• ১৫ আগস্ট ২০২১ ২২:২৭:০২
  • ১৫ আগস্ট ২০২১ ২২:২৭:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

মিথ ও সত্যি, নেতা ও অভিনেতা এবং পক্ষ-বিপক্ষ

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা : 

এই জনপদের মানুষ ‘মিথ’ খুব পছন্দ করে। ‘মিথ’ গড়তেও তাদের খুব পছন্দ। ওই যে, কমলাপুরে এক মহিলার কালো ছেলে হলো, তা চট্টগ্রামে পৌঁছে হয়ে গেলো কমলাপুরে এক মহিলার পেট থেকে কালো কাকের জন্ম হয়েছিলো। জন্মের পরেই কাকটি কা কা ডেকে উড়ে চলে গেছে। এই হলো আমাদের বাঙালদের স্বভাব। 

আমার ‘মিথ’ শুনতে ভালোবাসি। ‘মিথ’ গড়তে ভালোবাসি। ‘মিথ’র সাথে বাস করতে ভালোবাসি। আমাদের এই ভালোবাসাবাসি অপরিসীম। আমাদের জেলা শহরে বেশ কয়েকটি জমিদারবাড়ি ছিলো, এখন অবশ্য ছিটেফোঁটা চিহ্ন বাদে আর কিছু নেই। তেমনি এক জমিদারবাড়িতে সন্ধ্যায় গিয়েছি। তখন সেটা সরকারি কলেজের স্টাফ কোয়ার্টার। আমারও তখন কলেজকাল। বাড়িটিতে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারিরা থাকতেন। ঢুকতেই সদর ফটকে একজনের সাথে দেখা। তিনি বললেন, এই ছেলে তুমি ভরসন্ধ্যায় এখানে এসেছে কেন। জানো না এই বাড়ির নাটমহলটিতে ‘উনারা’ আছেন। অশরীরীদের নাম মুখে আনতে নেই বলেই সেই ভদ্রলোক তাদের ‘উনারা’ বলে সম্বোধন করলেন। জানালেন, নাটমন্দিরে সন্ধ্যার পর ‘উনারা’ আসর বসান। ওখানে গেলে নাকি মানুষ ঘোরের মধ্যে পড়ে যায়। আর সেই ঘোর কাটে না। গম্ভীর কণ্ঠে বললাম, কেন দেখতে ‘উনারা’ খুব সুন্দরী নাকি। ভদ্রলোক ভস্ম করে দেয়া দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, এমন ‘বেয়াদব’ ছেলে নাকি আর জীবনে দেখেননি। কী ক্ষুদ্রই না তার জীবনে গণ্ডি। আমাদের যে প্রতিক্ষণে কত প্রকৃত বেয়াদবের সাথে দেখা হয়, তা গায়েবের মালিকই জানেন। 

যাকগে, এই হলো আমাদের ‘মিথ’র অবস্থা। আমাদের নানা কিছু নিয়ে ‘মিথ’ তৈরির প্রবণতা রয়েছে। আধিভৌতিক ব্যাপারগুলো বাদ দিলাম। পীর-ফকির-সাধুও বাদ। কিন্তু ‘মিথ’র আওতায় রয়েছেন একেবারে নেতা থেকে অভিনেতা পর্যন্ত। নেতাদের কথা বলতে চাই না। বললে চাকরি না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। নিরাপদ হলো পরীমনি’র বিষয়ে বলা। সবাই বলছেন। নিরাপদ বলেই বলছেন। কেউ পক্ষে বলছেন, কেউ বিপক্ষে বলছেন। কিন্তু বলছেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে অভিনেত্রী নওশাবা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তারপক্ষে কেউ বলেননি, নিরাপদ ছিলো না বলেই। পরীমনি’র ব্যাপারে বলাটাও মন্দের ভালো। অন্তত বলার চর্চাটা জারি থাকবে। 

