• ১২ আগস্ট ২০২১ ১৬:২৬:৩২
  • ১২ আগস্ট ২০২১ ১৭:২৬:৫০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করোনা মহামারী প্রতিরোধে বাংলাদেশ

ছবি সংগৃহীত

লেখক : অনুপম সৈকত শান্ত, প্রকৌশলী ও গবেষক

কোন মহামারী-অতিমারীর বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়? যখন সেই মহামারী-অতিমারীটি হয় নতুন কোন ভাইরাসের, যার টিকা তখনও দুনিয়াতে আসেনি, তখন কোন উপায়ে সে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে মানুষ?

মহামারী মোকাবেলার সবচাইতে বড় ও সর্বপ্রথম অস্ত্র হচ্ছে, সেই ভাইরাসকে ভালোভাবে জানা, বুঝা। ভাইরাসটি কিভাবে সংক্রমিত হচ্ছে - মানে পানি, বাতাস, রক্ত নাকি স্রেফ মানুষে মানুষে সংস্পর্শেই সংক্রমিত হচ্ছে, তা কতখানি বা কি মাত্রার সংক্রামক, এর উপসর্গগুলো কি, এর মানুষকে মারার ক্ষমতা কেমন, কারা এই ভাইরাসের সামনে সবচাইতে অসহায়, মানে কোন বয়সের - কোন লিঙ্গের মানুষ বেশি ভার্নারেবল, পূর্বতন বিশেষ বিশেষ রোগের ক্ষেত্রে সেই ভাইরাসের মৃত্যুহার বেশি কি না, আবহাওয়ার সাথে কোন সম্পর্ক আছে কি না, চিকিৎসার ক্ষেত্রে - সরাসরি যেহেতু ভাইরাসকে মারার ওষুধ নেই এবং শরীরের ইম্যুউন ব্যবস্থা কখন ভাইরাসকে পুরোপুরি পরাস্ত করবে তার অপেক্ষা করা ছাড়া যেহেতু উপায় নেই সেহেতু- কোন উপসর্গের কি চিকিৎসা দরকার, ভাইরাসের আক্রমণের পাশাপাশি যদি অন্য কোন জীবানু যেমন ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণের ব্যাপার থাকে, তাহলে তার মোকাবেলায় কোন এন্টিবায়োটিক লাগবে, ভাইরাসের মিউটেশনের অবস্থা কি, নতুন নতুন ভেরিয়েন্ট কেমন সংক্রামক, এদের মারণ ক্ষমতা কেমন ... ইত্যাদি, ইত্যাদি। এসব নিয়ে যত ভালো ধারণা থাকবে, মহামারী মোকাবেলার প্রস্তুতি তত ভালো নেয়া সম্ভব!

এরপরের ধাপ হচ্ছে, এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে যথাসম্ভব ভাইরাসের বিস্তারকে একেবারে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা এবং যারা অসুস্থ হচ্ছে, তাদের সিভিয়ারিটি অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা! একটা ভাইরাসের মহামারী/ অতিমারী যদি দীর্ঘদিন স্থায়ি হয়, সেক্ষেত্রে অনেক বড় বিপদ হচ্ছে- অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাই বা না চাই অনির্দিষ্টকালের জন্যে যেহেতু বন্ধ রাখা যায় না, ফলে ভাইরাসের বিস্তার রোধ এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা - এই দুইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে যায়। ফলে, পরস্পরবিরোধী এই দুই ব্যাপারকে মাথায় রেখে সরকার বাহাদুরকে খুবই সুচারু পরিকল্পনা বানাতে হয়! এক্ষেত্রে, সামান্য ভুলের কোন স্কোপ নেই, ফলে শুরু থেকেই মারাত্মক সাবধান থাকতে হয়, খুবই স্মার্ট মানুষদের পরিকল্পনা সাজানোর দায়িত্ব দিতে হয়, এবং যেহেতু ভাইরাস সম্পর্কে জ্ঞান সবচাইতে জরুরী, সেহেতু এই লাইনে বিশেষজ্ঞদের পরিকল্পনা সাজানোর ও পর্যালোচনার কাজে যুক্ত করতে হয়! আর, যেহেতু এটা একেবারে নভেল বা নতুন ধরণের ভাইরাস, সেহেতু যত স্মার্ট মানুষই হোক, যতই বিশেষজ্ঞরাই এই পরিকল্পনা তৈরির কাজে যুক্ত হোক না কেন, ভুল হবেই। ফলে, ভুল হওয়াটা সমস্যা না, ভুল হবে এই প্রস্তুতি রেখে দ্রুত ভুল ধরতে পারা ও ভুলকে সংশোধন করে নতুন পরিকল্পনা সাজাতে পারা এখানে খুবই জরুরী! কিন্তু, যখন কোন সরকার একটা ভুল করে এবং সেই ভুলকেই কন্টিনিউ করে যায় বা ভুলটা ঢাকতে আরো নতুন নতুন ভুল করে যায়, তার চাইতে ভয়াবহ পরিস্থিতি আর কিছুই হতে পারে না!

