• ১৫ জুলাই ২০২১ ১৮:৩৯:৩৯
  • ১৫ জুলাই ২০২১ ১৮:৩৯:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

কিছু ব্যতিক্রম এবং বেঁচে থাকার আশা

ছবি : কাকন রেজা

কাকন রেজা :
কিছু ব্যতিক্রম সত্যিই আশা জাগানিয়া। জানি, ব্যতিক্রম উদাহরণ নয়, তবুও ইতিবাচক কিছু ব্যতিক্রম খড়কুটো’র মতন আশা বাঁচিয়ে রাখে স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষের মনে। আর আশাটা জাগিয়ে রাখা পৃথিবীর এ ক্রান্তিকালে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য খুব দরকার। এমনি দু’একটি আশা জাগানিয়া ব্যতিক্রমের কথা বলি। 

সাংবাদিক তৌহিদ জামানের সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করা একটি লেখা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তার কথা জানতে পারলাম। যিনি দক্ষিণ এশিয়ার ‘স্যার সিনড্রম’ এর বিপরীত ধাঁচের মানুষ। মানুষ যেখানে পুলিশকে স্যার ডাকতে অভ্যস্ত। অভ্যস্ত তাদের বেশিরভাগের ধমকধামকে। সেখানে সেই পুলিশ কর্মকর্তা মানুষকে উল্টো স্যার ডাকেন এবং কথা বলেন শ্রদ্ধার সাথে। শুধু তাই নয়, ধারার বিপরীতে তিনি বলেন, ‘আপনাদের টাকায় আমার বেতন হয়। আমি আপনাদের কর্মচারি, আপনারা নন। তাই আমাকে ভাই বলে ডাকবেন’। অদ্ভুত না? এই কর্মকর্তা হলেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে কর্মরত এএসপি আনোয়ার হোসেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। কারণ এমন ব্যতিক্রমে আমরা অভ্যস্ত নই। কিন্তু তৌহিদ জামান আমার জানামতে না জেনে কোনো কথা লিখেন না। সুতরাং তার প্রতি বিশ্বাস রেখে আশা করছি, এই ব্যতিক্রম ক্রমেই উদাহরণে পরিবর্তিত হবে। 

অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন। নানা কাজে মানুষ তাকে চেনেন। বিশেষ করে মজলুমের পক্ষে কথা বলা একজন মানুষ হিসেবে পরিচিত তিনি। সৃষ্টিশীল মানুষ। বিশ্বাস বামপন্থায়। সক্রিয় তাতেই। কিন্তু এই মানুষটিই কিউবার বর্তমান আন্দোলনের সমর্থনে কথা বললেন। বললেন, ‘কিউবার আপামর মানুষ ৬০ বছরের একনায়কতন্ত্রের শেকল ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছেন।’ অর্থাৎ যেখানে দেশের সিংহভাগ একদর্শী বামেরা গণমানুষের এই আন্দোলনকে অ্যামেরিকার ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করছেন, সেক্ষেত্রে সত্যিই ব্যতিক্রম সেলিম রেজা নিউটন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষকের এমন স্ট্যান্ড সত্যিই আশা জাগায়। এই ব্যতিক্রমও যেন একদিন উদাহরণ হয়ে ওঠে। বিশ্বের সকল একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাই যেন জেগে উঠতে পারে কিউবার জনগণের মত। বুঝে উঠতে পারে, সমাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের দোষ নয়, দোষ হলো প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রেণের ক্ষমতা যাদের হাতে। 

কিউবা নিয়ে নানা ‘মিথ’ চালু আছে বামপন্থীদের মধ্যে। কিউবা’র স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা নিয়েও এই করোনাকালে শুনেছি বামেদের স্তুতিবাক্য। মুশকিলটা হলো একটা খণ্ডিত চিত্র নিয়ে পুরো চিত্রটাকে সেই খণ্ডনের আকারে মূল্যায়নে। আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপির মতন দলগুলোর কাছে স্বৈরাচার হিসেবে আখ্যা পাওয়া এরশাদের অনেক ভালো কাজ রয়েছে। কিন্তু সেই ভালো কাজে কি এরশাদের আখ্যার সামগ্রিক দৃশ্যচিত্রটা পাল্টে যায়? যায় না। তেমনি এক স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা কিউবার সামগ্রিক বিপর্যস্তাকে ঢাকতে পারে না। 

