• ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০১:৩৬:৩৭
  • ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০১:৩৬:৩৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

খবরের প্রায়োরিটি, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের অবয়ব

ছবি : কাকন রেজা

কাকন রেজা :

গণমাধ্যমের এখন সবচেয়ে ‘বার্নিং’ খবর হচ্ছে, অভিনেতা-নায়ক অপূর্ব’র তৃতীয় বিয়ে, তার সাবেক স্ত্রীর বিয়ে, নুসরাতের বাচ্চার বাবা কে আর পরীমনির মুক্তি। মানুষের মুক্তির কোনো খবর গণমাধ্যমের কাছে এখন ‘ট্র্যাশ’। মানুষকেই তারা সম্ভবত ‘ট্র্যাশ’ মনে করে, কিছু ‘উন-মানুষ’কে ছাড়া। ‘উন-মানুষ’ বিষয়টিকে আবার ‘অমানুষ’ হিসেবে ভেবে নেবেন না। মানে বোঝাতে চেয়েছি মানুষের চেয়ে কিছু বেশি। ওই যে, পুরুষ না হয়েও যারা মহাপুরুষ, তেমন আর কী। 

ব্যাখ্যাটা এভাবেও করা যায়। মানুষকে দুটি ভাগে ভাগ করার সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, ক্ষমতা বা শক্তি। ক্রিয়া ভিত্তিক শব্দার্থ অনুযায়ী, ‘পুর’ হচ্ছে ক্ষমতা বা শক্তি। এটা যার মধ্যে থাকে সেই ‘পুরুষ’। শরীর ভিত্তিক ভাগটা সম্ভবত ‘নর’ ও ‘নারী’। সুতরাং ক্ষমতা ও শক্তি যার সেই পুরুষ। সে নর হতে পারে, হতে পারে নারীও। নিরাপদ উদাহরণ দিতে চাইলে ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরাতে হয়, ঝাঁসির রানীর কথাই বলি। তার ক্ষমতা থাকে ‘পুরুষ’ করে তুলেছে। সে অর্থে যারা কথায় কথায় পুরুষতান্ত্রিকতার কথা বলেন, সেটা স্রেফ সুবিধাবাদের আলাপ। সুবিধা আদায়ের তন্ত্র, মন্ত্রও বলতে পারেন। কারণ, যারা এই মন্ত্র জপেছে তারা সবাই ভালো আছে বিত্ত এবং বৈভবে। কেউ কেউ তো বিদেশে অ্যাসাইলাম বাগাতে এই তন্ত্র জপেন। সফলও হয়েছেন অনেকে। তসলিমা থেকে হালের নারীবাদীদের অনেকেই এর সুবিধাভোগী। 

তসলিমার কথা যখন উঠলোই, তখন তসলিমাকে কী বলবেন? তার কাছে তো অনেক ‘নর’ কুপোকাত। বিছানা থেকে ক্ষমতায়, সব শক্তিতেই তিনি অনেক ‘নর’কেই পেছনে ফেলেছেন। এটা আমার কথা নয় প্রথমটা তার নিজেরই স্বীকারোক্তি। দ্বিতীয়টা তার ফ্যান, ফলোয়াররা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুতরাং ক্ষমতা ও শক্তিতে কেন তসলিমাকে ‘পুরুষ’ বলা যাবে না? –প্রশ্নটা রইলো। 

আবার মূল কথায় ফিরে আসি। গণমাধ্যমের কথায়। একটা দেশের গণমাধ্যমের অবয়ব দেখে অনেক কিছুই আঁচ করা যায়। শুধু রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারস’র তথ্য-উপাত্ত নয়, গণমাধ্যমের নিজ চেহারাই তা বলে দেয়। দেশে জীবন-মরণ সমস্যা থাকতে যখন গণমাধ্যম হামলে পড়ে কার বাড়িতে মদ পাওয়া গেলো, কার বাচ্চার বাপ কে, কোন অভিনেতা তৃতীয় বিয়ে করলেন, তখন বোঝা যায় ‘ডাল মে কুছ কালা হায়’। 

দেশে মদপ্রাপ্তির উৎসের অভাব নেই। বৈধ বা অবৈধ সব ভাবেই সহজে তা সংগ্রহ করা সম্ভব। বিক্রি ও পানের জন্য লাইসেন্সের বাধ্য-বাধকতা থাকলেও তার ধার ধারে না কেউ। সেটার প্রমান ঢাকার সো-কল্ড অভিজাতদের ক্লাবগুলি। আর বাসায় মদের কথা বলতে, এটা এখন অহংকার হয়ে দাঁড়িয়েছে একশ্রেণির নব্য-ধনীদের, কার সংগ্রহের কত দামি ‘ওয়াইন’ রয়েছে; ড্রয়িং রুমের পাশে ‘বার’ আছে কিনা! সুতরাং যারা লাইসেন্স আছে কি নাই, এমন প্রশ্নে আটকে আছেন, তারা মূলত বোকা। 

গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় কাজ হলো উৎস সন্ধান করা। অনুসন্ধান মানেই তাই। আর খবর মানেই অনুসন্ধান। সেটা যত সামান্যই হোক। ঘটনা আর খবরের পার্থক্যটাই এই জায়গায়। একটা ঘটনার প্রচার করা যায়। একটা কিছুর উদ্বোধন, একটা নাটকের পরিবেশনা, সিনেমার মুক্তি এগুলোর সবকিছুই খবর নয়, ঘটনা। যা প্রচারযোগ্য। আর খবর তখনই হয় যখন এগুলোর মধ্যে কোনো অসঙ্গতি থাকে, যার ধারাবাহিকতায় অনুসন্ধান এসে যায়। ঘটনা ও খবর দুটোই প্রচারযোগ্য, শুধু এর অর্থ ও বস্তুগত পার্থক্য চিনতে শেখাই মেধার প্রমান ও যোগ্যতা। 

অনুসন্ধান ব্যাপারটায় আসতে গেলে, বলতে হয়, নায়িকার বাচ্চার বাপ কে তা একটা সমাজ, জাতি বা রাষ্ট্রের জন্য ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা দুটো লঞ্চের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যুতে সেই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা। একটা ব্যাংক ডুবে যাওয়ার পেছনের কাহিনি বের করে আনা। একই ভাবে টিকা কীভাবে বিক্রির জন্য ওষুধের দোকানে গেলো, এর পেছনের চেইন বের করে আনা, নায়কের তৃতীয় বিয়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই যে গুরুত্ব তথা প্রায়োরিটি বিষয়টি যখন গুলিয়ে যায়, ফেলা হয়, তখন বোঝা যায় গণমাধ্যমের অবস্থাটা। বলা যায়, গণমাধ্যম হলো ‘গণ-কেইস’।  

ফুটনোট : বলতে পারেন, এ নিয়ে আগেও লিখেছি, কেন আবার লিখছি। দরোজা খোলার সহজ সূত্রটা বলি, একবার না খুললে আরেকবার ‘নক’ করতে হয়। তাতেও কাজ না হলে ধাক্কা দিতে হয়। তাও ব্যর্থ হলে বারবার ধাক্কা দিতে হয়। পৃথিবীর এমন দরোজা নেই যা বারবার ধাক্কার ধাক্কাটা সামলে নিতে পারে। ফ্যাসিজম যে মুক্তির দরোজা বন্ধ করে রাখে, সেটা খুলতেও ধাক্কার বিকল্প নেই। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

খবরের প্রায়োরিটি

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0723 seconds.