আমাদের দেশে সমস্ত ক্ষেত্রের মতো চিকিৎসা ক্ষেত্রেও গবেষণার অবস্থাটা খুব খারাপ হলেও, করোনা ভাইরাসের আক্রমণ যেহেতু বিশ্বজুড়ে হয়েছে এবং আমাদের দেশে কয়েকটা মাস পরে ঢুকেছে, নিজেদের গবেষণা খুব বেশি না থাকলেও- এই ভাইরাসকে নিয়ে গোটা দুনিয়ার গবেষণাই আমাদের সামনে উপস্থিত ছিল, আছে! গোটা দুনিয়ার ডাটা দুনিয়ার যেকোন প্রান্তের মানুষ ইন্টারনেটের বদৌলতে জানতে পারছে! কি হারে আক্রান্ত হচ্ছে, কি হারে মানুষ মারা যাচ্ছে, কোন বয়সের মানুষ সবচাইতে ভার্নারেবল, কোন বয়সের মানুষ সবচাইতে কম ভার্নারেবল, পূর্বতন কোন রোগের ইতিহাস থাকলে অসুস্থতা গুরুতর পর্যায়ে যাচ্ছে - এসব নিয়ে হাজার হাজার গবেষণাপত্র যেমন আছে, সিম্পলি পরিসংখ্যান আকারে লেটেস্ট গ্রাফও অনেকগুলো ওয়েবসাইটে বিনা পয়সায় পাওয়া সম্ভব।

গোটা দুনিয়ায় যত ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স বের হয়েছে, সেগুলোও ওপেন সোর্সড, সাধারণ মানুষ না বুঝলেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাইক্রোবায়োলজি, জেনেটিক্স প্রভৃতি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক, ছাত্রদের পক্ষে জানা বুঝা কঠিন কিছু না। সেসবকে কেন্দ্র করে দুনিয়াজুড়ে হাজার হাজার গবেষণাপত্র যেমন প্রকাশিত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে, ভাইরাসের নানান গতি প্রকৃতি, মিউটেশন, কোন ভেরিয়েন্টের সংক্রমণের হার, মৃত্যুর হার কেমন, কোন দেশে কোন ভেরিয়েন্ট প্রভাব বিস্তার করছে - এগুলোও সাধারণ মিডিয়াতেও পাওয়া যাচ্ছে! আমাদের দেশের জন্যে করোনা সংক্রান্ত বিশেষ বিশেষ গবেষণা খুব অপ্রতুল হলেও, করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে গোটা দুনিয়ার যে জ্ঞান তার সিংহভাগই যেহেতু কমন, মানে গোটা দুনিয়ার জন্যেই প্রযোজ্য, সেহেতু এই ভাইরাসের ব্যাপারে আমাদের জ্ঞানের, অর্থাৎ জানাবুঝার খুব যে বড় ঘাটতি আছে, তা বলা যাবে না!

অর্থাৎ করোনা মহামারী-অতিমারী মোকাবেলার প্রথম যে ধাপ, সেই ধাপটি আমরা নিজেদের কৃতিত্বে না হোক, বিশ্বজ্ঞানের সুবিধা নিয়ে পার করেছি! কিন্তু, এরপরের ধাপ থেকেই বাংলাদেশ আগাগোড়া ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে! শুরু থেকেই একের পর এক ভুল করে যাচ্ছে, কোন ভুল থেকেই শিক্ষা নিচ্ছে না, বরং একই ভুলের পুনরাবৃত্তি বারেবারে করেই যাচ্ছে! আর তারই ফল এখন জনগণ পাচ্ছে, প্রতদিনই ১০-১৫ হাজার আক্রান্ত হচ্ছে (টেস্টকৃত) এবং প্রতিদিনই দুই-আড়াই শ' করে মানুষ মারা যাচ্ছে (টেস্ট না করা করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেশি)!

