• ০৮ আগস্ট ২০২১ ১৫:০০:৩৫
  • ০৮ আগস্ট ২০২১ ১৫:০০:৩৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘পরীমনি’র অপরাধ ও আমাদের ভুলগুলি

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

আলাপ শুরু করার আগে, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে এই আলাপ থেকে আলাদা করে রাখি। তার আগে, যারা কথায় কথায় রাষ্ট্র এটা, রাষ্ট্র ওটা করেছে বলে আহাজারি করেন, তাদের বলি। রাষ্ট্র বিষয়টা বোধহয় আপনারা ভুলতে বসেছেন, ছোটবেলার অনেক পড়ার মতন। রাষ্ট্র একটা কাঠামো মাত্র। যা তার নাগরিকরা তৈরি করেন। সেই কাঠামোর মধ্যে কতগুলি মূর্তি থাকে, সেই মূর্তি হলো রাষ্ট্র ক্ষমতা। রাষ্ট্র হলো অনেকটা বিস্কুটের সেলোফিন প্যাকেটের মতন। বিস্কুট ধরে রাখে। কাঠামোটা তাই মূর্তিগুলো ধরে রাখার জন্য। এখানে কাঠামোর কোনো কাজ নেই, কাজ মূর্তিগুলোর। আবার বলি, নিচের আলাপ এই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে বাইরে রেখেই। 

প্রথমত আসি এখনকার বার্নিং ‘পরীমনি’ ইস্যু বিষয়ে। তার আগে নাগরিকের প্রয়োজন ও স্বার্থের ব্যাপারটি একটু বলে নিই। নাগরিক শব্দটির সাথে মৌলিক অধিকারগুলো জড়িত। গুরুত্বের দিক থেকে প্রধানতম অধিকারগুলো হচ্ছে, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। যারা পরীমনি নিয়ে বিচিত্র ধরণের চেচামেচি করছেন তাদের কাছে প্রশ্ন, নাগরিকের এই প্রধানতম অধিকারগুলোর কোনটার সাথে ‘পরীমনি’ বিষয়টি সম্পৃক্ত? সোজা উত্তর, একটাও না। নাগরিকের প্রধানতম প্রয়োজনের সাথে যে বিষয় সম্পৃক্ত নয়, সে বিষয় গণমাধ্যমের এতটা মনোযোগ কীভাবে পায়? প্রশ্নটা ফেলে দেবার নয়। 

এখন আসি, ‘পরীমনি’ বিষয়টির দাপটে কোন কোন জরুরি বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে গেলো। ‘ডেইলি স্টার’র বাংলা অনলাইন ভার্সন একটি প্রতিবেদন করেছে, করোনা টিকার কেনা, টিকার সঠিক সংখ্যা এবং মূল্য নিয়ে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, এই যে বিপুল সংখ্যক টিকার কথা বলা হচ্ছে, তা সত্যি কিনা সে বিষয়ে। গণটিকার প্রথম দিনের হ-য-ব-র-ল অবস্থা আমরা দেখেছি। ‘মানব জমিন’ গণটিকাকে একটি খবরে গণহয়রানি বলে আখ্যা দিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, হাসপাতালে আইসিইউ তো দূরের কথা সাধারণ শয্যাও নেই। অথচ শয্যা বাড়ানোর, হাসপাতাল প্রস্তুত করার জন্য এক বছরের বেশি সময় পাওয়া গিয়েছিলো। পুরো সময়টাই একধরণের অপচয় হয়েছে। 

চিন্তা করে দেখুন এগুলো সবই নাগরিকদের বেঁচে থাকার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু এসব বিষয়ের চেয়ে ‘পরীমনি’ হয়ে ওঠেছে মুখ্য। এই মুখ্যতা একধরণের মূর্খতা নয় কি? 

