• ০৪ জুলাই ২০২১ ১৬:৩৬:৩৪
  • ০৪ জুলাই ২০২১ ১৬:৩৬:৩৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নেই!

ছবি : সজীব ওয়াফি

রাজনীতি করবেন রাজনীতিবিদেরা। যারা রাজনীতি করবেন তাদের সমাজের কাছে দায়-দায়িত্ব আছে। দায় আছে স্থানীয় মানুষের প্রতি। একজন রাজনৈতিক তার এলাকায় যাবেন, গ্রামগঞ্জের মানুষের সাথে মিশবেন, অংশীদার হবেন সুখে দুঃখের। অথচ দিনে দিনে আমাদের রাজনীতি গিয়ে ঠেকেছে আমলাদের হাতে, ব্যবসায়ীদের কাছে হয়েছে কোনঠাসা। দুর্নীতিও এমনভাবে গ্রাস করেছে যে কানাগলির এই পথ থেকে বের হওয়া মুশকিল।

৭৫-এর পরপর আমাদের রাজনীতি নির্ধারণ হয়েছে ক্যান্টনমেন্টে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন কর্মকর্তা রাজনীতি করতে পারেন না, কারণ তিনি রাষ্ট্রের কর্মচারী। নব্বইয়ের দশকে যেটা ব্যবসায়ীতে রূপ নিয়েছে। যার যতবেশি টাকা তিনি নমিনেশন পেয়েছেন। পরবর্তী সরকারগুলো সেখান থেকে আর ফিরতে পারেননি। অথচ ষাটের দশকে আমাদের রাজনীতির কি উজ্জ্বল অতীত ছিলো।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যের ১৮২ জন ব্যবসায়ী; যা মোট সাংসদের ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র ৩ জন বাদে মহাজোটের ১৭৪ জন এবং ৫ জন ঐক্যফ্রন্টের। এসএসসি পাশ পর্যন্ত করেনি এমন সাংসদ আছেন ১৩ জন। জাতীয় সংসদের আলোচনা অংশ নিয়ে দেখে দেখে পড়তে না পারার অপমানজনক অবিজ্ঞতা আছে তাদের। অভিযোগ আছে নির্বাচিত হয়েছেন সরকারি বেতনভুক্ত কর্মকর্তারা। এই হল আমাদের রাজনীতির সর্বোচ্চ হাউসের অবস্থা, যারা রাষ্ট্রের জন্য করেছেন আইন প্রণয়ন!

করোনা মোকাবিলায় দেশের ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন সচিবকে দায়িত্ব দিয়ে গত এপ্রিল মাসে আদেশ জারি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। জেলাওয়ারি স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি কার্যক্রম সমন্বয় নিশ্চিত করতে তারা নেতৃত্ব দিবে। এর আগেও আমলাদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে নেয়া 'মুজিব বর্ষের' অনুষ্ঠান এবং সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালায়। এমনকি বিভিন্ন নির্বাচনে সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেওয়া নিয়েও সমালোচনা আছে। যে কাজগুলোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিলো রাজনীতিবিদদের।

রাজনৈতিক নেতৃত্বদের একটা নির্ধারিত স্থান আছে। নির্বাচিত হয়ে তারা প্রজাতন্ত্রের সংসদে জনগণের কথা বলেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেই প্রজাতন্ত্রের গোলাম, মালিক হচ্ছেন জনগণ। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে গোলাম কখনোই নির্বাচিত সাংসদের উপরে হবেন না। বাড়ির মালিকের চেয়ে যখন তার কর্মচারীকে প্রাধান্য দেয়া হয় তখন আপনাআপনি জটিলতার জন্ম নেবে। ঘটনাক্রমে বাড়ি হাতছাড়ার উপক্রম হবেই। এতকিছু বোঝার পরেও কেন আমাদের আমলাতান্ত্রিক নির্ভর হতে হল?

রাজনীতিতে ব্যবসায়িক চিন্তা চেতনা ঢুকেই ক্রমে ক্রমে রাজনীতি বিষিয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে দুর্নীতিগ্রস্থ। স্বচ্ছতা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতেই কি এই আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা? জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কেন জনগণের দুঃখে পাশে দাঁড়াবেন না! জনপ্রতিনিধি মানুষের হয়ে দাঁড়ালে জনগণ সাহস পায়। রাজনৈতিক ব্যক্তির কাজ আমলানির্ভর হলে রাজনীতিবিদদের জনগণ থেকে দূরে সরতে হবে নিশ্চিত। 

রাজনীতির আতুরঘর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলো। ছাত্র সংসদ থেকে নির্বাচিত ছাত্র নেতারাই পরবর্তীতে রাজনৈতিকাঙ্গনে ভূমিকা রাখার কথা। ব্যবসায়িক সাংসদেরা সেই পথ বন্ধ করেছেন তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই। আমলারা তাতে সমর্থন যুগিয়েছেন। তারা জায়গা করে দিচ্ছেন তাদের ছেলে মেয়েদের। ব্যবসায়ী বা আমলা কখনোই আত্মত্যাগের চিন্তা করতে পারেন না। দিন শেষে লাভ লসের সওদা করে ঘরে ফিরবেন এটাই তাদের জন্য স্বাভাবিক। এভাবে চলতে থাকলে রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

জনগণ থেকে জনপ্রতিনিধি বিচ্ছিন্ন করতে পারলে রাষ্ট্র দখল করা যায় সহজেই। অতীতে রাষ্ট্র দখলদারদের আমরা দেখেছি। আমাদের রাজনীতিবিদেরাও সে পথেই হাঁটছেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দিয়ে ম্লান হয়েছে রাজনীতি। পুঁজিবাদের চূড়ান্ত পর্যায়ের রূপ ধরার অপেক্ষায় পৌছেছে বাংলাদেশ। 

ব্যবসায়ী হলেই রাজনীতিবিদ হওয়া যাবে না এমনটা না। ব্যবসায়ীও রাজনীতিবিদ হতে পারবেন, তবে তাকে হতে হবে পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। লাভ লোকসান ব্যবসায়ের হিসাব এখানে করা যাবে না। আমলাও তার কামলা পর্যন্ত উপর্যুক্ত। অথচ ব্যবসায়ী- আমলানির্ভর যে বাংলাদেশ আমরা পেতে যাচ্ছি, তার ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্কর। এর পরিণতি হাড়ে-মজ্জায় ভোগ করতে হবে জনগণের। 

সজীব ওয়াফি, রাজনৈতিক কর্মী ও বিশ্লেষক 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

রাজনীতি রাজনীতিবিদ

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0570 seconds.