ছবিঃ বাংলাদেশে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা (সূত্রঃ ওয়ার্ল্ডোমিটারস ডট ইনফো)।

ছবিঃ বাংলাদেশে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা (সূত্রঃ ওয়ার্ল্ডোমিটারস ডট ইনফো)। গত মাসের ৭ জুলাই থেকে মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ এর উপরে। মাঝেখানে ২১ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ এর নীচে নেমেছিল, মূলত ঈদের কারণে টেস্টের সংখ্যাও ঐ কদিন বেশ কম ছিল।

শুরুর দিকের ভুলগুলো কি ছিল? প্রথম ও সবচেয়ে মারাত্মক ভুল হচ্ছে, করোনা মহামারী মোকাবেলার প্রস্তুতি নেয়ার চাইতেও "আমাদের দেশে করোনা নাই" এটা দেখানোর ঝোঁক ছিল মারাত্মক! "দেশে করোনা নাই", এর সাথে পরে যুক্ত হয়েছে "এ দেশে করোনা অত মারাত্মক না", "করোনা ভাইরাস সাধারণ সর্দি জ্বরের মত", "করোনার চাইতেও আমরা শক্তিশালী" ইত্যাদি। এসব দেখানোর জন্যে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে, করোনার টেস্ট না করা। নো টেস্ট, নো করোনা। করোনা না থাকা মানে হচ্ছে করোনা-মৃত্যুও নাই!

দেশে করোনাভাইরাস ঢুকে পড়লে করোনা বিস্তার রোধ করা, করোনায় অসুস্থদের জন্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা - এরকম কোন প্রস্তুতি সরকারের তরফ থেকে ছিল না, যথেষ্ট সময় পেলেও কোনরকম আগাম প্রস্তুতি নেয়ার গরজই দেখায়নি, কিন্তু সমস্বরে সবাই চেচিয়ে গেছে, "আমরা প্রস্তুত", "আমরা ইউরোপ-আমেরিকার চাইতেও প্রস্তুত" এবং যথারীতি "এদেশে করোনা নাই"! এই নাই নাই বলতে বলতেই করোনার ঢেউ এসে লাগলো, করোনার উপসর্গ নিয়ে মানুষ হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটতে লাগলো, অক্সিজেনের সিলিণ্ডারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকলো!

কিন্তু, ১৮ কোটি মানুষের দেশের “আমরা প্রস্তুত” সরকার বছরের উপরে সময় পার করেও দৈনিক এক লাখ মানুষের করোনা টেস্টের ব্যবস্থা করতে পারেনি! প্রথম কয়েকমাস ছিল দিনে কয়েকশ করে টেস্ট! অথচ, ঐ সময়েই জরুরী ছিল বেশি বেশি টেস্ট করে আক্রান্তদের আলাদা করে ফেলা! “এদেশে করোনা নাই”, “করোনা অত মারাত্মক না” – এরকম প্রচারণা মানুষকে সচেতন করা, সাবধান করা, শুরু থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, বিশেষ করে ভিড় ভাট্টা – গেদারিং এড়িয়ে চলা, মানুষের বাসায় বেড়াতে যাওয়া – দাওয়াত খাওয়া- বিয়ে জন্মদিন রাজনৈতিক সমাবেশ জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপনের হিড়িক – এসব কিছু থেকে বিরত থাকা ইত্যাদির পথে ছিল অন্তরায়।

 

শুরুর দিকের আরেক বড় ভুল ছিল, করোনার ঢেউ আছড়ে পড়া ইতালি, আমেরিকা, ইংল্যাণ্ড, মিডল ইস্ট এর সাথে আমরা প্রথমেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারিনি। যারা বিভিন্ন দেশ থেকে এদেশে ঢুকেছে, তাদেরকে বাধ্যতামূলক ১৫ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখিনি। কেবল থার্মোচেকাপ করে জানিয়ে দিয়েছি- করোনা নাই। কোন মুহুর্তে করোনা উপসর্গ না থাকা মানে যে করোনা না থাকা না - এই সাধারণ কমনসেন্সটাও আমাদের কর্তাব্যক্তিদের সে সময়ে ছিলো না!

