• ০১ জুলাই ২০২১ ১০:৪৪:৫১
  • ০১ জুলাই ২০২১ ১০:৪৪:৫১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বুদ্ধিবৃত্তির ‘ব্রাহ্মণ’গণ এবং আমাদের সাধারণেরা

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা :
নুরুল হক নূর, ভিপি নূর। এই মানুষটার একটা সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের কাছে তিনি খুব প্রিয়। আবার একটা অংশের কাছে ভীষণ অপ্রিয়। তাদের ভাষায় নূর হলেন বোকা বোকা গাইয়া টাইপ একটা লোক। যে কথা বলেন গ্রামীণ উচ্চারণে। প্রমিত বাংলা জানা নেই। কথা বলার ধরণটাও ‘মফিজ’ ধরণের। মূল কথায় নূর তাদের ভাষায় ‘স্মার্ট’ নন। এমনকি পোশাকেও তাই। 

যে অংশটা নূরকে ‘মফিজ’ ভাবেন, সেই অংশটা কথায় কথায় নোম চমস্কি’কে উদ্ধৃত করেন। ব্রাত্য রাইসুকে ব্রাত্যজন ভাবেন। সলিমুল্লাহ খানকে কলিমুল্লা’র সাথে মিলিয়ে ফেলেন। 

আর যে অংশটা নূরকে পছন্দ করে। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী। তারা কেউ নোম চমস্কি হতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন না। তারা পড়ছেন পরিবারের কথা চিন্তা করে। পড়া শেষ হলে একটা চাকরি জোটাতে পারলেই তারা খুশি। কারণ এতে তাদের পরিবার বাঁচবে। বাবা-মা স্বস্তি পাবেন। ভাইটার লেখাপড়া, বোনটার বিয়ে সব ব্যাপারেই একটা গতি হবে। এ অংশটার পছন্দই নূর। কারণ তারা নূরকে সমগোত্রীয় ভাবেন, কাছের মানুষ ভাবেন। তাদের চিন্তার সাথে, চলার সাথে, বলার সাথে নূর মিলে যান, মিশে যান। যা অন্যকোন ‘আঁতেল’ ও ন্যাকা-ন্যাকা কথা বলা লোকের সাথে মেলে না। যারা কথাই শুরু করেন মিশেল, ফুঁকো, চমস্কি দিয়ে। প্রমিত বাংলায়, থিয়েটারের সংলাপ আকারে। মার্ক্স তো দুধভাত তাদের কাছে। 

ফুঁকো-চমস্কির এসব বাবাতো ভাইরাই হলো যত মুশকিলের গোড়া। এরা নেতৃত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিষয়টিকে ‘বেদ’ বানিয়ে ফেলেছেন, যা ‘ব্রাহ্মণ’ ছাড়া কেউ ছুঁতে-পড়তে পারবে না। এরা নিজেদেরও ‘ব্রাহ্মণ’ ভাবেন। এদের কেউ বুদ্ধিজীবী, কেউ উচ্চবর্গীয় রাজনৈতিক। ঝামেলা হলো এরা নিজেদের কুলীন ভাবতে গিয়ে নিজেদের ‘ব্রাহ্মণ’ তথা অসামাজিক করে তুলছেন। সঙ্গতই এরা সাধারণ মানুষের সামাজিক চিন্তা-ভাবনা থেকেও দূরে। সাধারণ মানুষকে বোঝা এদের পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব। 

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, এদের দেখলে সাধারণ মানুষ ‘ট্রাক’ মনে করে। বুঝলেন না তো। ওই যে, ট্রাকের পেছনে লেখা ‘নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন’, তারা তাই করে। ‘ব্রাহ্মণ’গণ আবার এই দূরত্বে থাকার ব্যাপারটিকে উপভোগও করেন। বলতে গেলে নিজেদের মধ্যে জমিদার-জমিদার অনুভূতি কাজ করে। অবশ্য এই অনুভূতির পেছনে কিছু কারণও রয়েছে। তারমধ্যে একটা কারণ জেনেটিক। 

