• ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২২:৫৩:২১
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:৩৫:৪৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

চাঁদের জমি, সমন্বিত চিৎকার ও ই-অরেঞ্জের ছদকা

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত আমি শুধু তার লেখার জন্য নয়, অকপট মনের কথা এবং যার বেশিরভাগই সত্যি তা বলার জন্য। যেমন ‘হারুকি মোরাকামি’ নামে লেখায় তিনি নির্দ্ধিধায় বলেছেন, আকতারুজ্জামান ইলিয়াস’র চিলেকোঠার সেপাই তার ভালো লাগেনি। আমারও লাগে না। অনেকটাই অখাদ্য একটা লেখা। যাকে সমস্বর চিৎকারে খাদ্য বানানো হয়েছে। সমস্বর চিৎকার ব্যাপারটা ক্রমশ বলছি। 

জানি, এমন কথায় অনেকেই আমাকে মূর্খ বলবেন, বলুন আপত্তি নেই। কিন্তু আপনাদের মতন রঙ মোছার তোয়ালেকেও আমি ‘বিমূর্ত’ বলে মুগ্ধ হতে পারবো না। বিবি রাসেলের কিছু অখাদ্য ফ্যাশন ডিজাইনকে বুঝে বা না বুঝে ‘ওয়াও’ বলে বিকট চিৎকার দিতে পারবো না। এই না পারাটা যদি আমার ব্যর্থতা হয়, হোক, আমি মানতে রাজি। 

আমাদের দেশে নানা অখাদ্য জিনিসকে স্রেফ প্রচারণার জোরে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। মনে রাখবেন প্রচার নয়, প্রচারণা বলেছি। প্রচার ইতি’র কথা বলে, প্রচারণা নেতি’র কথা। নেতিবাচকতার মার্কেট অবশ্য এখন ভালো। যেমন চাঁদে জমি কেনা হচ্ছে। পাবলিক এটা নিয়ে ট্রল করছেন। ট্রল করারই কথা। আমাদের মতন দেশের মানুষের চাঁদে জমি কেনার মতন বিলাসিতা মানায় না। না মানালেও বিবি রাসেলের ফ্যাশনের মতন অনেকে গ্রহণ করে নেন। কাগজে নাম ওঠে ছবি সহ, সেই কাগজ তারা কাটিং করে রাখেন। তাকে নিয়ে ট্রল হয়, তিনি অখুশি হন না। আর যাই হোক নামটা তো ছড়ালো এ সুযোগে। রাস্তায় বেরুলে মানুষ জিজ্ঞেস করবে, ‘এই যে আপনিই না চাঁদে জমি কিনেছিলেন?’ নিজেকে খানিকটা কেউকেটা মনে তো হতেই পারে। 

হিরো আলম যেমন এখন বিখ্যাত। ভারতের লোকজনও তার নাম জানে, তাকে নিয়ে ট্রল করে। বলা যায় ট্রলের মাধ্যমে হিরো আলমকে স্মরণ করে। কলকাতার রুদ্রনীল ঘোষ যেমন করেছেন। তিনিও অবশ্য বিজেপিতে যোগ দিয়ে ট্রলের মাধ্যমেই পরিচিতির পরিধিটা বাড়িয়েছিলেন। যদিও তার বিজেপিতে যোগ দেয়া হালে পানি পায়নি, জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তারপরেও প্রচারণা যেটুকু হয়েছে তাতেই কম কী। কমেডিয়ান থেকে সরাসরি পলিটিশিয়ান। সেয়ানও বলতে পারেন। সেয়ান না হলে আজকাল কেউ আর পলিটিক্স করতে যায় না। মূলত পলিটিক্সটা এখন ট্রিক্স হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সেয়ানদের দরকার। আর সেয়ান হওয়ার প্রথম শর্ত সম্ভবত অখাদ্য জিনিস চালানো এবং নিজে অখাদ্য হয়ে ওঠা। না হলে বিজেপিচ্যুত বাবুল সুপ্রিয় আবার তৃণমূলে ঠাঁই পায় কীভাবে!

অখাদ্য জিনিস চালানোর কিছু কৌশল রয়েছে। তার অন্যতম মধ্যে হলো উচ্চাভিলাসি কিছু পাবলিক জোগাড় করা। যাদের ‘ভিলাস’ এবং ভিশন আছে কিন্তু ঘটে জিনিস নেই। হুমায়ূন আহমেদ যাদের বলতেন ‘ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার’। যেহেতু ঘটে কিছু নেই তাই তারা তাদের ভিশন সম্পন্ন করতে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র তৈল থেকে চাণক্যের ‘সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ’ সব কৌশলই অবলম্বন করতে পিছপা হবেন না। সঙ্গতই অখাদ্যকেও তারা সুষম এবং সুস্বাদু খাদ্য বলে সমস্বরে প্রচারণা চালাবে। তাদের সমস্বরের চিল্লানোতে জীবনানন্দের ধারণায় দশজন মূর্খের বিক্ষোভে মুগ্ধ হবেন নিশ্চিত সুন্দরী মহিলা। তেমনি অখাদ্যও খাদ্য হিসেবে প্রচার পাবে। ব্যাপারটাকে শেয়ালের ‘চিৎকার’ সঙ্গীতের সাথে তুলনা করাও খুব বেশি অসঙ্গত নয়। সেই ‘এক রা’তে ঘুম ভাঙবেই। 

