• ১৫ আগস্ট ২০২১ ২৩:৪০:৩৪
  • ১৫ আগস্ট ২০২১ ২৩:৪০:৩৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় এবং আমাদের ভাবনায়

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

এক সময় যারা সোভিয়েত ও ভারতের চোখে নিজ দেশ ও বিশ্ব রাজনীতিকে দেখতেন, তারা ধাক্কাটি খেয়েছিলেন আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত পালানোর পর। তাদের ধারণাও ছিলো না সোভিয়েতের মতন প্রবল পরাশক্তি তালেবানদের হাতে এমন ভাবে পরাস্ত হতে পারে। তাদের ধারণার সীমাবদ্ধতা যে তারচেয়ে বেশি ছিলো তখনও তারা কল্পনা করতে পারেনি, শুধু ধাক্কাটা হজম করতে সময় ক্ষেপন করেছে। 

ধাক্কার পর তাদের লজ্জাটা সামলানোটা জরুরি হয়ে পড়েছিলো। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া, তারমধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের জন্য। সেই লজ্জাটা সামলাতে তারা অজুহাত তৈরি করেছিলো অ্যামেরিকার সহায়তার কথা বলে। কিন্তু আজ সেই অজুহাতও তাদের বেহাত হয়ে গেলো। এখন তারা কী করবেন? 

না, তারা এখন তালেবানরা কত হিংস্র কত ধর্মান্ধ তা প্রমান করার চেষ্টা করবেন। হ্যাঁ, আমিও স্বীকার করি তালেবানরা ধর্মান্ধ। এখনো করি। এখনো মনে করি তারা ক্ষমতায় আসায় বিশেষ করে নারীদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হবে। তাদের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে। শিক্ষা থেকে শুরু করে সবদিকেই নারীরা পিছিয়ে পড়বে। এখন পর্যন্ত এমনটাই বিশ্বাস আমার। 

তবে এই বিশ্বাসে কোথায় যেন একটু চিড় ধরতে শুরু করেছে। দু’দিনের যা খবর এবং তালেবানদের কার্যকলাপ স্বয়ং পশ্চিমা মিডিয়া থেকেই যেভাবে পাচ্ছি তাতে চিড় ধরাটা স্বাভাবিক। তালেবানদের মুখপাত্র সুহাইল শাহিন বলেছেন, নারীদের সবক্ষেত্রে সমঅধিকার থাকবে। শিক্ষা থেকে কাজ, সবক্ষেত্রেই। শুধু তাদের হিজাবটা পরতে হবে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে তালেবান’দের মনোজগতে কি পরিবর্তন ঘটেছে। তারা বুঝতে পারছেন, টিকে থাকতে হলে, সময়ের সাথে টিউনড হতে হবে। 

সোকল্ড বামপন্থীরা, আর আমাদের তরল সুশীলদের বক্তব্য হলো, তালেবানদের ভয়ে মানুষ সন্ত্রস্ত। মানুষ পালাচ্ছে। ভয়ে ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের আগে ও পরের কাবুলের ছবি তাদের এই বক্তব্যকে অনেকটা ভুল প্রমান করে। স্বয়ং প্রথম আলো একটা ছবি প্রকাশ করেছে, যেখানে তালেবান সৈন্যদের জটলার পাশ দিয়ে ব্যস্ত সড়কে চলে যাচ্ছে গাড়ি, মানুষ, বাইক সব। মোটা দাগে কোথাও থেমে নেই জীবনযাত্রা। যদি ভয়ই থাকতো, তবে তালেবান সৈন্যদের উপস্থিতিতে সেই রাস্তা হয়ে যেত সুনসান। গাড়ি তো দূরের কথা পায়ে হাঁটা মানুষের চিহ্নও দেখা যেত না দূর পর্যন্ত। কিন্তু তা হয়নি। আমার বিশ্বাসে চিড় ধরাটা সেখানেই শুরু। 

অ্যামেরিকা দীর্ঘদিন আফগান সরকারি সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বিশ্বের সেরা প্রশিক্ষণ যাকে বলে। আর তালেবানরা বলতে গেলে স্বশিক্ষিত। তারপরও সংখ্যার দিকে থেকেও তারা নগণ্য। অর্ধলক্ষাধিক। স্বশিক্ষিত ও স্বল্প এই তালেবানদের হাতে এত দ্রুত পরাজয় সঙ্গতই সুশিক্ষিত আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত আফগান বাহিনীর সাথে যায় না। গেলো কেন, প্রশ্নটা এ জায়গাতেই। দৈনিক মানব জমিনের তালেবানদের বিজয় বিষয়ক একটি খবরের নিচে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘সাধারণ মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসা না থাকলে এটা সম্ভব নয়।’

হ্যাঁ, এমন বিজয় জনগণের সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব হয়েছিলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধে। জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসা না থাকলে আমাদের বিজয়ও সম্ভব হতো না। ভারত কেন, সব পরাশক্তি একসাথে সহায়তা করলেও হতো না। জনগণের সমর্থন ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়, জোর-জবরদস্তির মেয়াদ দীর্ঘ হয় না। সুতরাং, তালেবানদের এমন বিজয় আমার বিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে। 

আজকে কেন যেন মনে হচ্ছে, আমরা সবাই সবকিছু দেখেছি অন্যের চোখে। এক সময় সোভিয়েত ফ্যাসিস্টদের চোখে। এখন দেখছি পশ্চিমা ভোগবাদী সমাজের চোখে। এশিয়ার নিজ অংশের রাজনীতি বুঝতে হলে সত্যিকার অর্থে আমাদের নিজেদের বন্ধ থাকা চোখ খুলতে হবে। সবকিছু দেখতে হবে নিজেদের দৃষ্টিতে। বুঝতে হবে নিজেদের চিন্তায়। 

তালেবানরা সবেমাত্র ক্ষমতায় এলো। সময় যাক। সময়ই পরিষ্কার করে দেবে সবকিছু। তবে তালেবানরা আসায়, আর যাই হোক ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতি এই এশিয়ায় ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সময় যাক, এটা নিয়েও লেখা যাবে এবং দেখা যাবে।  

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও লেখক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0683 seconds.