ধরুন, একটা অশুভ বলয় এই স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। তারা কি ‘পরীমনি’ বিষয়ক ঘটনার উপর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে না? মৌ, পিয়াসা, হেলেনা, পরীমনি, চয়নিকা চৌধুরী পরপর এসব ঘটনার মধ্যে দিয়ে ব্যস্ত থাকছে না খবরের মাধ্যমগুলো এবং ব্যস্ত রাখা হচ্ছে না মানুষের চিন্তাকে? এতে কী হচ্ছে, মানুষের চিন্তা সরে যাচ্ছে মূল বিষয় থেকে। যাচ্ছে তো? কেন যাচ্ছে, এই প্রশ্নটাও ভাইটাল। 

দেখেন, কেউ কেউ এরমধ্যে ‘র’, ‘সিআইএ’, ‘মোসাদ’ এর ফ্যাসাদ যোগ করতে চাচ্ছেন। প্রতিটি জনপদেই ডিপ-স্টেটের একটা ব্যাপার থাকতে পারে। আবার ডিপ স্টেট বিষয়ে গুজবও হতে পারে। যেটাই হোক, তা ডিপেই রাখতে হয়। এটা যখন বাইরে আনা হয়, তখন এর মানে দু’রকম হতে পারে, তা হলো একটা ফ্যাক্টরকে সাবধান করা, তারা এক্সপোজড হয়ে গেছে, এমনটা। আরেকটা হলো অন্য ফ্যাক্টরটাকে জানান দেয়া যে, তারা এই সুযোগটা গ্রহণ করতে পারেন। সুতরাং এ বিষয়গুলো এক্সপোজড করার চেষ্টাও প্রশ্নের বাইরে নয়। 

এখন গণমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমের খবর প্রতিক্রিয়া, প্রতিকার বিষয়ে কথা বলি। অনেকে বলবেন, ‘এখানে গণমাধ্যমের দোষ কী, পাবলিক ডিমান্ডের কথা তাদের মাথায় রাখতে হবে।’ এইটা স্রেফ একটা স্থুল প্রশ্ন। এখন তাদের যদি বলি, গুগলে সার্চ করে মানুষ মিয়া খলিফা’র পর্ন বেশি খোঁজে, তবে কি গণমাধ্যমগুলি সেই পর্ন প্রচার করবে? না, নিশ্চিত করবে না। উল্টো এই পাবলিক ডিমান্ডের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এর ক্ষতিকর দিকটা বোঝাতে হবে। সুতরাং যারা কথায় কথায় গণমাধ্যম বিষয়ে পাবলিক ডিমান্ডের কথা বলেন, তাদের ডিমান্ড বা চাহিদা বিষয়টি নিয়ে আরেকটু পড়াশোনা করা দরকার। 

সামাজিকমাধ্যমের কথায় আসি। গণমাধ্যমের খবরের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় সামাজিকমাধ্যমে। গণমাধ্যমের খবর সামাজিকমাধ্যম বাহিত হয়ে অনেকদূর পৌঁছে যায়। অনেক মানুষ সম্পৃক্ত হয়। যা ক্ষতিটাকে আরো বহুগুন বাড়িয়ে দেয়। 

বলতে পারেন, তাহলে কি করতে হবে। কিছুই না, মাওলানা রুমি’র রাস্তা ধরুন। বলুন ‘ইগনোর’ করতে। ‘পরীমনি’ ধরণের ঘটনা যাতে প্রজেক্টে রূপ নিতে না পারে, তার জন্য উপেক্ষাটা হলো সর্বোত্তম অস্ত্র। ‘পরীমনি’ যেসব কারণে গ্রেপ্তার হয়েছে, তার সাথে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জড়িত নয়, অন্তত প্রকাশ্যে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সে অনুযায়ী। সুতরাং এই খবর সর্বোচ্চ একদিনের জাতীয় খবর। পরে বিনোদন পাতার। মদ, জুয়া, যৌনতা এসবকে কখনোই এ জনপদে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। বিশ্বাস না হলে পেনাল কোড ঘেটে এগুলোর শাস্তির মাত্রা দেখতে পারেন। দেখেন মদ খাওয়া ও রাখা, জুয়া খেলা আর পতিতাবৃত্তির কী শাস্তি। আর ব্ল্যাকমেইলিংয়ের যে কথা উঠেছে, তার প্রকাশ্য প্রমান নেই। অন্তত কেউ অভিযোগ করেছেন বলে আমার জানা নেই। 

সুতরাং এই ঘটনা বা ঘটনাগুলো ঘটনার পরিমাপ, পরিধিতে যদি রাখা হতো, তাহলে সব বাদ দিয়ে মনোযোগ ‘পরীমনি’ বিষয়টির দিকে ধাবিত হতো না। মানুষ দু’দিনেই ভুলে যেত। তাদের চিন্তায় আসতো প্রকৃত সমস্যাগুলি, না পাওয়াগুলি এবং সাথে সমাধানের সম্ভাব্য প্রক্রিয়া। অথচ ‘পরীমনি’ বিষয়টি প্রজেক্ট হয়ে উঠলো মানুষকে বিভ্রান্ত করার, পথভ্রষ্ট করার! অদ্ভুত না?