আবার চাঁদে জমি কেনার কথায় আসি। গণমাধ্যম থেকে জানলাম, অনেকেই চাঁদে জমি কিনে স্ত্রীকে উপহার দিচ্ছেন। হুমায়ূন আহমেদের ভাষা ধার করে আমিও বলছি ‘অতি উচ্চ বিচার’। প্রেম করার সময় অনেকেই প্রেমিকাকে চাঁদ পেড়ে দেবার অঙ্গীকার করেন। যেন চাঁদ গাছের বরই কিংবা পেয়ারা, ইচ্ছে করলেই আকশি দিয়ে পেড়ে আনা যায়। এই অসম্ভব কল্পনার চেয়ে চাঁদে জমি কিনে দেয়া অবশ্যই অতি উচ্চ মানের বিচার। আরেকজনকে দেখলাম চাঁদের নাগরিকত্ব এবং পাসপোর্ট দুই-ই পেয়েছেন। দারুণ ব্যাপার। এমনিতেই দেশের অবস্থা খারাপ। বায়ু দূষণে দেশ হিসেবে বাংলাদশে এক নম্বর এবং শহর হিসেবে ঢাকা রয়েছে তৃতীয় স্থানে। আর যাই হোক প্লেস হারায়নি। 

যারা মোটামুটি এদিক-সেদিক করে হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন, তাদের অবশ্যই উচিত দূষণমুক্ত জায়গায় বাসের ব্যবস্থা করা। আর কবিরা চাঁদকে সমস্বরে যে জায়গায় বসিয়েছেন, সে অনুযায়ী বলতে গেলে চাঁদ হলো স্বর্গের বিকল্প। প্রকৃত ঘটনা যাই হোক না কেন, ওই যে, চাঁদে অক্সিজেন থাকুক আর না থাকুক। এখানেও সেই সমস্বরের শেয়াল সঙ্গীত। কল্পনায় আমাদের আরাধ্য চাঁদ। জোছনাও কম আরাধ্য না, ‘বেঁদের মেয়ে জোছনা’ই তার প্রমান। অবশ্য চাঁদ বিষয়ক দোষ আমারও আছে। আমারও দু’একটা কবিতা ধরণের লেখা রয়েছে চাঁদকে নিয়ে। ওই যে শামসুর রাহমানের ভাষায়, ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাওয়া। মাঝে-মধ্যে আমারও তো ইচ্ছে করে মিশে যেতে, চাঁদে জমি না হলেও কানাডার বেগম পাড়ায় বাড়ি কিনতে। 

কখনো কখনো ভালো-মন্দের মধ্যেও বিভেদ কমে আসে। ওই যে ‘কোনো দেশে গালি, কোনো দেশে বুলি’র মতন কখনো ইচ্ছেও মিলেমিশে যায়। হুমায়ূন আহমেদ তার হারুকি মোরাকামি’র মধ্যেই লিখেছেন, এডগার অ্যালান পো’র কবিতা `Annabe Lee’ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাঁকুরের ‘একই গাঁয়ে’ নাকি দুই কবির এক কবিতা, শুধু পার্থক্য ভাষার। এক্ষেত্রে গগণ হরকরাকেও স্মরণ করা যেতে পারে। হয়ে যায়, হওয়া অসম্ভব নয়, একই চেহারার নাকি সাতজন মানুষ থাকে। তেমনি ইচ্ছারও সাদৃশ্য থাকতে পারে। বলতে পারেন হয়ে যায়। এই যে হাজার কোটি টাকা লোপাটের গল্প, ব্যাংক লুট, ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ এসব দেখে তার একটা আছর তো পড়তেই পারে। কি বলেন পারে না? 

আকতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা বললাম, বললাম বিবি রাসেলের ফ্যাশনের কথা, এ বলা আমার ব্যক্তিগত পছন্দ থেকেই। আমার নিশ্চয়ই পাঠক হিসেবে, গ্রাহক হিসেবে পছন্দ না করার এবং তা বলার অধিকার রয়েছে। এখানে হুমায়ূন আহমেদের সাথে তাল মিলিয়ে বলে নিই, পাঠক হিসেবে আমি খুবই নিম্নমানের, ফ্যাশন বোঝার ক্ষমতায়ও আমার খুব কম। লুঙ্গির বেল্ট এবং স্যান্ডোগেঞ্জির পকেটের ব্যাপারটি যেমন আমার মাথায় ঢোকে না তেমনি। অধিকারের কথা বলছিলাম। অধিকার বিষয়টি আমাদের এখানে ক্রমেই গোলমেলে হয়ে উঠছে। বলতে গেলে অধিকারও কোটাভুক্ত হয়ে পড়ছে। অমুক এমনটা বলতে পারবেন, তারজন্য সেটা জায়েজ, কিন্তু অপরজনের জন্য উল্টো। প্রতারক অর্থ নিয়ে গেলে কেউ বলতে পারবেন, ‘ওটা জানের ছদকা’। আবার অন্য কেউ বললে তা হবে ফতোয়াবাজী। হুমায়ূনীয় ভাষায় ‘আচানক’ ব্যাপার-স্যাপার সব।  

যাকগে, আচানক ব্যাপার-স্যাপার আপাতত থাক বরং আমরা চাঁদে জমি কেনা মানুষদের সাথে কানাডার বেগম পাড়ার মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করি। তার সাথে খাদ্যকে অখাদ্যের বিপরীতে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক। 

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

চাঁদের জমি ই-অরেঞ্জ

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0677 seconds.