• ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৯:২৫:৪৬
  • ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৯:২৫:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

একটি ছবি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কূটকৌশল তার কারিগররা

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

‘মুসলমান হলেও ছেলেটা ভালো, হিন্দু হলেও মানুষটা খারাপ না।’ এমন বাক্য বা বাক্যসমূহ আপাত নিরীহ এবং প্রশংসাসূচক। কিন্তু এমন নিরীহ প্রশংসার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে ভয়াবহ এক বিভেদের চিন্তা। মানুষের ধর্ম, জাত, বর্ণ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়ে ভাগ করে দেবার ধ্বংসাত্মক কুচিন্তা। 

সম্প্রতি একটা ছবি সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একজন বন্ধুর আরেক বন্ধুর মৃত্যুতে বিষাদক্লিষ্ট অবয়বের ছবি। একজন মানুষ বন্ধুর জানাযা স্থলে বেদনায় নতমুখে বসে আছেন এবং সেই মানুষটি ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু। আর জানাযা হচ্ছে তিনি সঙ্গতই মুসলমান। কিন্তু সেই ছবিটা স্রেফ বন্ধু বিয়োগে শোকার্ত একজন মানুষের। এখানে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় কোনো নির্দেশক নয়, নির্দেশক বন্ধুত্বটাই। অথচ এই ছবিটা সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করে ধর্মীয় চেহারা দেয়া হলো। ওই নিরীহ গোবেচারা মুখে জানানো হলো, এটা হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির ছবি। জানিয়ে দেয়া হলো মৃত বন্ধুটি মুসলান, আর জীবিত জন হিন্দু। ভাগ করে দেয়া হলো বন্ধুত্বকে ধর্মের গণ্ডিতে। যে গাণ্ডুরা এই কাজটি করলেন, তাদের লক্ষ্য সুদুরপ্রসারী। 

তারা এই দেশে ধর্মের ভাগটাকে জিইয়ে রাখতে চান। মানুষকে বুঝিয়ে দিতে চান, সবক্ষেত্রেই তোমরা হিন্দু-মুসলমান। আলাদা মানুষ। এই অসভ্যরাই আমাদের সমাজে সম্প্রীতির বারোটা বাজিয়েছেন। অধিকার আদায়ের নামে আবার কখনো সম্প্রীতি রক্ষার নামে মানুষকে বিভক্ত করেছেন। বিভেদ-বিসম্বাদ, উগ্রতা-উগ্রপন্থা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে শুরু করে সব অপকর্মের মূল হোতা এরাই। 

দীর্ঘদিন ধরে নানা লেখায় এ কথা বলে আসছি। অনেকেই পাত্তা দেননি। অনেকেই এড়িয়ে গেছেন। কেউ মিনমিনে সমর্থন করেছেন। কারো পিছুটান ছিলো কোন বিপদে পড়েন তা ভেবে। কারণ, আমাদের এখানে কথা বলাটাই এখন বিপদের। আহত অনুভূতির প্রাবল্যে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। কার অনুভূতি যে কখন আহত হয়ে যাচ্ছে সেটা বলা মুশকিল। তবে আশার কথা হলো এই ছবিটাকে ঘিরে অনেকেই কথা বলছেন। 

বলছেন, আমি যা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি সেই কথাই। মানুষ হিসেবে চিহ্নিত না করে ধর্মে-বর্ণে-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়ে চিহ্নিত করে দেবার বিরুদ্ধে এবার মুখ খুলেছেন অনেকেই। মঈনুল আহসান সাবের আমার প্রিয় কথা সাহিত্যিক, তিনিও দেখলাম বলেছেন এই বিভাজন প্রক্রিয়ার কুচক্রীদের বিরুদ্ধে। অনেকেই বলেছেন। সাদ রহমান নামে একজনকে দেখলাম সামাজিকমাধ্যমে অল্প কথায় এর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিবাদ করতে। 

আমি তখন সবে স্কুল পেরিয়েছি। কলেজে যাবো। দারুণ জোশে আছি। বন্ধুদর আড্ডা চলছে প্রতিদিন। গান-বাজনাও চলছে। একদিন বিকেলে আমি ও আমার অকালে চলে যাওয়া বন্ধু রতন একসাথে আড্ডা দিচ্ছি। এমন সময় মাইকিং কানে এলো, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান’, এবং আরো বেশ কিছু স্লোগান। দু’জনেই আশ্চর্য হলাম, বুঝলাম না, ঘটনা কী, কীসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সত্যি বলতে সেদিনই প্রথম বুঝতে পারলাম রতন আর আমার মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ আছে। আমরা আলাদা ধর্মের। আমাদের বন্ধুত্বে এ কথাটা কখনো চিন্তাতেও আসেনি, যা সে মাইকিং আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলো। এভাবেই এ দেশে শুরু হয়েছিলো বিভাজনের সুকৌশল প্রচার।

জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, ঈর্ষাকাতরতা এটা ছিলো সামাজিক বিষয়। কিন্তু সেই ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান’- এমন প্রচার সবটাকেই সামাজিক থেকে ধর্মীয় গণ্ডিতে বেঁধে দিলো। আমরা মানুষ থেকে, প্রতিবেশী থেকে, বন্ধু থেকে হয়ে উঠলাম হিন্দু-মুসলমান। আর যারা এই কাজটি নিরীহ-গোবেচারা মুখ করে গেলো, তারা হয়ে উঠলেন ‘নেপো’। আর মাঝখান থেকে ‘দই মেরে’ যেতে লাগলেন! কেউ ‘ইয়ে’ হলেন, কেউ নেতা হলেন, কেউ অ্যাসাইলাম নিলেন, কেউ এনজিও করলেন। প্রত্যেকে এক একটা কুতুব হয়ে উঠলেন। ওহ, ‘ইয়ে’ শব্দটা নিয়ে বলি। এটা হলো নিরাপত্তাজনিত একটি শব্দ, যা বললে পোলাপানের ভাষায় ‘চাকরি থাকবে না’ তার বিকল্পে লেখা। রফিক আজাদ যেমন বলেছিলেন, লাথির বিকল্পে লেখার কথা, তেমন আর কী।

ধর্মকে মানুষ ব্যবহার করেছে যুগে যুগে সুবিধাবাদের কৌশল হিসেবে। না, শুধু ধর্ম নয় যেখানে যেটা দরকার সুবিধাবাদীরা সেটাকেই ব্যবহার করেছে। দেখুন পরীমনি কাণ্ডে। একদল বলা শুরু করলো পরীমনিকে ধরা হলো তাহলে অমুক নায়িকাকে, অমুক মডেলকে ধরা হলো না কেন? অমুকের বাসাতেও মদ পাওয়া যাবে, তাকে ধরা হলো না কেন? অর্থাৎ একটা ঘটনায় অন্যজনকে ফাঁসিয়ে দেয়ার চেষ্টা। এটাও সুবিধাবাদ। পুলিশ কমিশনার স্বয়ং জানালেন, অনেকেই পুলিশকে জিজ্ঞেস করছেন, বাড়িতে থাকা যাবে কিনা! কী অদ্ভুত কথা। স্বয়ং মিডিয়ার একটা অংশ নেমে পড়লো এ নিয়ে সুবিধা আদায়ে। অর্থাৎ সুবিধাবাদীরা যেখানে যা পায় তাই দিয়ে তাদের সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে। সেটা ধর্ম হোক আর পরীমনিই হোক। তবে ধর্মের পরিধিটা বড় এবং কার্যকর বলেই ধর্মটা সহজ টার্গেটে পরিণত হয়। আর এর ফায়দার পরিধিটাও বড়। ব্যক্তি সুবিধা থেকে রাজনৈতিক সবই আদায় করা যায় এথেকে। তাই ধর্ম হয়ে দাঁড়ায় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক কূটকৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। আর এর কুশীলব যারা আছেন, তারা পর্দার আড়াল থেকে খেলে যান। আর সামনে থাকে ছ্যাচড়া সুবিধাবাদীরা। যাদের অন্যকথায় মাঠকর্মীও বলতে পারেন।

মাঠকর্মীদের বিষয়ে আসি। কোথায় পাবেন না এসব মাঠের কর্মীদের। সাহিত্য-সংস্কৃতি-ক্রীড়া থেকে শুরু করে যাত্রামঞ্চ সবখানেই এদের দেখা মেলে। প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ভাষায় এরা বিভিন্ন ‘দোকান’ খুলে বসেন। সাহিত্যের ‘দোকান’, সংস্কৃতির ‘দোকান’, সামাজিক আন্দোলনের নামে ‘দোকান’ কী নেই। সব ধরণের দোকান রয়েছে। আর এই দোকানদাররা একটা সুযোগ পেলে এবং ‘উপরে’র নির্দেশ পেলে কাজে নেমে যান, বাক্স খুলে বসেন। আলাপ তোলেন সাম্প্রদায়িকতা রোখার। বিপরীতে রাজনীতির কূটকৌশল না বোঝা মূর্খ আর অর্ধশিক্ষিত একশ্রেণির ধর্মান্ধ বা বকধার্মিকেরা তো আছেনই। সুতরাং লেগে যায় ক্যাওয়াজ। যেটা কখনো সংঘাতেও গড়ায়। আর এ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলেন আড়ালের কুশীলবরা, আর অর্থনৈতিক ফায়দা লোটেন সেই ‘দোকানি’ মাঠকর্মীরা।

সহজ কথায় এই হলো প্রসেস। এর বাইরে খুব একটা কিছু নেই। এর বাইরের কথা যারা বলেন, তারাও সেই দোকানি, মাঠকর্মী। অতএব এদের থেকে সাবধান। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0668 seconds.