আমাদের বুদ্ধিজীবীদের অবস্থাই ধরুণ। কে জানি বলেছিলেন, আমাদের অধিকাংশ কথিত বা দাবীদার বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি হাঁটুর নিচে। আমার তো মনে হয়, অন্তর্বাসের নিচে। সেই নিচের বিষয়ের যে কোনো কিছুতেই তারা হামলে পড়েন। ‘পরীমনি’র বিষয়ে যেমন পড়েছেন। অথচ তারা যদি বিষয়টিকে রুমি’র ধারণায় উপেক্ষা করে যেতেন, তবে সম্ভবত ‘পরীমনি’ বিষয়টি সঠিক ট্র্যাকে থাকতো। ট্রায়াল হতো, মিডিয়া ট্রায়াল হতো না। অথচ তারাও সেই একই কাজ করলেন। কেউ কেউ আবার বেশি সিমপ্যাথি দেখাতে গিয়ে পরীমনির বিপদ আরো বাড়ালেন। 

আমাদের গণমাধ্যমের অবস্থা জানাতে আরো একটি কেসস্টাডি দিই। সম্প্রতি লকডাউনে ‘প্রেমিক-প্রেমিকা’র বাইক করে যাওয়া এবং তাদের জরিমানা বিষয়ে একটি খবর করেছে একটি টেলিভিশন। খবরে দেখা গেলো দুজন নারী-পুরুষ একটি মোটরসাইকেলে যাচ্ছেন, তাদের থামিয়েছে পুলিশ এবং জরিমানা করেছে। খুব সাধারণ একটা ব্যাপার। লকডাউন ভাঙার অপরাধে জরিমানা। কিন্তু ওই খবরে রিপোর্টার কী করলেন, সেই নারী-পুরুষের পরিচয় বের করে আনলেন। তিনি জানালেন তারা প্রেমিক-প্রেমিকা। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, মোটরসাইকেলে থাকা নারীটি নিজের সম্মান বাঁচাতে পুরুষটিকে স্বামী পরিচয় দিলেন। পুরুষ আবার অস্বীকার করলেন। কী ভয়াবহ লেজে-গোবরে অবস্থা। 

বাংলাদেশে কোন আইনে আছে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী এক বাইকে চড়তে পারবেন না! তাদের কাবিননামা দেখাতে হবে! তারা প্রেমিক-প্রেমিকা হতে পারবে না! এমন হলে তো দেশে বাইক-রাইড বন্ধ হয়ে যাবে। যারা রাইডের কাজ করছেন তাদের না খেয়ে থাকতে হবে। যিনি রিপোর্ট করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগলেন আর সে রিপোর্ট যে টেলিভিশন প্রচার করলো, তারা ও তার কর্তাব্যক্তিরা কি ভেবে দেখেছেন, বাড়ি ফিরে কী অবস্থার মুখে পড়েছিলেন সেই দুই নারী-পুরুষ। আদৌ তারা বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন কিনা। কতটা সামাজিক অসম্মানের মুখে ফেলা হয়েছে তাদের। বলিহারি, এমন রিপোর্টার ও টেলিভিশনের। যাদের মানুষের সামাজিক সম্মানের দিকেও বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা নেই। নেই রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতিও। 

জানি, অনেকে বলবেন, আপনিও তো ‘পরীমনি’ বিষয় নিয়েই লিখলেন। আগাম উত্তরটা দিয়ে রাখি। লেখাটা যে ‘পরীমনি’ প্রজেক্ট নিয়ে নয়, তা বোঝার জন্যও বুদ্ধির প্রয়োজন। আপনি যখন অন্যজনকে প্রশ্ন করবেন, তখন নিজে উত্তরটা জানার পাশাপাশি, বিষয়টার সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। ধারণা না থাকার জন্যই আমাদের এই গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওযা। একা ভেসে গেলেও কথা ছিলো, পুরো জাতিকে নিয়ে ভেসে যাওয়া। যা এক কথায় ভয়াবহ বিপজ্জনক।

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক।   

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

পরীমনি

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0577 seconds.