ফলে, এই জ্বর-সর্দি না থাকা "করোনা নাই" লোকেরাই দেশে গিয়ে গ্রামেগঞ্জে ইচ্ছেমত ঘুরেছে, আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেয়েছে, বিয়ে বাড়িতে গিয়েছে বা নিজেই বিয়েতে বসেছে। সমালোচনার মুখে হাজি ক্যাম্পে ইতালি ফেরত যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো, সেখানে ১৫ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার মতো কোন আয়োজনই ছিল না, কয়েকটা ঘন্টা রাখার সময়েও খাবার দাবার পানি কোন কিছু না দিয়ে গাদাগাদি করে রেখে প্রবাস ফেরত যাত্রীদের অবর্ননীয় দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছে, ফলে স্বভাবতই তারা ক্ষিপ্ত হয়েছে, বিক্ষুব্ধ হয়েছে, সেই তামাশার কথা দেশবাসীকে জানাতে সাংবাদিকরা আবার গাদাগাদি করে সেই খবর সংগ্রহে গিয়েছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেইদিনই নাটক সমাপ্ত সবাইকে যার যার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। মানে, আগে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি যে যার বাড়িতে যেত, এখানে সেই প্লেন এর সব যাত্রীদের একসাথে গাদাগাদি করে নিজেদের মাঝে ও সাংবাদিকদের মাঝে ভাইরাস ভালোভাবে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে সবাইকে বাড়িতে পাঠানো হলো! এভাবেই, আমাদের দেশে ভাইরাসকে ভালোভাবে সর্বত্র ছড়ানো হয়েছে! আর যেহেতু 'নো টেস্ট, নো করোনা' নীতিতে কারোরই "করোনা নাই", ফলে শুরুর ধাপ হিসেবে করোনা আইডেন্টিফাই করে, তাদেরকে আইসোলেট করা, কোয়ারেন্টাইনে রাখা - এসব কিছুই হয়নি! এভাবেই দিনের পর দিন - করোনাকে ইচ্ছেমত ছড়াতে দেয়া হয়েছে!

এরপরে যখন সরকার বুঝতে পেরেছে, করোনা আর কোন রকম নিয়ন্ত্রণের মাঝে নেই, তখন শুরু করেছে লকডাউন! এই লকডাউন ব্যাপারটা একদম প্রথম থেকেই ছিল তামাশার অপর নাম! আজ কঠোর লকডাউন তো কাল শিথিল, স্কুল - সরকারি অফিস বন্ধ তো, শ্রমঘন কারখানাগুলো সব চালু! যখন করোনার ঢেউ পিকের দিকে উঠছে তখন হুট করে শিথিলের ঘোষণা! প্রথমে লকডাউনকে তো লকডাউনও বলা হয়নি, বলেছে ছুটি। আর যায় কোথায়- দলে দলে মানুষ ছুটেছে ছুটি কাটাতে। বাসে বাসে ভিড়, কক্সবাজার থেকে শুরু করে দেশের টুরিস্ট স্পটগুলোতে উপচে পড়া ভিড়!

এরপরে করোনা টেস্ট কিছু বাড়ায়, করোনা আক্রান্তের সংখ্যাও যখন বাড়তির দিকে, তখন মিডলক্লাসের একটু টনক নড়েছে। ছুটি কাটানো শেষ করে, তারা সরকারকে কড়া লকডাউনের আহবান জানানো শুরু করেছে। এদিকে, লকডাউন করে সাধারণ দিন আনে দিন খায় টাইপের মানুষের আয় উপার্জন একেবারে বন্ধ করে দিয়ে, করোনা না ক্ষুধা - এমন এক নির্মম পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছে। লকডাউন সফল করতে, মানে মানুষকে ঘরের মধ্যে রাখতে সবার আগে দরকার ছিল, কাজ হারানো মানুষের খাবারের দায়িত্ব নেয়া, কিন্তু সরকার যেসব প্রনোদন প্যাকেজ ঘোষণা সেখানে গরীব মানুষের জন্যে নামকাওয়াস্তে এককালীন বরাদ্দ রেখে, শিল্প মালিকদের জন্যেই নানা প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে!

