষ্ট নমুনা সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এরপর বিদ্বেষের আর কোনো নমুনা খোঁজার প্রয়োজন বোধ করি না। বাইডেনও যে ইসলামের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল তার কোনো বড় প্রমানও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হোয়াইট সুপ্রিমেসি তো দিন-দিন তার আধিপত্যের জায়গা বাড়িয়ে চলেছে অ্যামেরিকার সর্বত্রই। 

সুতরাং কানাডার ঘটনা এর বাইরের কিছু নয়। তবে কষ্ট হয় বেঁচে থাকা সেই বালকটির জন্য, সারাজীবন ভয়াবহ এক স্মৃতি বয়ে বেড়াবে সে। ঘৃণার চাষ যতদিন থাকবে ততদিন এমন স্মৃতি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। সে হোক ধর্মবাদী ঘৃণা কিংবা বর্ণবাদী অথবা হোক তা রাজনৈতিক। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0768 seconds.