• ১৭ আগস্ট ২০২১ ২০:১১:৫২
  • ১৭ আগস্ট ২০২১ ২০:১১:৫২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আফগানিস্তান ও আমাদের কথিত সেক্যুলারগণ

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

দেশের একটা শ্রেণির পরাশক্তি প্রেম দেখে পুলকিত হচ্ছি। এরা মূলত শক্তির পূজারী। এদের পশ্চাতদেশে লাঠি কিংবা লাথিকেই শাসন বলে বোঝে। সে কিউবা থেকে আফগানিস্তান কিংবা কিমের কোরিয়া, পুতিনের রাশিয়া যেখানেই হোক না কেন। 

আফগানিস্তান থেকে মার্কিনিরা হটে যাবার দুঃখে এদের নানা রকম বেচায়েন কারবার দেখা যাচ্ছে সামাজিকমাধ্যম জুড়ে। তাদের এই আহাজারি দেখেছি সোভিয়েত আফগানিস্তান ছাড়ার পর। নতমুখে সোভিয়েতরা আফগান ভূখণ্ড ছাড়ছে আর এখানের কিছু মানুষ তাদের জন্য মাতম করছে। বলতে গেলে আশুরার মাতমকেও ছাড়িয়ে ছিলো সেই আহাজারির সুর। এখনো তাই। এবার ফেসবুক-টুইটার পেয়ে সেই সুরের শোরটা আরো ভয়াবহ। 

সোভিয়েত যখন ছেড়ে যায় তখন এই অংশটাই এরজন্য পুঁজিবাদকে দায়ী করা শুরু করে। মার্কিনিরা ছেড়ে যাচ্ছে, তাদের হাতের সেই শেষ পাঁচও হাতছাড়া। তাই এখন নারী স্বাধীনতা নিয়ে ব্যাপক চিৎকার চেচামেচি হচ্ছে। বিমান থেকে টুপ করে মানুষ খসে পড়ছে, বিমানের ভেতর গিজগিজে মানুষ, তালেবানদের ভয়ে মানুষ পালাচ্ছে এমন একটা দৃশ্যচিত্র দেখাবার প্রচেষ্টা চলছে। তারা বোধহয় ভুলতে বসেছে তাদের নিজ বিপ্লবী আদ্যপাঠ। খুব সাধারণ লজিকও যে তাদের কথার সাথে যাচ্ছে না, তারা তাও বুঝতে পারছেন না। মার্কিন সৈন্য নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরে সাধারণ আফগানদের ঢোকার অবস্থা নেই। সেখানে যারা গিয়েছে, তারা সবাই ক্ষমতার সুবিধাভোগী, এখন সব ছেড়েছুড়ে পালাচ্ছে। 

যে কোন বিপ্লবের পরে, একদল মানুষ পালায়। কারা পালায়, যারা বিপ্লবের বিপরীত শক্তির সুবিধা নিয়েছে তারা। যাদের জন্য বিপরীত পক্ষের মানুষ নির্যাতিত হয়েছে। সেই নির্যাতিতদের পাল্টা প্রতিশোধের ভয়ে পালায়। বিএনপি ও জোট সরকারের পতনের পর হারিছ চৌধুরীরা পালিয়েছিলেন। অথচ বিএনপি সেই তুলনায় কিছুই করেনি। তবু কিছু সুবিধাভোগী পালিয়েছিলেন। জারের পতনের পর রাশিয়ায় কী হয়েছিলো? চীনে বিপ্লবের পর কী হয়েছে? এগুলো রাজনীতির প্রাক-প্রাথমিক ব্যাপার। এগুলোকে সামনে এনে চলমান বাস্তবতা মুছে দেয়া যাবে না, সম্ভব নয়। বরং এতে নিজের অসহায়ত্ব প্রমান হবে। সেই প্রমানই দিচ্ছেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কিছু কথিত সেক্যুলার। যে সেক্যুলারদের ঘাড়ে চেপে যুগে যুগে নানা নামে, নানা চেহারায় ফ্যাসিজম কায়েম হয়েছে। যে ফ্যাসিজমের পরিধি কিউবা থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত। এরা যে বুদ্ধি ও চিন্তার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে তারই প্রমান এসব আহাজারি। 

তালেবানদের মতন উগ্র ধর্মীয় একটি শক্তি আফগানিস্তানের ক্ষমতায়। যাদের পূর্বের ক্ষমতাকাল ছিলো এক ধরণের বিভীষিকার। ইসলামকে ব্যবহার করে তারা ফ্যাসিজম কায়েম করেছিলো। ফ্যাসিজম নানা ভাবে নানা কায়দায় নানা দেশে বিরাজমান। পূর্বের খারাপ নজিরের পরও পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসার কাহিনি আমাদের জানা, সেই দৃশ্যপট আমাদের চেনা। জেনেশুনে বিষপানের কথা রবি ঠাকুর এটা বুঝেই হয়তো লিখেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। বিশ বছর তালেবানরা যুদ্ধ করেছে। তারাও মৃত্যু দেখেছে, ধ্বংস দেখেছে। বরং তারা আরো বেশি দেখেছে। গুচ্ছ বোমায় তাদের আস্তানার সাথে নিরীহ মানুষের আবাস গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নিজেদের সাথে সাধারণ মানুষের মৃত্যু দেখেছে তারা। একজন তালেবান মারা গেলে, দশজন সাধারণ মানুষ মারা গেছে। সে তুলনায় বিপরীত পক্ষের মানুষ মারা গেছে কম। এই মৃত্যু হয়তো তালেবানদের মধ্যেও একধরণের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছে। তারা কিছুটা হলেও সময়ের সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। 