 স্বভাবতই, ক্ষুধার কষ্ট মানতে না পেরে খেটে খাওয়া মানুষ লকডাউন উপেক্ষা করে বারেবারে কাজের সন্ধানে বের হয়েছে, তাদের সাথে পুলিশ-মেজিস্ট্রেটের চোর-পুলিশ খেলা চলেছে, এরই মাঝে আবার বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামা গরীব মানুষদের পিঠে পুলিশের লাঠির বাড়ি পড়েছে, লকডাউন নামক সার্কাস দেখতে আসা আর কাজের সন্ধানে বের হওয়া মানুষদের কানে ধরে লাইন করে হাটানো ছবিও আমরা দেখেছি! ঈদের আগে দিয়ে লকডাউন শিথিল করে আবার শপিং মল, মার্কেট খুলে দেয়া হয়েছে, ঢাকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে গাদাগাদি করে গ্রামেগঞ্জে চলে যেতে দেয়া হয়েছে, লকডাউন দিয়ে শ্রমিকদের একবার ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়েছে, তার পরপরেই আবার গার্মেন্টসের জন্যে লকডাউনকে শিথিল করে দিয়ে সেই শ্রমিকদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে ঢাকায় আসতে বাধ্য করা হয়েছে। এ সমস্ত সিদ্ধান্তই করোনাভাইরাসের বিস্তারকে অনেকগুন ত্বরান্বিতই করেছে কেবল!

চিকিৎসার প্রস্তুতির ব্যাপারটা আগাগোড়া ছিল কেবল আওয়ামীলীগের মন্ত্রী-মিনিস্টারের গালগল্পেই। বাস্তবে কোনরকম প্রস্তুতিই ছিল না! শুরুতে তো করোনা হলে কোন হাসপাতালে যাবে, মানুষ সেটাই জানতো না, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে মানুষ পিংপং বলের মত ঘুরেছে।

করোনার চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় দরকার যে অক্সিজেনের, একদম শুরু থেকে সমস্ত বিশেষজ্ঞরা, বিভিন্ন দেশের করোনা চিকিৎসার অভিজ্ঞতা যারা ফলো করেছে তারা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, ইউকে, জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশে কাজ করা আমাদের প্রবাসী চিকিৎসকেরাও অসংখ্যবার সাবধান করেছে, বারবার বলেছে- হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা রাখা, সেন্ট্রালাইজড অক্সিজেনের সরবরাহের ব্যবস্থা করা, পর্যাপ্ত আইসিইউ আসনের ব্যবস্থা করা- ইত্যাদি ছাড়া মানুষকে বাঁচানো যাবে না।

এগুলোর সবই কেবল অরণ্যে রোদন হয়ে থেকেছে, যাদের কানে যাওয়ার দরকার ছিল, তাদের কান অবধি পৌঁছায়নি, আসলে তারা শুনতে চায়নি! অথচ, সারাদেশের করোনা হাসপাতালগুলোতে কেবল এই অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলেই - হাজারে হাজারে মানুষকে বাঁচানো যেত!

এখন বাংলাদেশে যে ঢেউ চলছে, তা হচ্ছে করোনা ভাইরাসের লেটেস্ট মিউটেশন ডেল্টা ভেরিয়েন্ট এর তাণ্ডব। গোটা দুনিয়াই এখন এই ডেল্টা ভেরিয়েন্টের তাণ্ডব সামলাচ্ছে। নেদারল্যাণ্ডসহ যেসব দেশে বেশিরভাগ মানুষকেই টিকা দেয়া হয়ে গিয়েছে, সেখানে মৃত্যুহার একেবারে কমে গেলেও ডেল্টা ভেরিয়েন্টের কারণে সংক্রমণের হারটা এখনো অনেক বেশি।

