• ১৯ জুন ২০২১ ১৭:০৮:৪৮
  • ১৯ জুন ২০২১ ১৭:০৮:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘ফেসবুক সাংবাদিক’ ও আমাদের গণমাধ্যম

ছবি : কাকন রেজা

কাকন রেজা :

একটি ম্যাগাজিনের ফেসবুক পেইজে আমার একটা লাইভ প্রোগ্রাম চলছে। অনেকটা সাক্ষাতকার টাইপের প্রোগ্রাম। বিখ্যাত মানুষজনেরা আসেন, কথা বলি তাদের সাথে। জানতে চাই সেই মানুষজনের চিন্তা ও কর্ম সম্পর্কে। সেদিন হাল-সময়ের খ্যাতিমান একজন সাংবাদিকের সাথে কথা বললাম। বুদ্ধিজীবী হিসেবেও যার চিন্তা ও লেখাকে অগ্রাহ্য করা যায় না এমন একজন মানুষ। 

প্রোগ্রামটা শেষ করেছি। এরমধ্যেই ফোন। ধরলাম। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে আমার এলাকার লোক পরিচয় দিয়ে জানালেন, তিনিও একজন ‘সাংবাদিক’। উচ্চারণটার মধ্যে এক ধরণের গর্ব টের পাচ্ছিলাম। আমি নাম জানতে চাইলাম, বললেন। জানালেন, একটি মাধ্যমের উপজেলা প্রতিনিধি তিনি। আমি আমার জেলার প্রায় সব গণমাধ্যমকর্মীদের নামে চিনি, কিন্তু তার নামটা আমার স্মৃতিতে ছিলো না। তবু কথা হলো। কথার ধরণটা কেমন ছিলো বলি। 

‘আপনের অনুষ্ঠান তো দেখলাম। মাঝে-মইধ্যে দেখি। তবে এই অনুষ্ঠানটা খুব বেশি জমে না। আপনে এলাকার লোক, এলাকায় নাম-ডাক চাইলে এইসব লোক দিয়া হবে না। কীসব লোক আনেন, এলাকার মানুষ যাদের চিনে না। এলাকায় নাম কামাইতে দু’চারজন ভালো লোক নেন।’ 

তার ধরণটা বুঝতে পারছিলাম এবং সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানটাও। তবু বিনীত ভাবে বললাম, আপনি দু’একজনের নাম সাজেস্ট করুন, দেখি তাদের নেয়া যায় কিনা। তারপরেরটা ইতিহাস। তিনি দু’জন করে চারজনের নাম বললেন। এদের মধ্যে দু’জন গণমাধ্যমের। একজন স্থানীয়, অন্যজন এই ঢাকার। আর দুজনের একজন স্থানীয় এক ‘কবি’ ও ‘গবেষক’ এবং আরেকজন, থাক বললাম না। 

নাম বলেই তিনি তার কর্তব্য শেষ করেননি, উপদেশ দিলেন, এইসব লোকদের আনলে আপনাকে এলাকার লোকজন চিনবে। এটুকুই নয়, আশ্বস্ত করলেন, এলাকার লোক বলেই তিনি চান এলাকার মানুষজন আমাকে চিনুক। আমি বিনয়ের সাথে বললাম, আপনার উপদেশ আমার মনে থাকবে। তার চিন্তাটা মূলত এলাকার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছিলো। অর্থাৎ তার সব চিন্তা জেলার বাউন্ডারিটুকুর পরিচিত মুখদের মধ্যেই। এর বাইরে ওই যে ঢাকার দু’একজন যারা ‘খ্যাপে-ট্যাপে’ মাঝে-মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যান এবং তাদের মতন ‘সাংবাদিক’দের সাথে যোগাযোগ করেন, তারা রয়েছেন। আর পড়াশোনার দৌড় সম্ভবত নিজের কথিত মাধ্যম পর্যন্তই।

সেদিন যার সাথে লাইভ প্রোগ্রামে কথা বলেছিলাম সেই বিশেষজনের নাম উল্লেখ করে প্রশ্ন করলাম, তিনি তাকে জানেন কি না। সঙ্গত উত্তর ছিলো, না। আমি বললাম যার সাথে লাইভে কথা বললাম সে বাংলাদেশের প্রধানতম দৈনিকের সম্পাদনা বোর্ডে ছিলেন। শুধু সাংবাদিক হিসেবেই নন, তিনি লেখক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবেও দেশে পরিচিত। তার বেশকটি বইও আছে। 

