• ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৭:৫৩:৪৯
  • ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৭:৫৩:৪৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

দেশের সমস্যার চেয়ে তালেবান কিংবা নায়িকার সন্তানের পিতৃপরিচয় কি জরুরি?

কাকন রেজা। ফাইল ছবি

কাকন রেজা :

দেশে তেমন গুরুতর সমস্যা রয়েছে বলে ইদানিং আমার মনে হচ্ছে না। কারণ বুদ্ধিজীবীদের লেখাজোঁকা। সাধারণত দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গণমাধ্যমে আলোচনা তোলেন দেশের সমস্যা এবং তার সমাধানে। সে হোক প্রবন্ধ কিংবা হালের টক-শো নামক টেলিভিশন আলোচনায়। হালে এসব শুনে মনে হচ্ছে, আমাদের দেশের সমস্যার চেয়ে বুদ্ধিজীবীগণ আফগানিস্তান নিয়ে বেশি চিন্তিত। যেন আফগানে তালেবান শাসন কায়েম হওয়ায় আমাদের বারোটা বাজতে চলেছে। 

অথচ, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তালেবান শাসন ছিলো আফগানিস্তানে। আমাদের দেশেও বর্তমান সরকারই আসীন ছিলেন। সে সময় কিছু কি হয়েছে? না, হয়নি। বাংলাদেশ দেশ আফগান হয়ে যায়নি, বকধার্মিকদের স্লোগানে। এবারের তালেবান শাসন সে সময়ের কট্টরতার ধারেকাছেও নেই। থাকলে নারীরা রাস্তায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারতো না। সাহসই পেতো না। কিন্তু এবার সেই প্রতিবাদের সাহস রয়েছে। আর বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ভিন্ন। কিন্তু তারপরেও আমাদের বুদ্ধিজীবীদের প্রধান চিন্তা তালেবান শাসন। 

যখন লিখছি, তখন গণমাধ্যমে দেখলাম, রাজধানীর উত্তরা থেকে এক ব্যক্তি আটক হয়েছেন, যিনি নাকি প্রকাশ্যে পিস্তল এবং সাথে সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে ঘুরতেন। যেমন সিনেমায় দেখা যায় মাফিয়া ডনদের। না উনি কোনো জনপ্রতিনিধি নন কিংবা বিশেষ বাহিনীরও কেউ নন। তার পরিচয় দিয়েছে দৈনিক প্রথম আলো এই বলে, তিনি উত্তরাসহ টঙ্গী এলাকায় নিজের আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই শো-অফ করতেন। অর্থাৎ অস্ত্র এবং সশস্ত্র ব্যক্তি দুটোই ব্যবহারযোগ্য এবং থাকলে তার আধিপত্য বাড়ে। এই যে, আধিপত্য বাড়ার ফর্মুলা তাকে কী বলবেন?

চট্টগ্রামের লোহাগড়ার একটি ঘটনায় প্রবাসীর জায়গা-জমি দখল করতে গিয়ে এক জনপ্রতিনিধি বন্দুক প্রদর্শন করেছেন। গুলিও চালানো হয়েছে বন্দুক থেকে। সামাজিকমাধ্যমে এমন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, খবর হয়েছে গণমাধ্যমে। একে কী বলবেন? আর এসব নিয়ে আলাপই নাই-বা কেন? একজন লোক আধিপত্য বিস্তারে প্রকাশ্য অস্ত্র প্রদর্শন করছেন। একজন জনপ্রতিনিধি অন্যের জায়গা দখলে অস্ত্র ব্যবহার করছেন, এসব নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের সিংহভাগ অংশ ‘স্পিকটি নট’! 

ইভ্যালি, ইঅরেঞ্জসহ বিভিন্ন ফটকাবাজ প্রতিষ্ঠান পাবলিকের কোটি কোটি টাকা মেরে নিয়ে গেলো, যাচ্ছে এবং তা চোখের সমুখে। কিন্তু তার বিপরীতের ধর্মীয় বয়ান আসছে, উঠছে জানের সদকার কথা। এগুলো কে কী বলবেন? 