বাংলাদেশে যেহেতু টিকা দেয়ার হার এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও সবচাইতে কম, ফলে এখানে আমরা এখন মৃত্যুর হারের পিক দেখছি, এবং এবারের পিকটা অনেকদিন ধরেই স্থায়ি হয়ে আছে, মানে পিকে উঠে দ্রুত কমতির দিকে নামার লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না! এই ডেল্টা ভেরিয়েন্ট প্রথম তাণ্ডব শুরু করেছিলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে, এর কারণে ভারত এখন তৃতীয় সর্বোচ্চ করোনা-মৃত্যুর দেশ।

অথচ, সে সময়ে অসংখ্যবার ভারতের সাথে সীমান্ত বন্ধ করার আহবান জানানো হলেও, সরকারের মাথায় সেটা আসেনি! সেই ইতালি, ইউকে, যুক্তরাষ্ট্র, মিডল ইস্ট থেকে প্রথমদিকে যেভাবে করোনাকে দেশে ঢুকতে দেয়া হয়েছে, এবারও একইভাবে ডেল্টাকেও ঢুকতে দেয়া হয়েছে!

তাহলে, করোনাকে আমরা মোকাবেলা করলাম কিভাবে? এখনও বা মোকাবেলা করছি কিভাবে? ভাইরাস সম্পর্কে কি জ্ঞান পেলাম, আর সেই জ্ঞানকে কাজে লাগালাম কিভাবে? খুব অদ্ভুত হলেও সত্য যে, এমন মহামারী মোকাবেলার জন্যে যে যে কাজগুলো করা দরকার ছিলো, ঠিক তার উল্টোগুলোই আমাদের দেশে করা হয়েছে! এবং এখনো তারই ধারাবাহিকতা চলছে। এরকম কিছু উদাহরণ দেখা যাক।

আমরা জানি, করোনা ভাইরাসের সবচাইতে বড় কারখানা হচ্ছে মানবদেহ। করোনা আক্রান্ত মানুষের মাধ্যমেই এই করোনা ছড়ায়। ফলে, করোনা বিস্তার রোধের প্রাথমিক পর্যায়ের মূল ধাপ হচ্ছে, করোনা আক্রান্তদের সনাক্ত করা ও আলাদা করা। অথচ, আমরা সনাক্ত করার পথে না গিয়ে, "করোনা নাই" বলে দিয়েছি। এমনকি হট লাইনে ফোন দিয়ে করোনার উপসর্গের কথা বললেও জবাব এসেছে, করোনা না- সাধারণ সর্দি জ্বর।

আমরা জানি, করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধের জন্যে সবচাইতে জরুরী হচ্ছে, মাস গেদারিং কমানো! ফলে, কর্মক্ষেত্রের যেগুলো শ্রমঘন, সেগুলোকে বন্ধ রাখা, চালু করলেও কয়েক শিফটে শ্রমঘনত্ব অর্ধেক বা এক তৃতীয়াংশ করে ফেলা - এগুলো দরকার ছিল! অথচ, দেখা গেল যেসব অফিস আদালতে চাকুরীজীবী কম, অনেকের জন্যে আলাদা আলাদা ঘরের ব্যবস্থা আছে, চাকুরীজীবীদের বসার জায়গাগুলোতে যথেষ্ট ফাঁকা আছে, সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে, অথচ শ্রমঘন কারখানা, গার্মেন্টসগুলো চালু রাখা হয়েছে।

আমরা জানি, করোনা ভাইরাস খোলা - মুক্ত স্থানে কম ছড়ায় (রোদে বাতাসে তাড়াতাড়ি মারা পড়ে), সেই তুলনায় বদ্ধ জায়গায়, এসি রুমে বেশি ছড়ায়! অথচ, আমরা খোলা জায়গায় বাজার বানানোর চাইতে নানা সুপারশপগুলো বেশি খোলা রেখেছি। মানুষের চলাচলের জন্যে রিকশা, মোটর সাইকেল, সাইকেল - এসব বাহনকেও লকডাউনের আওতার বাইরে রাখিনি, অথচ লকডাউন শিথিল করে নানা সময়ে বাস, এসি বাস চলতে দিয়েছি। খোলা মাঠ-ময়দান থেকে ঈদের জমায়েত সরিয়ে বদ্ধ মসজিদের ভেতরে ঢুকিয়েছি।