তবে মুশকিল পরীমনি’র বিষয়টি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক হয়ে যাচ্ছে। নিজপক্ষের মধ্যেই অন্তর্ঘাতের চিহ্ন ক্রমশ প্রকাশ্য হচ্ছে। পরীমনি’র পক্ষে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের একটা রাজনৈতিক পরিচিতি আছে, বলয় আছে। বিপক্ষে যারা, তারা খোদ রাষ্ট্র ক্ষমতার পক্ষ। আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন তারা। বিষয়টি এখন আইনের হাতে, বিচার সংশ্লিষ্ট। তারা ভালো করেছেন কী মন্দ করেছেন এটা এখন আইন দেখবে। না, এটা আমার কথা শুধু নয়, এর আগে অনেক ঘটনাতেই যারা আজকে পরীমনি’র পক্ষে দাঁড়িয়েছেন তাদের কারো বক্তব্যও ছিলো এমনটা। নওশাবা’র সময় যেমনটা দেখা গিয়েছিলো। দেখা গিয়েছিলো অনেকের ক্ষেত্রেই। 

বলবেন, এর সাথে ‘মিথ’র কী সম্পর্ক? বলছি। দেখেন, সামাজিক মাধ্যমে দু’ধরণের ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে পরীমনি সংশ্লিষ্ট। একপক্ষ পরীমনি’র ভিডিও ও ছবি পোস্ট করে দেখাতে চাচ্ছেন, পরীমনি কতটা খারাপ। এরমধ্যে পুলিশ কর্মকর্তার জন্মদিন পালনের ভিডিওটি রীতিমত আলোড়ন তুলেছে। বিপরীতে পরীমনি দুঃস্থ শিশুদের নিয়ে কেক কাটছেন এমন ছবিও দেখা যাচ্ছে সামাজিকমাধ্যমে। একপক্ষ ডাইনি বলার  চেষ্টা করছেন পরীমনিকে। যে কিনা পুরুষের মাথা চিবিয়ে খেয়েছে। যেন পুরুষগুলি মাথা দিতে চায়নি, পরীমনি জোর করে ধরে ধরে খেয়েছে। পুরুষরা তখন গান গেয়েছেন, ‘রেললাইনে বডি দেব মাথা দেব না’। আরেকপক্ষ চেষ্টা করছেন, পরীমনিকে অ্যাঞ্জেল প্রমান করতে। তিনি দুঃস্থ বাচ্চাদের নিয়ে কেক কাটেন। এফডিসি’র দরিদ্র শিল্পীদের সহায়তা করেন, কোরবানি দেন, ইত্যাদি। এগুলোও কি ‘মিথ’ সৃষ্টির প্রচেষ্টা নয়?

নেতা থেকে অভিনেতা’দের নিয়ে এই যে ‘মিথ’ বানানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা, তার কারণটা কী, এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে এর পেছনে যেটা উঁকি দেয় তা হলো, ক্ষমতা ও অর্থের লিপ্সা। এ দুটো আবার একে অন্যের সম্পূরক, অন্তত আমাদের মতন দেশে যেখানে ‘চোর-বাটপার’রাও সফল হয়ে যায়। এই যে চোর-বাটপার’র সফলতার ব্যাপারটি, তা কিন্তু আমি বলিনি। বলেছেন, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সফল ও সার্থক এ দুটি শব্দের পার্থক্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি এভাবেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। নেতা ও থেকে অভিনেতাদের নিয়ে ‘মিথ’ বানানোর যে প্রতিযোগিতা তার পেছনে সফল হওয়ার চেষ্টাটাই মুখ্য। এই সফলরা যে অনেক সময় কথিত চোর-বাটপারও হতে পারে। তার প্রমান শাহেদ-সাবরিনা-হেলেনা গং’রা। 

চারিদিকে এই ‘মিথ’ তৈরির প্রচেষ্টা, যাদের বোধ আছে ক্রমশই তাদেরকে ভীত করে তুলছে, শঙ্কিত করছে। কারণ, মিথ্যের উপর তৈরি কোন কিছুই টিকে থাকে না। শূন্যের মাজারে ঈশ্বর ঘর বানাতে পারেন, কিন্তু মানুষ পারে না। মানুষের ঈশ্বর হয়ে ওঠার ক্ষমতা নেই, সম্ভব নয়। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0749 seconds.