বলতে গিয়ে আরো বিপাকে পড়লাম। সেই ‘সাংবাদিক’ সাহেব নিজেও যে কতকিছুর সাথে যুক্ত তা জানাতে ছাড়লেন না। তিনিও লেখক এবং একটা মাধ্যমের ‘সম্পাদকীয়’ পরিষদেও তার নাম রয়েছে, এটাও উঁচু গলায় জানান দিলেন। সেই মাধ্যম হলো ফেসবুকের একটি ব্যক্তি প্রোফাইলের পেইজ। বোঝেন তাহলে! আমার রীতিমত ঘাবড়ে যাবার অবস্থা। বলতে পারেন, ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ কন্ডিশন। উপায় না দেখে আমি নিজেই সালাম দিয়ে তখনকার মতন উদ্ধার পেলাম। 

না, এতে ওই গণমাধ্যমকর্মীর কোনো দোষ নেই। দোষ গণমাধ্যমের নিয়োগকর্তাদের। কাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে কাজ করার জন্য, তার বিন্দুমাত্র খোঁজখবর নেয়ার তাগিদ বোধ করেন না অনেক গণমাধ্যমের কর্তাগণ। সম্প্রতি গণমাধ্যম বলে কথিত একটি টেলিভিশনের কর্মকর্তার সাথে তাদের এক খবরকর্মীর ফোনালাপ সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেখান থেকেই কিছুটা জানা যায় এসব মাধ্যমে কাজ করা ও পাবার গোপন সূত্র। ওই টেলিভিশনে বেতন তো দেয়াই হয় না, বরং কোনো খবর প্রচারিত হলে তার কর্মীকেই উল্টো টাকা দিতে হয়। সেই কর্মকর্তার হিসেব সোজা, আপনি টাকা নেন খবর করার জন্য, প্রচারের জন্য সে টাকার ভাগ আমাদেরও দিতে হবে। সেই ‘দেয়ানেয়া’র একটা মজার নামও বের করেছেন তারা। সেই আনুষ্ঠানিক নামটি হচ্ছে ‘কমার্শিয়াল’। এতে বোঝা যায়, তারা সবকিছুকেই ‘কমার্শিয়াল’ করে ফেলেছেন। 

শেষে জানাই, এতদিনের ঘটনা আজ বয়ান করলাম কেন। একটা খবর চোখে পড়লো। বগুড়ার শিবগঞ্জে একজন ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেকে ‘সাংবাদিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। পুলিশ যখন চেপে ধরলো, প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাইলো, পরিচয়পত্র দেখাতে বললো। তখনই লাগলো কেলোটা। ওই ‘সাংবাদিক’ মহাশয় জানালেন, তিনি ‘ফেসবুক সাংবাদিক’। আমাকে ফোন করা সেই জনও ছিলেন ‘ফেসবুক সম্পাদক’! 

জুকারবার্গকে তাৎক্ষণিক ফোন করার ক্ষমতা তো বাংলাদেশ পুলিশের নেই। থাকলে হয়তো তারা জানতে পারতেন, জুকারবার্গ তার ফেসবুকের জন্য বাংলাদেশে কোনো ‘সাংবাদিক’ নিয়োগ দিয়েছেন কিনা। সাথে এও জানতে চাইতে পারতেন, ফেসবুক কবে সামাজিকমাধ্যম থেকে গণমাধ্যমে রূপ নিলো। অবস্থাটা যা দাঁড়িয়েছে এমন প্রশ্নটা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ এখন এত মাধ্যম বিশেষ করে অনলাইন প্লাটফর্মে এবং সে সব মাধ্যমের রয়েছে গণহারে ‘সাংবাদিক’। এই ‘মাধ্যম’ ও ‘সাংবাদিক’দের মধ্যে কোনটা যে ‘গণ’ আর কোনটা যে ‘গন কেইস’ তা বলা মুশকিল।  

পুনশ্চ : কথাটা বোধহয় এখানে শেষ করা ঠিক হলো না। ভুঁইফোড় অনলাইনের কথা বলা সহজ, সেটা বলে শেষ করাটাও সহজ। কিন্তু আমাদের মূলধারার ক্ষেত্রে সে কথাটা বলা বেশ কঠিন, কারণ তারা ‘ফেসবুক সাংবাদিক’ নন। তারা মেইনস্ট্রিম, মূলধারার ‘সাংবাদিক’। তবে মূলধারার ‘গণ’দের মধ্যেও ‘গন কেইস’ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এবং তা বিপদসীমার উপরে। এখনো এ অবস্থা সামলানো না গেলে ভেঙে যেতে পারে গণ ও মাধ্যমের মধ্যে যোগাযোগের সেঁতুটা। অবশ্য অনেকেই আগ বাড়িয়ে বলেন, সেঁতুটা নাকি ভেঙেছে আগেই। 
কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1075 seconds.