আমরা জানি, করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে মূল বিষয় হচ্ছে গ্যাদারিং যথাসম্ভব কমানো। অথচ আমরা লকডাউন শিথিল করে শপিং মল, ব্যাংক এসব স্বল্প সময়ের জন্যে খুলে দিয়ে মারাত্মক ভিড় বাড়িয়েছি। নেদারল্যাণ্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যখন লকডাউন শিথিল করা শুরু করেছে, তখন শপিং মল, সুপারশপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দোকান পাটে- মানুষকে অল্প সংখ্যায় ঢুকতে দেয়া নিশ্চিত করেছে। অনেক জায়গাতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছোট একটা বুকিং দিয়ে ঢুকতে হতো, অনেক সুপারশপে, শপিং মলে নির্দিষ্ট সংখ্যক কাস্টমারের বেশি ঢুকতে দেয়নি, একজন বের হলেই আরেকজন ঢুকতে পেরেছে, তার জন্যে সুপারশপগুলোর বাইরে লম্বা লাইন ছিল (দেড় মিটার দূরে দূরে দাঁড়ানোতে লাইনগুলো আসলেই বিশাল লম্বা ছিল)! আমাদের দেশে হয়েছে উল্টাটা, সব জায়গাতে কর্মঘন্টা যেখানে বাড়িয়ে ভিড় কমানো দরকার ছিল, সেখানে কর্মঘন্টা কমিয়ে ফেলা হয়েছে।

সাধারণভাবেই বুঝা যায়, ব্যাংক খোলা রেখে যদি কর্মঘন্টা কমিয়ে অর্ধেক করা হয়, তাহলে ঐটুকু সময়ের মাঝেই ব্যাংকিং সেবা গ্রহীতারা ভিড় করবে। বাস যদি চালু করতেই হয়, তাহলে বাসের সংখ্যা কয়েকগুন বাড়িয়ে একেক বাসে যাত্রীর সংখ্যা কমিয়ে ফেলা নিশ্চিত করা দরকার! তা না করে যদি বাসের সংখ্যা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে ফেলা হয়, তাহলে একেকটা বাসে মানুষের ভিড় কমার চাইতে আরো অনেক বাড়বে! এই কাজগুলোই আমাদের দেশে আকসার হচ্ছে!

আমরা জানি, করোনা ভাইরাসের সামনে সবচাইতে বেশি ভার্নারেবল হচ্ছে বেশি বয়স্ক মানুষ। যাদের আগে থেকে শ্বাসজনিত অসুস্থতা আছে, যাদের ডায়াবেটিস আছে, যাদের হৃৎরোগ আছে, যারা মোটা তাদেরও গুরুতর অসুস্থ হওয়ার, এমনকি মৃত্যুর আশংকা বেশি! আর, যত তরুণ, যত কিশোর, যত বয়স কম, যারা যত সুস্থ-সবল, তারা তত করোনা ভাইরাসের হাত থেকে মুক্ত! এই জায়গা থেকেই দুনিয়াজুড়ে যেসব পেশায় বয়স্কদের আধিক্য বেশি, সেগুলোকে বন্ধ রাখা হয়েছে, অনেক কর্মস্থলে বয়স্কদের অনেক দায়িত্ব তরুণরা নিয়েছে, বয়স্কদের বাসায় পাঠিয়ে সম্ভব হলে তাদেরকে হোম অফিস করিয়েছে। সবচেয়ে কম ভার্নারেবল হচ্ছে শিশু কিশোররা, ফলে ইউরোপে লকডাউনের মধ্যেও স্কুল-কলেজগুলো খোলা রেখেছে, বা লকডাউন শিথিল করার সময়ে সবার প্রথমে স্কুল-কলেজ খুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশে হয়েছে উল্টাটা! মসজিদের জামাতে, তাবলিগে, ওয়াজে সবচাইতে বেশি ভিড় করে বয়স্করা, অথচ মসজিদে জামাত করে নামাজ, ওয়াজ-মাহফিল এসব বন্ধ করার কোন উদ্যোগ নেইনি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সেই যে ছুটি দেয়া হয়েছে, এরপরে সবকিছুই নানা সময়ে খুলেছে, কিন্তু স্কুল - কলেজ - বিশ্ববিদ্যালয় খোলার নাম গন্ধ নেই! একেকটা বাসার বয়স্করা অফিস আদালতে যায়, কাজে যায়, মসজিদ-মন্দিরে যায়! আর বাচ্চারা বাসায় বসে থাকে, বন্ধু বান্ধবদের সাথে খেলে, আড্ডা দিয়েই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কাটিয়ে যাচ্ছে!

