• ০২ অক্টোবর ২০২১ ১১:৫৯:৩২
  • ০২ অক্টোবর ২০২১ ১২:০০:৫৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ভারতের আসাম ও আমাদের ‘অসাম’ মানবতার ফেরিওয়ালাগণ

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

অনেকে আফসোস করছেন, ভারতের আসামে মুসলমানদের গুলি করে মারা হচ্ছে, তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে, অথচ এর প্রতিবাদ নেই বঙ্গীয় সুশীল সমাজে। যারা আফসোস করছেন তাদের জন্য আমার আফসোস হয়। হয় তাদের প্রত্যাশার শেষ নেই দেখে। তারা কাদের কাছে প্রত্যাশা করেন, সেটা বোঝার ক্ষমতাও তাদের নেই। বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কাদের কাছে চাইতে হবে, আশা করতে হবে সে বিষয়টা অনেক আগেই গুলিয়ে গেছে। আর সেই গুলিয়ে যাওয়ার বাস্তবতা হচ্ছে আজকের নানা দৃশ্যচিত্র। 

কদিন আগেই লিখলাম বাংলাভাষী ‘সেক্যুলারদের’ কথা। তালেবান নারীদের স্বাধীনতা নিয়ে যারা মহাচিন্তিত। যাদের রাতের ঘুম ও কাম প্রায় হারাম হতে বসেছে, ভারতের ছয় তরুণীকে নগ্ন করে গ্রাম ঘোরানোতে তাদের কোনো ‘রা’ নেই। অথচ সভ্যতার বিপরীতে এমন কোনো ঘটনা অন্তত তালেবানরা ঘটাননি। কোনো নারী ধর্ষণের খবরও পাওয়া যায়নি তালেবানদের তরফ থেকে। যারা বলেন ইসলাম নারীদের গনিমতের ‘মাল’ মনে করে, তাদের সেই বলা ভুল প্রমানিত হয়েছে আফগানিস্তানে। সাধারণত যুদ্ধ শেষে যা দেখা যায় প্রতিপক্ষের স্ত্রী-কন্যাদের উপর অত্যাচার সেটাও হয়নি সেখানে। কিন্তু ভারতে যুদ্ধ না থাকলেও দলিত নারীদের উপর অনেকটা যুদ্ধপরবর্তী অত্যাচারের কাহিনি অনেকেরই জানা। 

ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় যাই হোক না কেন, তার নামে মানুষের উপর অত্যাচার গ্রহণযোগ্য নয় কোনো যুক্তিতেই। যেমন ধর্মের নামে আইএস বা বর্ণের নামে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা যা করে তা কোনো যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নয়। তেমনি আসামে মুসলমানদের উপর যা ঘটলো তাও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। হওয়া উচিত নয় অন্তত একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কাছে। আইএস বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের কার্যকলাপের থেকে এটা আরো বেশি নিন্দাযোগ্য। কারণ আইএস ও সুপ্রিমিস্টদের আমরা জানি বর্বর হিসেবে, সভ্যতার বিপরীত শক্তি হিসেবে। কিন্তু আসামে যারা এমন কাণ্ড ঘটালো, তারা কি কোনো নিষিদ্ধ মিলিট্যান্ট, না কোনো অসভ্য শক্তি? এই প্রশ্নটাই বিষয়টাকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে সাথে প্রতিবাদটাকে আবশ্যিক করে তোলে।

যারা আসামের ভিডিওটি দেখেছেন তাদের বুঝতে পারার কথা, আসামের কৃষক মইনুল হকের মৃত্যু, স্রেফ শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, জাতি ও ধর্ম বিদ্বেষের নিকৃষ্টতম নজির। ঠাণ্ডা মাথায় গুলির পর একজন মৃত মানুষের দেহের উপর যা করা হলো, তা আইসিস বা সুপ্রিমিস্টরাও কখনো করেনি। এই বিদ্বেষের নজির আরো ভালোভাবে উন্মোচিত হয়েছে খবর সংগ্রহের জন্য যাওয়া ক্যামেরাম্যানের মৃতদেহের উপর লাথি দেয়ার অসম্ভব বর্বর দৃশ্যে। এই বর্বরতাকে কী দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব!

এতসবের পরও আমাদের সুশীলদের রা নেই। তারা আছেন পরীমনিতে মগ্ন। নুসরাতের সন্তানের পিতৃ পরিচয়য়ে উদগ্রীব। চাঁদের জমি কেনার আলোচনায়। অথচ এই ঘটনা যদি কোনো মুসলমান রাষ্ট্রে অন্য ধর্মের কারো সাথে ঘটতো, তাদের দেখা যেতো শাহবাগে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে যেতে। 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আমাদের দেশীয় অনেকের উচ্ছাস দেখলাম। বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তিকে রীতিমত মিথ বানিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে, অথচ মাতৃভক্তিজনিত পুরো ঘটনাই মিথ্যা। যেভাবে ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে, তার কোনটারই বাস্তব অস্তিত্ব নেই যা গুগল ঘাটলে যে কেউই জানতে পারবেন। বিদ্যার সাগর হয়েও ঈশ্বরচন্দ্র নমশূদ্রদের পড়াশোনার বিপক্ষে ছিলেন। তার কাছে পড়াশোনা মানে ছিলো ‘কুলীন’দের ব্যাপার। প্রদীপের নিচের অন্ধকারটাকে আমরা বরাবরই এড়িয়ে যাই। কেন যে যাই, তা নিজেও জানি না। জানলে অনেক প্রশ্নের উত্তর সহজ হতো।  

হ্যাঁ, ঈশ্বরচন্দ্র বেশ কিছু কাজ করেছেন যা নারীদের পক্ষে গেছে, মানবতার পক্ষে গেছে। তবে বিদ্যাসাগরকে সেক্যুলার বানানোটা অনেকটাই মিথ্যায় গড়ে ওঠা মিথের মতন। সে আলোচনা বিষদ, আরেক সময় করা যাবে। তবে যারা বিদ্যাসাগরের গুনগান গান মানবতার জন্য, তারা আসামের অমন অমানবিক কাজে কীভাবে চুপ থাকেন বা মধ্যপ্রদেশের সেই ছয় তরুণীকে নগ্ন করার ঘটনায় চোখ মুঁদে থাকেন, তা আমাদের মতন ক্ষুদ্র মানুষের বোধে আসে না। সাথে বুঝি না, আমরা বোধহীন, না মানবতার সেই ফেরিওয়ালারা নির্বোধ। কিংবা প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতন এড়িয়ে যান মেরুদণ্ডহীনতায়। 

কাকন রেজা : লেখক ও সাংবাদিক।  

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0869 seconds.