কিউবার খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা আর করোনাকালে চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন বিষয় মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে। যা কিউবার স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার মিথকেও দিয়েছে গুড়িয়ে। দীর্ঘদিন শাসকদের জুলুম সয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ ছিলোই, এখন সেই ক্ষুব্ধতা বিক্ষুব্ধতায় রূপ নিয়েছে। সঙ্গতই মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। দুয়ারে যখন মৃত্যু এসে দাঁড়ায়, তখন মানুষ ভয় জয় করে রাস্তায় নেমে আসে। আসা উচিত। না হলে ভয়ে ভয়েই তাদের মরার আগে মরে যেতে হয়। 

কিউবার মানুষের সাথে যারা কথা বলেছেন, তারা এমন আভাস কিউবানদের ভাষ্য থেকে দীর্ঘদিন যাবতই দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু মুশকিল হলো আমাদের দেশের সিংহভাগ বামেদের ক্ষেত্রে, তারা এতটাই ডগমায় আক্রান্ত যে, সেসব কোনো কথাই তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। সবই হাতের ঝাপটায় উড়িয়ে দিয়েছেন। যা তাদের উপলব্ধির ব্যর্থতাই প্রমান করেছে বারবার। তবে এরমধ্যে ব্যতিক্রম হলেন সেলিম রেজা নিউটনের মতন মানুষেরা এবং কিছু বামপন্থী তরুণ। যাদের চিন্তা গতানুগতিকতাকে অতিক্রম করে সার্বজনীন হওয়ার চেষ্টায় রত। 

বাংলাদেশে বামদের বিপরীতে রয়েছে ইসলামপন্থীরা। সাপে-নেউলে সম্পর্ক যাদের মধ্যে। বাম ও ইসলামিস্টদের মধ্যে সবকিছুতে কন্ট্রাস্ট থাকলেও মিল রয়েছে ওই একটি জায়গাতেই। তারাও রাজনীতির ক্ষেত্রে ডগমাটিক। মতান্ধ। ইসলামে মজলুম শব্দটার উপর অসম্ভব রকম জোর দেয়া হয়েছে। আর মজলুম শব্দটিকে ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত করে দেয়নি। ইসলাম সব নির্যাতিত মানুষকেই মজলুম বলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির ধারায় অনেক ক্ষেত্রেই সেই চিন্তা অনুপস্থিত। 

মাওলানা ভাসানী সেই মজলুমদের কথাই বলেছেন। মানুষটি সে সময় চিন্তায় কতটা আধুনিক ছিলেন, এখন তা ভাবার নয় আত্মস্থ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আজকের অনেক ইসলামিস্টরা নিজ ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে আর কাউকে মজলুম মনে করেন না। যার ফলেই, তারা নির্যাতিত হলেও বিপরীত দিক থেকে একই ডগমা দেখতে পাওয়া যায়। তবে ব্যতিক্রম ইসলামিস্টদের মধ্যেও রয়েছে। কিছু তরুণ ইসলামিস্ট মজলুম শব্দটিকে সত্যিকার ইসলামের পরিভাষাতেই দেখতে শুরু করেছেন। তাদের কাছে মজলুম মানে সার্বিকভাবেই মজলুম। যার কথাও সেলিম রেজা নিউটন বলেছেন। এই ব্যতিক্রমও আশা জাগায়। যে আশা জেগে উঠার উদাহরণ সৃষ্টির। মৃতপ্রায়দের বেঁচে ওঠার আশা।  

জানি, আমি যা লিখছি সে চিন্তার সাথে কিছু লোকের মিল রয়েছে। সাংবাদিক মুশফিক ওয়াদুদ তাদের একজন। আমি লেখার পর তার লেখা নজরে এলো। তিনিও অনেকটা আমার মতনই চিন্তা করেছেন কিংবা আমি তার মত। সে যাই হোক, কে কার মত সেটা হলো বিভাজন। চিন্তার মিলটাই বড় কথা। যদিও এখন এমন মিলের সংখ্যা অল্প। সে হিসেবে এই চিন্তা এখনো ব্যতিক্রম, উদাহরণ নয়। তবে এই ব্যতিক্রমটাই হয়তো আশা বাঁচিয়ে রাখবে। অসম্ভব নয়, একদিন হয়তো এই ব্যতিক্রমই উদাহরণে পরিণত হবে। 
কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বেঁচে থাকা

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0682 seconds.