রাজধানীতে ছিনতাইকারীকে ধরতে গিয়ে প্রাণ গেছে একজন দিনমজুরের। আলমগীর নামে ওই দিনমজুর এক প্রবাসীর কাছ থেকে ছিনতাই হয়ে যাওয়া মালামাল উদ্ধরের চেষ্টা করছিলেন। এ সময় ছিনতাইকারীদের ছুরির আঘাতে তিনি নিহত হন। ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়ে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু ছিনতাইকারীরা ধরা পড়েনি! এ ঘটনাকে কী বলবেন? 

নরসিংদীর গাছে ঝুলছিলো এক ব্যক্তির লাশ। যিনি আইনের ভাষায় অজ্ঞাতনামা, এলাকার কেউ থাকে চেনে না। এই যে অজ্ঞাতনামাদের লাশ পাওয়া যায় পথে-ঘাটে, খালে-ডোবায়, গুম হয়ে যায় মানুষ। এসব নিয়ে কী বলবেন? 

প্রশ্ন শুধু এই কয়টা নয়, আরো অসংখ্য রয়েছে। লুটপাট, দুর্নীতি, অনিয়মের অসংখ্য কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে গণমাধ্যমে। যা নিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের মাথাব্যথা ততটা নেই, যতটা রয়েছে আফগান ও আফগানিস্তান নিয়ে। কিংবা নায়িকা নুসরতের সন্তানের বাবা কে তা নিয়ে। গণমাধ্যমের তো এ নিয়ে রীতিমত পাগলপারা অবস্থা। পরীমনিও এখন অনেক কিছুতে ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেছে। বিচারকদের তার জন্য ক্ষমা চাইতে হচ্ছে। অথচ এমন অসংখ্য রিমান্ডের ঘটনা রয়েছে দৃষ্টির আড়ালে। 

আমাদের বুদ্ধিজীবীরা হয়তো এসব ঘটনাকে ততটা গুরুতর ভাবছেন না। তা-না হলে এসব নিয়ে তারা ভোকাল হতেন। দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ভোকাল হলে ইতিবাচক কিছু অবশ্যই ঘটে। পরীমনির ঘটনায় স্বয়ং আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী থেকে অনেক বুদ্ধিজীবী সরব হয়েছিলেন বলেই হয়তো পরীমনিকে আরো হেনস্তার সম্মুখীন হতে হয়নি। এটা খুব আশার কথা। একজন নারী নিগৃহিত হওয়ার হাত থেকে বেঁচেছেন। কিন্তু নিরাশার কথা হলো একজন পরীমনি যেভাবে বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে, সার্বিক ভাবে আমাদের অভাগা দেশটি বুদ্ধিজীবীদের আকর্ষিত দৃষ্টির সমুখে পড়ছে না। কেন যে পড়ছে না, সেটাই ভাবনার বিষয়। আমাদের দেশটি কি তবে নায়িকাদের গ্ল্যামারের কাছে ক্রমেই নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে? মানুষের বাঁচা-মরার সংগ্রাম আড়ালে থেকে যাচ্ছে কারো পিতৃ পরিচয় উদ্ধারের কর্মকাণ্ডের প্রতিযোগিতায়? সত্যিই বিচিত্র এই দেশ, আর এ দেশের বুদ্ধিজীবী। আলেকজান্ডার থাকলে নিশ্চয়েই সেলুকাস কে ডেকে সে কথাই বলতেন, ‘কী বিচিত্র এই দেশ’।

ফুটনোট : অনেকে বলবেন, এ নিয়ে তো আপনি আগেও লিখেছেন, ফলাফল কী? না, আপাতত ফলাফলল নেই। তবে দরোজায় ধাক্কা দিয়ে যাই, খুলবে তো অবশ্যই একদিন। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0608 seconds.