তালেবানদের মুখপাত্র সুহাইল শাহিনের কথায় পরিবর্তনের আভাস পরিষ্কার। সে বলছে, পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম তালেবানদের এখন কলঙ্কিত করতে চাইছে নারীদের সামনে এনে। তালেবানরা ক্ষমতায় আসার আগেই ঘোষণা দিয়েছে, নারীদের শিক্ষা ও কাজের স্বাধীনতা থাকবে। শুধু হিজাব পরতে হবে তাদের। পোশাকের ব্যাপারেও দেখলাম দেশের কয়েকজন বেচায়েন সেক্যুলার বলছেন, এবার তালিবানরা জোব্বা পরে যাবে হোয়াইট হাউসে। এই টাইপ বেচায়েনদের কী বলি বলুন তো। আরে, নিজেরা তো এখনো লুঙ্গি পরে ঘুমান। বাপ-দাদারাও তাই পরেছেন। লুঙ্গি আমাদের জাতীয় পোশাক। দু’একজন যারা আছেন, তাদের হয়তো স্লিপিং গাউন রয়েছে। মাঝে-মধ্যে পরেন। যখন অন্যদের দেখাতে হয়। রাতে ঘুমাতে গিয়ে অনভ্যাসে নিচের দিক চুলকিয়ে লাল করে ফেলেন। তারাও তালেবানদের পোশাকের সমালোচনা করেন। এরাই আবার ঈদ-পূজায় ‘কাবুলি সেট’ পরিধান করেন। আজব জিনিস মাইরি। 

আফগানরা তাদের নিজস্ব পোশাক পরেন। তালেবানরা আলাদা ইউনিফর্ম বানাননি। এটা তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। বরং বৈচিত্রের ব্যর্থতা রয়েছে ভারতীয়দের। সেলাই বিহীন কাপড়ের ধারণা তার একটি। এক সময় কাপড় কেটে জোড়া দেয়ার কৌশল জানা ছিলো না ভারতীয়দের। এই কৌশলও শিখতে হয়েছে বাইরের মানুষদের কাছে। যেমন, গান-বাজনা সবই ধার করতে হয়েছে তাদের অন্যদের কাছ থেকে। নিজেদের তো কিছুই ছিলো না। আলু-কলা সেদ্ধ ভাত, সেলাই বিহীন কাপড়, খোল আর বীণা ছাড়া। আফগান সংস্কৃতি সে তুলনায় সমৃদ্ধ ছিলো। ইতিহাসের পাঠ অন্তত তাই বলে। সুতরাং তালেবানরা আফগান, তারা আফগানদের পোশাকই পরবে। আর তা পরে যদি তারা হোয়াইট হাউজে যায় সে-তো গৌরবের। কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের মতন অন্তত লজ্জার নয়। 

না, আমাকে তালেবানপন্থী মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং আমি আপনাদের চেয়ে অনেক বেশি চিন্তিত, তালেবানদের ভবিষ্যত কার্যক্রম নিয়ে। তারা যদি না শোধরায় তার ধাক্কাটা আমাদের অঞ্চলেও পড়বে। না শোধরালে এ অঞ্চলের উগ্রপন্থীরা উৎসাহিত হবে। আর যদি শোধরায়, তাহলে উগ্রপন্থীরা চুপসে যাবে। ফিরে আসার চিন্তা করবে সঠিক পথে। কারণ তারা তালেবানদের দ্বারাই অনুপ্রাণিত। অতএব দু’রকম অবস্থার জন্যই এ অঞ্চলের মানুষের বিশেষ করে শাসকদের প্রস্তুতি থাকতে হবে। আমি ‘উগ্রপন্থী’ বলেছি, এরসাথে ধর্ম যোগ করিনি। কারণ উগ্রপন্থায় ধর্ম একটি অনুষঙ্গ। রাজনীতিও এর অনুষঙ্গ হতে পারে। মাওবাদীরা আমাদের আশেপাশেই আছে। উগ্রপন্থীদের উত্থান অন্য উগ্রপন্থীদের উৎসাহিত করবে, আগ্রহী করবে। এটাই ভয়াবহ। বিপরীতে তালেবানরা যদি শান্তির পথে, সঠিক পথে ফেরে, তাহলে এই অঞ্চলে উগ্রপন্থার দীর্ঘমেয়াদি অবসান ঘটবে। 

আমাদের বেচায়েন সেক্যুলারপালের এসব নিয়ে চিন্তা নেই। তারা আছেন, তালেবানরা নারীদের কী করবে, কীভাবে নির্যাতিত হবে নারীরা, এসব নিয়ে। মনস্তাত্বিক দিক দিয়ে বলতে গেলে, এই ভালোমানুষিও ভেতরের লুকিয়ে থাকা ধর্ষকামীতার নজির। যেমন, কেউ কেউ ধর্ষণের খবর পড়তে গেলে, ধর্ষণের বর্ণনায় একধরণের উত্তেজনা বোধ করেন, তেমনটা। এমন মানুষরা যখন ধর্ষণের প্রতিবাদ করেন, তখন বুঝবেন ‘ডাল মে কুছ কালা হায়’। আমাদের যে সেক্যুলারকুল সব বাদ দিয়ে নারী নিগ্রহ আর পলায়ন নিয়ে অতি উৎসাহী তাদেরও ‘ডাল মে কুছ কালা হায়’। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0711 seconds.