জেনেটিক এই কারণে, তাদের পারিবারিক ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, তাদের বাবা-মা সেই ‘সাধারণ’ মানুষ। তাদের পরিবারও সেই ‘অব্রাহ্মণ’দেরই অংশ। সাধারণের সন্তান বলেই তারা ‘অসাধারণ’ হতে চান। তারা নিজেদের মধ্যে ‘জমিদার’ হবার ইচ্ছেটা লালন করেন। তাই যখন হঠাৎ করে সেই সুযোগটা পান, তখন তারা নিজের পরিচয়টাকে দ্রুত ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করেন। আর পরিচয় ঝেড়ে ফেলার প্রয়াসই হলো, নিজেকে ‘চমস্কি’ হিসেবে পরিচিত করার প্রয়াস। এদের ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখবেন নিজের বাবা-মা’র ছবি খুব কম। নিজের বাড়ির ছবিও খুব একটা নেই। অর্থাৎ তারা তাদের উৎস গোপন রাখতে চান এবং তা নিশ্চিত ধরা খাবার ভয়ে। নিজেদের ‘অব্রাহ্মণ’ পরিচয়টা প্রকাশ্যে আসার কুণ্ঠায়। বিপরীতে দেখবেন ঢাকায় তাদের কত ‘বিশেষ’জনের সাথে পরিচয় আছে তা প্রমানের নিমিত্তে তাদের সাথে নানা পোজের ছবি। আর বৈদেশের বিশেষজন হলে তো কথাই নেই। পুরো লেজ নেড়ে দেন। এসব ‘বিশেষ’জনদের জন্মদিন, ‘নুনুকাটা’ উৎসব ধরণের সকল কিছু নিয়ে তাদের দারুণ উল্লাস। এ উল্লাস পুরোটাই বিকৃত মানসিকতার। ভুল প্রবৃত্তির। বুদ্ধিহীনতার। 

এমন অনেক উজবুক আছেন, যারা কথায় কথায় সামাজিকমাধ্যমে ঘোষণা দেন, অমুক বিষয়ে না জেনে আমার সাথে কথা বলতে আসবেন না। সাথে দেন ব্লক করার হুমকি। আরে ভাই, বুদ্ধিজীবী সেজেছেন তো একটু বুদ্ধি বিলান না, অজানাদের জানার সুযোগ করে দিন। এমন একজনকে তার পছন্দের বিষয়েই তিনটি প্রশ্ন করেছিলাম। কী উত্তর দিয়েছিলেন, তা বলতে গেলে আমার বন্ধু তালিকার অনেকের সাথেই তিনি আছেন, তারা তাকে ব্লক করে দেবেন। এসব উজবুকদের আস্ফালন বড় চোখে লাগে। মানুষকে ছোট করার প্রয়াস মনে লাগে। তাই মাঝে-মধ্যে এমন করে লিখতে বসে যাই। বলতে পারেন ক্ষোভ ঝাড়ি। প্রকাশে ক্ষোভ-দুঃখ সবই কমে। 

এই উজবুকরা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাটাকে পরীমনি’দের এলিট ক্লাব বানিয়ে ফেলেছে। এখানে শুধু সোকল্ড এলিটদের প্রবেশাধিকার থাকবে। এই টাইপ উজবুকদের বলি, বুদ্ধিবৃত্তির এই চর্চা কাদের জন্য, মানুষদের জন্যই তো, নাকি অ্যালিয়েনদের জন্য? পরীমনি’দের জন্য? তাদের মুগ্ধ করার মানসে? বলিহারি এদের। 

এদের জন্যই নূররা নেতা হয়ে ওঠেন। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে সোনারগাঁ-শেরাটন অধরা। বোট ক্লাব, গুলশান ক্লাবে প্রবেশাধিকার নেই। হিল্লি-দিল্লি ঘোরার পয়সা নেই। নিদেনপক্ষে চারশো টাকা দিয়ে মোটামুটি স্বাস্থ্যবান বই কেনারও তাদের সঙ্গতি নেই। তারা ফুঁকো বোঝেন না, চমস্কিকে চেনেন না। সুতরাং বিকল্প হিসেবে তারা নূরদেরকেই বেছে নেন। এ বেছে নেয়া যদি দোষের হয়, তবে তার জন্য দায়ি সেই ‘ব্রাহ্মণ’বাদীরা, এলিটরা। যারা মানুষের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়ে, মানুষকে ‘দুর-দুর’ করে নিজেদের ‘ঊনমানুষ’ করে তুলেছেন। তাদের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা, ফুঁকো-চমস্কি আওড়ানোটা ভড়ং। তারা মূলত নিজেদের ‘অব্রাহ্মণ’ পরিচয় মুছে ফেলার জন্যই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যারিকেচার করেন। নিজেকে ‘ব্রাহ্মণ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। অথচ সেই ক্যারিকেচার যে তাদের উজবুক প্রমান করে, মূর্খতাকে প্রকট করে তোলে তা তাদের অজ্ঞতা এবং অজ্ঞাতেই থেকে যায়। 

পুনশ্চ : ঢাকায় একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘শুক্কুর শুক্কুর দুই শুক্কুরবারে ঢাকা আইসাই ঢাকাইয়া হওন যায় না।’  

ফুটনোট : ভিপি নূরকে প্রমোট করার জন্য এই লিখা না। বরং নূরকে ঘিরে কথিত ‘এলিট’দের ক্যারিকেচার তুলে ধরার জন্য লেখা। সামাজিক মানুষ থেকে ক্রমাগত অসামাজিক হয়ে ওঠার বিরুদ্ধে লেখা। 

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ব্রাহ্মণ বুদ্ধিবৃত্তি

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1086 seconds.