নেদারল্যাণ্ডে বাচ্চাদের স্কুল, মানে প্রাথমিক স্কুল প্রায় পুরো সময়ই খোলা রেখেছে। একদম শুরুর দিকে যখন করোনার প্রথম ঢেউ লাগে, তখন কিছুদিনের জন্যে স্কুল বন্ধ ছিল, এক সপ্তাহের মাঝে সিদ্ধান্ত হয় অনলাইনে স্কুল চলবে। ঐ সময়ে একটা যুক্তি ছিল, এই বাচ্চারা নিজেরা আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ না হলেও তারা তাদের দাদা-দাদি, নানা-নানিদের কাছে যায়, মেশে। ফলে উপসর্গহীন আক্রান্তরাও বয়স্কদের মাঝে করোনা ছড়াতে পারে! কিন্তু, করোনার প্রকোপ একটু কমে গেলে এবং পরে গবেষণায় যখন দেখা গেল যে, করোনায় আক্রান্তদের মাঝে যাদের যত বেশি উপসর্গ দেখা যায়, তারা তত বেশি করোনা বিস্তার করে, ফলে, উপসর্গহীন আক্রান্তদের মাধ্যমে করোনা ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশ কম, তখন বাচ্চাদের স্কুল আবার পুরাদমে শুরু হয়ে যায়, মানে বাচ্চারা স্কুলে গিয়েই ক্লাস করতে থাকে। এরপরেও আরো কয়েকবার করোনার ঢেউ এসেছে, কিন্তু বাচ্চাদের স্কুল আর বন্ধ করা হয়নি।

মাঝারিদের স্কুল, মানে মাধ্যমিক স্কুল এর ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা অর্ধেক করে ক্লাস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে! মানে, অর্ধেক ছাত্রছাত্রী একদিন বাসায় থাকে, বাকি অর্ধেক স্কুলে যায় এবং পরদিন বাসায় যারা ছিল তারা স্কুলে যায় আর আগের দিন স্কুলে যারা গিয়েছিল তারা বাসায় থাকে। লেকচারটা অবশ্য গুগল মিট দিয়ে লাইভ প্রচার করা হয়, ফলে বাসায় যারা থাকে তারাও অনলাইনে ক্লাসে অংশ নিতে পারে! আর, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে মূলত গবেষণার কাজে নিয়োজিতরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, বাকিরা অনলাইন ক্লাস করেছে, অনলাইনে পরীক্ষা দিয়েছে। এখন, সবার টিকা দেয়া হয়েছে বিধায়, পরবর্তী সেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্ত ক্লাস আবার ক্লাসরুমেই হতে যাচ্ছে।

অথচ, বাংলাদেশে কবে স্কুলগুলো খুলবে, কলেজগুলো খুলবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলবে, কবে ছাত্রছাত্রীরা আবার পড়াশুনায় ফিরবে, কবে পরীক্ষা দিবে, পরীক্ষা ছাড়াই গণপাশ দেয়ার তামাশা কবে বন্ধ হবে, কেউই জানে না! ছাত্রছাত্রীদের এভাবে শিক্ষাবিমুখ রেখে করোনা মহামারির কি ঠেকানো হচ্ছে, তা আমাদের সরকারের শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কিছু আমলা ও প্রধানমন্ত্রী বাদে দেশের ও দুনিয়ার কেউ জানে বলে মনে হয় না!

বাস্তবে বাংলাদেশে করোনা মহামারী মোকেবালার নামে তামাশা ছাড়া আর কিছু হচ্ছে না! এখানে আসলেই কোন “করোনা নাই”, আছে শুধু করোনার চাইতেও শক্তিশালী আওয়ামীলীগ সরকার, তার আওল মন্ত্রী, পাতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, তার আমলারা, তার ঠেঙ্গারে বাহিনী! এই শক্তিশালী ক্লাউনদের ঠেলায় জনগণের অবস্থায় ত্রাহি ত্রাহি!

 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0587 seconds.